কোল্ড ওয়ার: ক্ষমতা নিয়ে দুই পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধ

কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের যুগ বলে যে কথা আমরা প্রায়ই শুনি, তা আদতে প্রচলিত যুদ্ধ নয়। মোটা দাগে ১৯৫০-৯০ সাল, এই সময়কালকে বলা হয় কোল্ড ওয়ার সময়কাল, বিশেষকরে আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (পূর্বের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে বর্তমান রাশিয়া ও তার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশ গঠিত হয়েছে) মধ্যে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া নয়, তবে দুনিয়াটাকে দুই শিবিরে ভাগ করে নিয়ে এদের দু’জনের মধ্যে প্রায় সময় বিভিন্ন বিষয়ে রেষারেষি, উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ ইত্যাদি নিয়েই এই স্নায়ুযুদ্ধ। তবে সরাসরি যুদ্ধ লাগানোর পরিস্থিতি দু’পক্ষই এড়িয়ে চলেছিল, পরস্পরকে নানারকম হুমকি-ধমকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছিল। কারণ উভয় শক্তিই জানতো সংঘাত, সমর মাঠে নিয়ে গেলে সেটা একসময় পারমাণবিক যুদ্ধের স্তরে চলে যেতে পারে। এ কারণেই দু’পক্ষের মধ্যে রেষারেষি, উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ যতই থাকুক না কেন তা যেন শেষ বিচারে ‘শান্তই’ থাকে।

কোল্ড ওয়ার – দুই পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধ

কোল্ড ওয়ার চলাকালে আমেরিকা প্রায় ১০৫৪ বার নিউক্লিয়ার পরীক্ষা চালায়
কোল্ড ওয়ার চলাকালে আমেরিকা প্রায় ১০৫৪ বার নিউক্লিয়ার পরীক্ষা চালায়

দুটি দেশই তখন বিশ্বে নিজেদের সুপারপাওয়ার হিসেবে জারি করতে নীরব লড়াইয়ে নেমেছিল। এসময় রাশিয়া মহাকাশ গবেশনায় খুব সাফল্য অর্জন করে। তারা ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর ‘স্পুটনিক’ নামক স্যাটেলাইট পাঠালো মহাকাশে। যা যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষেপীয়েই তুললো বলা চলে। পাল্টা ঘোষণায় আমেরিকা চাঁদে মানব অভিযানের ঘোষণা দেয়, ১৯৬৯ সালে চাঁদে অ্যাপোলো ১১ নামক রকেট পাঠায় নাসা। নীল আর্মস্ট্রং সাথে চাঁদে পা রাখে পৃথিবীর মানুষ। এতে বৈশ্বিকভাবে আমেরিকা যে সুপারপাওয়ার তকমা পেয়ে যায়। ১৯৮৮ সালে রাশিয়া তাদের স্যাটেলাইটের ধরা পরা চিত্রের বিশ্লেষণে করে দাবী করে, চাঁদে আসলে আমেরিকা কাউকে পাঠায়নি। অ্যাপোলো ১১ চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে ফিরে আসে। বরং সে অভিযান নেভাদাতে চিত্রায়িত হয়েছিল বেশ গোপনভাবে।

দুই দেশই সামরিক ক্ষেত্রে নানা ধরণের উদ্ভাবন চালু রেখেছিল। কোল্ড ওয়ারের শুরু থেকেই আমেরিকা,সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধু দেশগুলোকে চাপে রাখার চেষ্টা করে। আমেরিকা জানতো, সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে আমেরিকাতে ম্যাসিভ এয়ার স্ট্রাইক করার শক্তি নেই। কারন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে তেমন ভাল কোন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ছিল না, যে একটিমাত্র এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ছিল সেটাও আমেরিকান ক্যারিয়ার গুলোর তুলনাতে অনেক ছোট। তাই তারা রাশিয়ান বিমানবাহিনীকে বড় হুমকি হিসেবে না ভেবে নিজেদের এয়ারফোর্সকে শক্তিশালী করে তুলেছিল।

অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের তার সেনাবাহিনীকে অস্বাভাবিকভাবে বড় করে তোলার কাজে লেগে যায়। তারা জানতো যে তারা আমেরিকাকে আকাশযুদ্ধে হারাতে পারবে না বরং আমেরিকা প্যাসিফিক ও অ্যাটল্যান্টিক মহাসাগরে নিজেদের পূর্ণ প্রভাব খাটাতে চাইবে। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা হাতে নেয় যাতে বাল্টিক সাগর,ব্ল্যাক সি, উত্তর সাগর, প্যাসিফিকের পশ্চিম অংশ, অ্যাটল্যান্টিকের পূর্ব অংশ যেন তাদের নিজের অধীনে থাকে। এই উদ্দেশ্যে তারা ব্যাপক হারে সাবমেরিন, ডেস্ট্রয়ার, ব্যাটলশিপ, ব্যাটল ক্রুজার গবেষণায় আর বেশি বিনিয়োগে মনোযোগ দেয়।

কোল্ড ওয়ারের প্রভাব

মার্কিন নৌবাহিনী ১৯৭০ দশকের প্রথম দিকে একটি সোভিয়েত বিমানকে বাধা দেয়
মার্কিন নৌবাহিনী ১৯৭০ দশকের প্রথম দিকে একটি সোভিয়েত বিমানকে বাধা দেয়

কোল্ড ওয়ার সমগ্র বিশ্বের রাজনীতিকে বদলে দিয়েছে দারুণভাবে। এমনকি আমাদের দেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও এই কোল্ড ওয়ারের ভুমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের সাহায্যে যখন সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল আমেরিকা, তখন নিউক্লিয়ার মিসাইলবাহী সাবমেরিন পাঠিয়ে আমেরিকান নৌবহরকে ভারত মহাসাগরে ঢুকতে বাধা দিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন।

বার্লিন ক্রাইসিসের সময় চেকপয়েন্ট চার্লিতে সোভিয়েত ও আমেরিকান ট্যাংক
বার্লিন ক্রাইসিসের সময় চেকপয়েন্ট চার্লিতে সোভিয়েত ও আমেরিকান ট্যাংক

অন্যদিকে কিউবা আর ইরাককে শায়েস্তা করবার জন্য আমেরিকা তৈরি করেছিল আফগান মুজাহিদ আর তালেবান। পরবর্তীতে যা আমেরিকার জন্য শুধু হুমকিই না, বিশ্বে এক নতুন ধরণের সন্ত্রাসবাদ চালু করে। সবশেষে আমেরিকা কোল্ড ওয়ারে নিজেরদের সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে দেয়ার মাধ্যমে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখে আমেরিকা।

অন্যদিকে নতুন রাশিয়া শক্তিশালী হয়ে উঠার আগে পুরো পৃথিবী চলে আসে আমেরিকার হাতের মুঠোয় – সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং অন্য অনেক বিষয়েই তারা এগিয়ে যায় রাশিয়া থেকে। যুদ্ধে জিততে কি না করেছে আমেরিকা, এমনকি প্রলয়ঙ্কারী মহামারী এইডসের সূচনা এই স্নায়ুযুদ্ধের বদৌলতে, আমেরিকার হাতেই! স্নায়ুযুদ্ধেই ইউরোপ তার মুকুট হারায় বৈশ্বিক রাজনীতিতে। তবে, আমেরিকা থেকে এই ঠাণ্ডা যুদ্ধে রাশিয়ার সাথে বেশী দন্দ হয়েছিল ব্রিটেনের।

ক্ষমতা নিয়ে এই দুই পরাশক্তির যে যুদ্ধ, তা সীমিত আকারে এখনও কিন্তু চলছে। এই যুদ্ধই আমাদের দেখিয়েছে, মাঠে নয় – যুদ্ধ হতে পারে দাবার বোর্ডের মত জায়গাতেও। আমেরিকা তার ক্ষুরধার বুদ্ধিতেই কাবু করে নিয়েছে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রন নিজেদের কাছে।

লেখক: Pritom Pallav

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 Shares
Share via
Copy link