জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা: বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন

বীরশ্রেষ্ঠ শব্দের মানে হলো বীরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বীর শ্রেষ্ঠ বীরত্বের জন্য প্রদত্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক। যুদ্ধক্ষেত্রে অতুলনীয় সাহস ও আত্মত্যাগের নিদর্শন স্থাপনকারী যোদ্ধার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পদক দেয়া হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে এই পদক দেয়া হয়েছে।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন

জন্ম: মোহাম্মদ রুহুল আমিন ১৯৩৫ সালে নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি উপজেলার বাঘপাঁচড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আজহার পাটোয়ারী এবং মায়ের নাম জোলেখা খাতুন। তার পরিবারের ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।

শিক্ষা-জীবন: রুহুল আমিন পড়ালেখার শুরু করেন তার গ্রামের বাঘচাপড়া প্রাইমারী স্কুলে। সেখানে পড়াশোনা শেষ করে পার্শবর্তী থানার আমিষাপাড়া হাই স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু পরবর্তিতে তার পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারনে হাইস্কুল পাস করার পরই রুহুল আমিনকে জীবিকার সন্ধানে বের হতে হয়৷ তিনি এসএসসি অবধি পড়াশুনা করতে পেরেছিলেন।

কর্ম-জীবন: রুহুল আমিন এসএসসি পাশ করার পর ১৯৫৩ সালে জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য তিনি যান করাচির নিকটবর্তী আরব সাগরে মধ্যে অবস্থিত মানোরা দ্বীপে পাকিস্তানি নৌঘাঁটি (পি.এন.এস) বাহাদুরে। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর সেখান থেকে পি.এন.এস. কারসাজে যোগদান করেন। পরবর্তীতে পি.এন.এস বাবর, পি.এন.এস খাইবার এবং পি.এন.এস তুঘরিলে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে পেশাগত প্রশিক্ষণ শেষ করেন। ১৯৬৫ সালে মেকানিসিয়ান কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন। পি.এন.এস. কারসাজে কোর্স সমাপ্ত করার পর আর্টিফিসার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম পি.এন.এস. বখতিয়ার নৌঘাঁটিতে বদলি হয়ে যান।

মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন: ১৯৭১ সালের এপ্রিলে তিনি চট্টগ্রাম পি.এন.এস. বখতিয়ার নৌঘাঁটি থেকে পালিয়ে যান। এর কিছুদিন পর ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলা সেক্টর প্রধান কোয়ার্টারে যান এবং সেখানে মেজর শফিউল্লাহর অধীনে ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে থেকে বিভিন্ন স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়৷ এ উদ্দেশ্যে নৌবাহিনীর সদস্যদের যাঁরা বিভিন্ন সেক্টর ও সাব-সেক্টরে থেকে মুক্তিযুদ্ধ করছিলেন তাঁদেরকে সেপ্টেম্বর মাসে একত্রিত করা হয় আগরতলায় এবং গঠন করা হয় ১০ নং সেক্টর৷ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন নৌবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আগরতলায় একত্রিত হয়ে কলকাতায় আসেন এবং যোগ দেন ১০ নং নৌ সেক্টরে৷ পরবর্তীকালে অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি নৌবাহিনী তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন মণীন্দ্রনাথ সামন্তের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সেক্টর ও সাব-সেক্টর থেকে নৌবাহিনীর সদস্যদের একত্রিত করার ব্যবস্থা করা হয়। আর এ উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠিত হলে কলকাতায় চলে আসেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী কে কলকাতা বন্দরে গার্ডেনরিচ ডক ইয়ার্ডে দুইটি গানবোট উপহার দেয়। সেখানে প্রতিটি বোটে কানাডীয় ধরনের ২টি বাফার গান লাগিয়ে এবং ব্রিটিশ ধরনের ৫০০ পাউন্ড ওজনের ৪টি মার্কমাইন বহনের উপযোগী করে গানবোটে রূপান্তর করা হয়। গানবোটগুলোর নামকরণ করা হয় ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’। রুহুল আমিন পলাশের প্রধান ইঞ্জিনরুমে আর্টিফিসার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে যশোর সেনানিবাসের পতন ঘটে। পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে থাকে। সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত খুলনাস্থ নৌঘাট দখল করার পরিকল্পনা নিয়ে ভারতীয় গানবোট পাভেলের সাথে যুক্ত হয়ে ১০ ডিসেম্বর মংলা বন্দরে পৌঁছায়। সেখানে পাকিস্তানি সেনা ও নৌবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ‘পলাশ’ ও ‘পদ্মা’ মংলা বন্দর হয়ে খুলনার দিকে রওয়ানা দেয়। গানবোট ‘পাভেল’ সামনে আর পেছনে ‘পলাশ’ ও ‘পদ্মা’ নিয়ে খুলনার দিকে রউনা দেয় সবাই।

যেভাবে শহীদ হলেন বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন: ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২টার দিকে গানবোটগুলো খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে এলে অনেক উঁচুতে তিনটি জঙ্গি বিমানকে উড়তে দেখা যায়। কিন্তু অভিযানের সর্বাধিনায়ক ক্যাপ্টেন মনেন্দ্রনাথ ভারতীয় বিমান মনে করে গুলিবর্ষণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এর কিছুক্ষণ পরে বিমানগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে নিচে নেমে আসে এবং আচমকা গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রথম গোলা এসে পড়ে ‘পদ্মা’য় এবং পরবর্তীতে ‘পলাশে’। গোলা সরাসরি ‘পদ্মা’র ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে ইঞ্জিন বিধ্বস্ত করে।

‘পদ্মা’-র পরিণতিতে পলাশের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার রায় চৌধুরী নাবিকদের জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। রুহুল আমিন এই আদেশে ক্ষিপ্ত হন। তিনি উপস্থিত সবাইকে যুদ্ধ বন্ধ না করার আহ্বান করেন। কামানের ক্রুদের বিমানের দিকে গুলি ছুঁড়তে বলে ইঞ্জিন রুমে ফিরে আসেন। কিন্তু অধিনায়কের আদেশ অমান্য করে বিমানগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। বিমানগুলো উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ করে পলাশের ইঞ্জিনরুম ধ্বংস করে দেয়। তবে ইঞ্জিন বিকল হয়ে আগুন ধরে যায় এবং গোলার আঘাতে রুহুল আমিনের ডান হাতটি সম্পূর্ণ উড়ে যায়।

অবশেষে পলাশের ধ্বংশাবশেষ পিছে ফেলেই আহত রুহুল আমিন ঝাঁপিয়ে পড়েন রূপসা নদীতে। কিন্তু তিনি যখন পাড়ে এসে পৌঁছান ততক্ষণে সেখানে রাজাকারের দল অপেক্ষা করছে তার জন্য। আহত রুহুল আমিনকে তারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে সেই রূপসা নদীর পাড়েই। তাঁর বিকৃত মৃতদেহ বেশকিছুদিন সেখানে অবহেলায় পড়ে ছিলো।

সমাধি: রূপসা নদীর তীরে তার বিকৃত মৃতদেহ পড়ে থাকে বেশ কিছুদিন। বীর সন্তানের মৃতদেহ অবহেলায় পড়ে থাকে। তারপর স্থানীয় জনগন রূপসা নদীর তীরেই তার লাশ উদ্ধার করে এবং সেখানেই তাকে কবর দেওয়া হয়। পরবর্তীরে সেখান একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

সম্মাননা: বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীরশ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

Sources:

  • আমার বাংলা বই- ৪র্থ শ্রেনী
  • ৭১(১ম+২য় খন্ড) বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনী

লেখক: Pritom Pallav

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *