আমেরিকার গৃহযুদ্ধ: দাসপ্রথার মুক্তি এবং একক আমেরিকার সৃষ্টি

কিছু কিছু ঘটনা আছে যা ইতিহাসের পাতায় বিশেষ ভাবে স্থান করে নেয়। এই পৃথিবী অনেক যুদ্ধ, সংঘাত, দ্বন্দ্ব দেখেছে কিন্তু মনে রেখেছে মাত্র কিছু বিশেষ ঘটনা। আজ আমরা তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে আলোচনা করব আর তা হল – আমেরিকার গৃহযুদ্ধ – যে যুদ্ধ শিল্প বিপ্লবের যুদ্ধ, এই যুদ্ধ দাস মুক্তির যুদ্ধ, এই যুদ্ধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের যুদ্ধ।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ইতিহাস

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ইতিহাস
আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ইতিহাস

সুদীর্ঘ ব্রিটিশ অপশাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি পেয়ে মার্কিন জাতি খুব দ্রুত উন্নতির দিকে যাত্রা শুরু করে। আর উন্নতি মানেই সম্পদ আর সম্পদ মানেই সংঘাত। আর সেই সম্পদ যদি সুষম ভাবে বন্টিত না হয় তবে সেই সংঘাত অবশ্যম্ভাবী। আর মার্কিন জাতির সম্পদের বণ্টনে রয়ে যায় প্রবল ফারাক। আমেরিকার উত্তরের দেশসমূহ ছিল অধিক উন্নত ও সমৃদ্ধ। এবং তারা নিজেদের কিছুটা সুপিরিয়র ভাবত। কিন্তু সে তুলনায় দক্ষিণের দেশসমূহ (Federal States) ছিল পশ্চাৎপদ অনগ্রসর ও অনুন্নত অবকাঠামোর অধিকারী, যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাব। আর একই দেশের মধ্যে দুই প্রকার অবকাঠামো থাকা মানে অন্যরা পিছিয়ে পরা।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সূচনা

১২ এপ্রিল দক্ষিণ ক্যারোলিনায় কনফেডারেশন হামলা চালালে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সূচনা হয় এবং তা ছড়িয়ে পরে। সম্পদের সুষম বণ্টন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আরো অনেক সমস্যা নিরসনে এবং অখণ্ড যুক্তরাষ্ট্র (Federal States) বজায় রাখতে উত্তরের রাষ্ট্র সমূহ দক্ষিণের নতুন কনফেডারেশনের হুমকি উপেক্ষা করে যুদ্ধ প্রস্তুতি নেয় এবং দক্ষিণ ক্যারোলিনায় সৈন্য সমাবেশ ঘটায়। আসলে তাদের দাবি ছিলো অন্য রকম যা আমরা পরে দেখব। দক্ষিণ ক্যারোলিনার সেনা প্রধান দুইদিন ধরেপ্রচণ্ড যুদ্ধ করে কনফেডারেন্সির সেনাপ্রধানের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। এবং এই আত্মসমর্পণ যুদ্ধে আনে নতুন মোড়।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময়কার মানচিত্র
আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময়কার মানচিত্র

এর মধ্যেই কনফেডারেন্সির সাথে এসে যুক্ত হয় ভার্জিনিয়া, আলাস্কা, উত্তর ক্যারোলিনা ও টেনেসন, মৌসুরি, ম্যারিল্যান্ড (এগুলো হল মার্কিন ফেডারেল স্টেট) কনফেডারেন্সির সাথে সরাসরি যুক্ত হয়নি কিন্তু সমর্থন ছিল। আর এই সমর্থন মানুষিক ভাবে ব্যাপক সাহায্য করেছিলো। অপর দিকে প্রাথমিক ব্যর্থতা কাটিয়ে উত্তরের ২৩ টি দেশ দক্ষিণের এই যুদ্ধে প্রতিরোধে এগিয়ে আসে এবং সক্ষম হয়ও বটে।

শক্তির দিক থেকে উত্তর ছিল সেই সেই সময় কয়েকগুণ এগিয়ে। অধিক জনসংখ্যা, আধুনিক প্রযুক্তি, রেলওয়ে ছিল উত্তরের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধার।আধুনিক প্রযুক্তিগত সাহায্য অনেক এগিয়ে দিয়েছিলো। আমরা জানি একবার টার্কিশরা মিশরের মামলুকদের আক্রমণ করেছিলো। সেই সময় মামলুকরা বলেছিলো “লোহার তৈরি কি সব যেনো এনেছে (কামান), আমরা তরবারি দিয়েই যুদ্ধ করব” সেদিন মামলুকরা বুঝে ছিলো কামান কি জিনিস। আর এই যুদ্ধেও প্রযুক্তি খুব সাহায্য করেছিলো। কনফেডারেন্সির এত সুবিধা ছিল না। তবে তাদের একমাত্র শক্তি ছিল শক্তিশালী সেনাবাহিনী।

প্রথম বড় ধরণের যুদ্ধ ছিল বুলরান যা ২১ জুলাই এর দিকে শুরু হয়। ৩৫,০০০ কনফেডারেন্সের সৈন্য টমাস জনাথনের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তারা খুব সহজেই ফেডারেল অর্থাৎ উত্তরের সৈন্যদের পিছু হটতে বাধ্য করে। আবার যুদ্ধের মোড় অন্য দিকে বাক নেয়। আব্রাহাম লিংকন তাৎক্ষণিকভাবে আরো পাঁচ লক্ষ সৈন্য মোতায়েনে বাধ্য হন। এই পাচ লাখ সোলজার নতুন উদ্দামে যুদ্ধ শুরু করে। অবশেষে ফেডারেলের চূড়ান্ত বিজয় ও কনফেডারেন্সির আত্মসমর্পণের মাধ্যোমে এই যুদ্ধ শেষ হয়।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের কারন

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের কারন
আমেরিকার গৃহযুদ্ধের কারন
  • ক্ষমতার দ্বন্দ্ব: উত্তরের প্রতিনিধিরা নিজেরা ক্ষমতায় থাকতে  তায়। আবার একই ঘটনা ঘটে দক্ষিণের ক্ষেত্রে। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলে তারা সেই ক্ষমতা আকড়িয়ে থাকতে চায়। আর ক্ষমতার মূল ব্যাপার অর্থনীতি। সুতরাং যারা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে তারাই ক্ষমতায় থাকবে। যেহেতু উত্তর – দক্ষিণ দ্বন্দ্ব ছিলো অর্থনৈতিক তাই তা রাজনৈতিক ও বটে।
  • আব্রাহাম লিংকনের ক্ষমতা আসা: আব্রাহাম লিংকনের ক্ষমতায় আসাকে কেন্দ্র করে মানুষ দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
  • উৎপাদন: উৎপাদন ব্যবস্থা সংহিত না থাকা। এর জন্য উত্তর – দক্ষিণ বিভক্ত হয়ে পরে।
  • বাজার ব্যবস্থাপনায় ধস: অর্থনীতি ভেঙ্গে পরে। কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ ছিলো না।
  • শিল্প বৈষম্য: শিল্প বৈষম্যের জন্য উত্তর- দক্ষিণ ভাগ হয়ে যায়।
  • সংবাদমাধ্যমের বিভক্ততা: তারাও রাজনৈতিক উস্কানী মূলক, পপ্রোপাগান্ডা এবং অপপ্রচার শুরু করে। এবং পক্ষপাতিত্ব শুরু করে।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ফলাফল

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ফলাফল
আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ফলাফল
  • আমেরিকার রাজ্যগুলোতে নাগরিক বৈষম্য দুর হয়।
  • শিল্পায়ন, গৃহায়ন, জবাবদিহিমূলক পার্লামেন্ট গঠন করে।
  • দাস প্রথার বিলুপ্তি। এটা ছিলো মানবতার মুক্তি। পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে মানুষ মুক্ত হয়।
  • অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হয়।
  • একক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আর এটাই হল আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 Shares
Share via
Copy link