বাংলাদেশের ভয়াবহ কিছু দুর্ভিক্ষ

বর্তমানে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশ। বাংলাদেশ আজ ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং গরু-ছাগল উৎপাদনে দ্বিতীয়। এছাড়া কাঁঠাল, আম, পেয়ারা সহ আরো অনেক মৌসুমি ফল ও ফসল উৎপাদনে আছে উল্লেখযোগ্য স্থানে। বাংলায় খাদ্যের এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা অতীতেও ছিল। আর তাইতো গ্রামবাংলার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নিয়ে প্রচলিত একটি প্রবাদ বাক্য – ‘গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ’ – আজও মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। কিন্তু সুজলা – সুফলা এই বাংলায় এমনও সময় দেখা গেছে, যখন মানুষের ঘরে ছিল না কোন খাবার, মারা যেতে হয়েছে অনাহারে। এই সময়গুলোকে বলা হয় “দুর্ভিক্ষ“। দুর্ভিক্ষ হল কোন এলাকার ব্যাপক খাদ্য ঘাটতি। সাধারণত ফসলহানি, যুদ্ধ, সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে দুর্ভিক্ষ সংগঠিত হয়। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গবাদিপশুর মড়ক, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ ইত্যাদি কারণেও দুর্ভিক্ষ সংগঠিত হয়। আজকে বাংলাদেশের ভয়াবহ কিছু দুর্ভিক্ষ নিয়ে জানবো।

বাংলাদেশের ভয়াবহ কিছু দুর্ভিক্ষ

১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ

১৭৭০ সালে (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) বাংলাদেশে হওয়ায় এই দুর্ভিক্ষ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত
১৭৭০ সালে (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) বাংলাদেশে হওয়া “ছিয়াত্তরের মন্বন্তর”

১৭৭০ সালে বাংলাদেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। সময়টি বাংলা ১১৭৬ বঙ্গাব্দ হওয়ায় এই দুর্ভিক্ষ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত হয়। এই ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নামে পরিচিত। দুর্ভিক্ষের কয়েকবছর আগে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় দ্বৈত শাসন। যার ফলে নবাবের হাতে থাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব, আর রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের পূর্ণ কর্তৃত্ব পায় কোম্পানি। এতে করে বাংলার নবাব আসলে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে আর এই সুযোগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকেরা খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচার শুরু করে দেয়। ইংরেজদের এই শোষণের ফলে জনসাধারণের মধ্যে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। অনেক কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে দেন, অনেকে হয়ে পড়েন কপর্দকশূন্য।

ইংরেজদের শোষণজনিত দুর্ভোগের পাশাপাশি বিধাতার অভিসম্পাতস্বরুপ সেই বছর বাংলায় দেখা দেয় অতি বৃষ্টি ও বন্যা। আবার এর আগের দুই বছরও অনাবৃষ্টির কারনে ফলন একদম কম হয়েছে। ফলে কৃষিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায়, সমগ্র দেশজুড়ে চরম অর্থনৈতিক মন্দা ও খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। এছাড়া সরকারের অবিবেচক ও হঠকারী সিদ্ধান্তসমুহ, ত্রুটিপূর্ণ ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা এবং খাদ্যবাজারে দালাল ফড়িয়া শ্রেনীর দৌরাত্ম্যের ফলে অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়ে। আর এতে করেই দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ১৭৭০ সালের এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ফলে বাংলায় প্রায় এক কোটি মানুষ খাবারের অভাবে মারা যায়। এছাড়া বাংলার সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনেও নেমে আসে চরম ভোগান্তি।

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ

১৯৪৩ সালের তেতাল্লিশের মন্বন্তর বা পঞ্চাশের মন্বন্তর (১৩৫০ বঙ্গাব্দ)
১৯৪৩ সালের তেতাল্লিশের মন্বন্তর বা পঞ্চাশের মন্বন্তর (১৩৫০ বঙ্গাব্দ)

বাংলায় পরবর্তী দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় ১৯৪৩ সালে, ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তবে সময়টি বাংলা ১৩৫০ বঙ্গাব্দ হওয়ায় এই দুর্ভিক্ষ পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত হয়। অনেকের কাছে অবশ্য এই দুর্ভিক্ষ তেতাল্লিশের মন্বন্তর নামেও পরিচিত। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হওয়া এই দুর্ভিক্ষ হয় ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রদেশে যা বর্তমানে বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারত। আনুমানিক ২.১-৫ মিলিয়ন বা ২১ থেকে ৫০ লাখ মানুষ অপুষ্টি, অস্বাস্থ্যকর অবস্থা এবং স্বাস্থ্য সেবার অভাবের কারণে অনাহার, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগে মারা যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ হয় দরিদ্র।

তবে ইতিহাসবিদদের মতে চেষ্টা করলেই এই দুর্ভিক্ষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো যেতো। কেননা এই দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান কারন হল ২য় বিশ্বযুদ্ধ এবং তৎকালীন সরকারি নীতির ব্যর্থতা। বিশেষ করে ২য় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ইউরোপে জার্মানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে বাংলার এই দুর্ভিক্ষ নিয়ে লোকজন তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেও তিনি এটাকে পাত্তা দেননি। আবার ওই সময় বার্মা ছিল ভারতের চাল আমদানির অন্যতম বড় একটি উৎস। কিন্তু যুদ্ধের সময় জাপান বার্মা দখল করে নেওয়ার ফলে সেখান থেকে থেকে কোন চাল ভারতে আসত না। এতে করে বাংলায় খাদ্যের ঘাটতি বেড়ে যায়।

তবে কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগও ছিল এই দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারন। কেননা তার আগের কয়েকবছরে খরাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারনে বাংলায় ফলনে ব্যাঘাত ঘটে। আর এরফলে বাংলায় খাদ্যের ঘাটতি আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। বাংলায় এই দুর্ভিক্ষের প্রভাব এবং জনগণের প্রতি ব্রিটিশদের মনোভাব কেমন ছিল তা বোঝা যায় পাকিস্তানি লেখক কৃষাণ চন্দের একটি লেখা থেকে। – “হতভাগ্য ইঁদুরের দল! কেমন নিঃশব্দে মরে, মুখে সামান্য আহ শব্দ করারও জোর নেই।”

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ

১৯৭৪ সালে হওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ
১৯৭৪ সালে হওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ

স্বাধীন বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ। বাংলাদেশে এই দুর্ভিক্ষ সংগঠিত হয় ১৯৭৪ সালে। আর তাই একে বলা হয় “১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ”। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের মার্চে শুরু হয়ে সেই বছরেরই ডিসেম্বরের দিকে গিয়ে শেষ হয়। এই দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। সরকারী হিসেব অনুসারে ২৭,০০০ মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। আর বেসরকারি হিসেবে অনুমানিক ১,০০,০০০ থেকে ৪,৫০,০০০ জন প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মৃত্যুবরণ করে এই দুর্ভিক্ষে। এটিই স্মরণকালের মধ্যে বাংলার সবচেয়ে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হিসেবে গন্য করা হয়।

আসলে সেই দশকের শুরুতেই সারা বিশ্বব্যাপী খাদ্যের সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। কেননা ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে প্রায় ৫ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। ফসলহানী ও ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিল দেশের অনেক মানুষ। কিন্তু পাকিস্তান সরকার সে সময় দ্রুত পর্যাপ্ত সাহায্য নিশ্চিত করতে পারেনি। আবার এর কিছুদিন পরেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এদেশের উপর আক্রমণ করে বসে হানাদার বাহিনী। এরপর স্বাধীনতার পর যুদ্ধাকালীন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই টানা দুই বছর আউশ ও আমন ধানের উৎপাদন ব্যাহত হয়।

১৯৭৩ সালে প্রথম অনাবৃষ্টিতে এবং ১৯৭৪ সালে বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। আর ১৯৭৩ সালের বিশ্বব্যাপী তেলসংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আর্থিক মন্দার মুখে যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশেও বৈদেশিক মুদ্রায় ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে সরকারের পক্ষে খাদ্য আমদানি করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তবু বাংলাদেশ সে বছর ৭৩২ কোটি টাকার খাদ্যশস্য আমদানি করেছিল। কিন্তু মধ্যসত্ত্বভোগী, দালাল, মজুতদার এবং দুর্নীতিবাজদের কারণে দেশ কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। ফলে ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আর যার ফলে মারা যায় বহু মানুষ।



error: