জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা: বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ

বীরশ্রেষ্ঠ শব্দের মানে হলো বীরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বীর শ্রেষ্ঠ বীরত্বের জন্য প্রদত্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক। যুদ্ধক্ষেত্রে অতুলনীয় সাহস ও আত্মত্যাগের নিদর্শন স্থাপনকারী যোদ্ধার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পদক দেয়া হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে এই পদক দেয়া হয়েছে। আর আজকে আমরা এই ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে থেকে শহীদ ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ সম্পর্কে জানবো।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের জন্ম, শিক্ষা ও কর্মজীবন

জন্ম: ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল জেলার মহিষখোলা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে নূর মোহাম্মদ শেখ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ আমানত শেখ, মাতা জেন্নাতুন্নেসা।

নূর মোহাম্মদ শেখ
নূর মোহাম্মদ শেখ

শৈশব ও শিক্ষাজীবন: নূর মোহাম্মদ শেখ তার নিজ এলাকার এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সপ্তম শ্রেণীর পর আর পড়াশোনা করেননি। পড়াশুনা না করতে পারলেও সে গান বাজনা নিয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে এখানে সেখানে চলে গেলো গান করতে। ছোট্য বেলায় বাড়ন্ত স্বভাবের থাকার কারনে তার গান বাজনায় মন চলে গিয়েছিলো। অবস্থা এমন হয়েছিলো না, গান বাজনার লোকেরা তাকে এক নামে চিনতো। তারপর তিনি একদিন সুযোগ করে একটা “গ্রামোফোন” কিনে ফেললেন। বিয়ে করেছেন তোতাল বিবি নামের এক মেয়েকে।

কর্মজীবন: নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৫৯-এর ১৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর-এ যোগদান করেন। যখন তিনি চাকুরিতে যোগদান করেন তখন তার বয়ষ মাত্র ২৩(তেইশ)। প্রাথমিক সামরিক শিক্ষা সম্পূর্ন হলে তাকে ১৯৫৯ সালের ৩ ডিসেম্বর দিনাজপুর সীমান্তে বদলি করা হয়। তারপর সেখান থেকে ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই নূর মোহাম্মদকে দিনাজপুর থেকে যশোর সেক্টরে বদলি করা হয়। এরপর তিনি ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি পান।

মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ

নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৭১ সালে যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮নং সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধ চলাকালীন যশোরের শার্শা থানার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা’র নেতৃত্বে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

১৯৭১- এর ৫ সেপ্টেম্বর সুতিপুরে নিজস্ব প্রতিরক্ষার সামনে যশোর জেলার গোয়ালহাটি গ্রামে নূর মোহাম্মদকে অধিনায়ক করে পাঁচ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্ট্যান্ডিং পেট্রোল পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে হঠাৎ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পেট্রোলটি তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা থেকে পাল্টা গুলিবর্ষণ করা হয়। তবু পেট্রোলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। এক সময়ে সিপাহী নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে নূর মোহাম্মদ নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নেন এবং হাতের এল.এম.জি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করলে শত্রুপক্ষ পেছনে হাঁটতে বাধ্য হয়।

যেভাবে শহীদ হলেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ

যশোর জেলার গোয়ালহাটি গ্রামের যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তিন দিক থেকে তাদের ঘিরে গোলাবর্ষন শুরু করে তখন নান্নু মিয়া নামক এক সহযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়। তারপর নূর মোহাম্মদ শেখ নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নেয় এবং গুলি করা শুরু করে এলোপাথাড়ি। কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই শত্রুর মর্টারের একটি গোলা এসে লাগে তাঁর ডান কাঁধে। ধরাশয়ী হওয়া মাত্র আহত নান্নু মিয়াকে বাঁচানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন। হাতের এল.এম.জি সিপাহী মোস্তফাকে দিয়ে নান্নু মিয়াকে নিয়ে যেতে বললেন এবং মোস্তফার রাইফেল চেয়ে নিলেন যতক্ষণ না তাঁরা নিরাপদ দূরুত্বে সরে যেতে সক্ষম হন ততক্ষণে ঐ রাইফেল দিয়ে শত্রুসৈন্য ঠেকিয়ে রাখবেন।

অন্য সঙ্গীরা তাদের সাথে অনুরোধ করলেন যাওয়ার জন্যে। কিন্তু তাঁকে বহন করে নিয়ে যেতে গেলে সবাই মারা পড়বে এই আশঙ্কায় তিনি রণক্ষেত্র ত্যাগ করতে রাজি হলেন না। বাকিদের অধিনায়োকোচিত আদেশ দিলেন তাঁকে রেখে চলে যেতে। তাঁকে রেখে সন্তর্পণে সরে যেতে পারলেন বাকিরা। এদিকে সমানে গুলি ছুড়তে লাগলেন রক্তাক্ত নূর মোহাম্মদ শেখ। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই মৃত্যুপথযাত্রী যোদ্ধাকে বেয়নেট দিয়ে বিকৃত করে চোখ দুটো উপড়ে ফেলে। এভবেই এই সূর্য সন্তান নিজের জীবন দিয়ে অন্যদের বাঁচিয়েছে।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধি

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধি
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধি

নূর মোহাম্মদ শেখের বায়োনেট দিয়ে খোঁচানো, চোখ উপড়ে ফেলা মৃতদেহ তার সহযোদ্ধারা উদ্ধার করে। বর্তমানে তিনি যশোরের কাশিপুর গ্রামে সমাহিত আছেন।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের সম্মাননা

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীরশ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

আরো পড়ুন

Sources:

লেখক: Pritom Pallav

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 Shares
Share via
Copy link