দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, কারণ এবং ফলাফল

আমরা জানি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানী পরাজিত হয়েছিল কিন্তু তারা মানুষিক ভাবে এই পরাজয় মেনে নেয় নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধটা হঠাৎ করে হয়ে গেলও এই  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল কিছুটা পরিকল্পিত বা পুরোমাত্রায় পরিকল্পিত। জার্মানী-ইটালি এবং জাপান পরিকল্পিতভাবে বা কিছুটা আগ্রাসী অমনভাব চরিতার্থে এই যুদ্ধের অবতারণা করে, যা শুধু  তৎকালীন বিশ্ব ব্যাবস্থাই পরিবর্তন আনেনি বরং বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় ছাপ ফেলে যায়। আমাদের এই মানব সভ্যতার ইতিহাসে এযাবৎ কালে যত যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর সংঘাতের নাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যা বয়ে এনেছিলো রক্ত স্রোত, চরম বিপর্যয় এবং নৃশংসতা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন দৃশ্য
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন দৃশ্য

জার্মানির হিটলারের নাৎসি বাহিনীর আক্রমণে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এ যুদ্ধ। এমনকি আমাদের উপমহাদেশীয় ইতিহাসেও এটা ইতিহাসের ছাপ রেখে যায়। আমাদের সুন্দর বনে সেই সময় একটি বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়। এই যুদ্ধে  প্রায় ৭ কোটির বেশি মানুষ ও সেনাসদস্যের প্রাণহানি ঘটে। এবং অসংখ্য মানুষ ঘর-বাড়ি হারায়। ইতিহাসের আবক্ষে  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একটি রক্তাক্ত বিন্দু যা আজো আমাদের শিহরিত করে। আজো হলিউড এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে মুভি তৈরি করে এবং আজো নুরেম বার্গ ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ

১. ভার্সাই সন্ধি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্রপক্ষ (England, France, United States and Russia) পরাজিত জার্মানির ওপর ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়ে দেয়। এমনকি এই ক্ষতিপূরণ আদায়ের সময় জার্মানির প্রতিনিধিগণ অপমানকর অবস্থায় পরেন। তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করা হয়নি। এমনকি বন্দিদের মত ব্যবহার করা হয়। সন্ধির শর্ত সম্পর্কে প্রতিনিধিদের মতামত সম্পূর্ণ  উপেক্ষা করে তাঁদের সন্ধিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং স্বাক্ষর করেছিলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এয়ারক্রাফ্ট
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এয়ারক্রাফ্ট

সেই একতরফা, অপমানকর, অপ্রেসিভ চুক্তিকে জার্মানির জনগণ কোনো দিনই মেনে নেননি এবং তারা মনে প্রাণে চাইতো এর থেকে বেড়িয়ে আসতে। ইতিমধ্যে জার্মানি ভিতরে সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক, সামাজিক অবকাঠামো এবং অন্যনাম বিষয়  সুসজ্জিত করে তোলে। জার্মানির জনগণের সেই জনরোষকে কাজে লাগায় এবং অপমানের প্রতিশোধ নিতে হিটলারের আহ্বানে সাড়া দেয়। তাইত মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যেই অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি জার্মানি ভার্সাই সন্ধির সমস্ত অপমানজনক চুক্তি অবজ্ঞা করে। কয়লা, সামরিক, সাবমেরিন সংক্রান্ত বাধা উপপেক্ষা করে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বলা যেতে পারে ভার্সাই সন্ধির কঠোরতার মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল।

২. ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রভাত বিস্তার

নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত থাকার জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে মত বিরোধ দেখা দেয়। হিটলার তার নিজ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তা কেউ লক্ষ্য করেনি বা লক্ষ্য করলেও দুই বৃহৎ গণতন্ত্রী রাষ্ট্রের (?) এই মতবিরোধ ফ্যাসিবাদী শক্তির বিস্তারকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল। অপর দিকে জাপান – ইটালির উত্থান ছিলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং হিটলার
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং হিটলার

৩. জাতি পুঞ্জের ব্যর্থতা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান এবং সেই সঙ্গে বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য লিগ অফ নেশনস বা জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু জাতিসংঘের ব্যর্থতার জন্যই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটে এবং ফ্যাসিবাদী ও নাৎসিবাদী একনায়কতন্ত্রের উত্থান হয়, যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ববাসী আরও একটি ভয়াবহ ও নৃশংস বিশ্বযুদ্ধের সম্মুখীন হয়।

৪. যুদ্ধবাজ মনভাব

সেই সময়টাই ছিলো যুদ্ধের যুগ। চারিদিকে শত্রুতা, অবিশ্বাস এবং অর্থনৈতিক ডিপ্রেশান। সব কিছু মিলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলো তা ছিলো যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত। পৃথিবী এত বড় যুদ্ধ আগে কখনো দেখেনি এবং আমাদের চাওয়া হল এমন যুদ্ধ যেন আর কেউ না দেখে। জার্মানির পরাজয়, কোল্ড ওয়ার, নিউক্লিয় ধ্বংসযজ্ঞ, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা ইত্যাদি ইস্যু আজ আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি এই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল

  • জার্মানির পরাজয়: এই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জন্য জার্মানি পরাজিত হয়ে চড়ম দুর্ভগের শিকার হয়। জার্মানির অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো, সামরিক সক্ষমতা ভেঙ্গে পরে।
  • পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার: পৃথিবী পরমাণু অস্ত্রের ধ্বংসযজ্ঞ অবলোকন করে। যা বিশ্ব মানবতার জন্য হুমকি সরূপ।
  • জাপানের পতন: জাপান আমেরিকার পার্ল হারবারে আক্রমণ করার জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পরে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংযজ্ঞের সাক্ষী হয়।
  • ইতালির পতন: ইটালির মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরু করেছিলো তা নিরসন হয়।
  • দ্বি-মেরুর সৃষ্টি: পৃথিবী দুই ব্লকে বিভক্ত হয়ে যায়। মার্কিন ব্লক এবং রাশিয়ান ব্লক।
  • কোল্ড ওয়ারের যাত্রা: এই যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ু যুদ্ধ শুরু হয়।
  • মার্কিন আধিপত্য বিস্তার: এই যুদ্ধের দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব দরবারে আগমন করে।



error: