দ্য পিগ ওয়ার: একটি শূকরকে কেন্দ্র করে মহাশক্তিধর দুটি দেশের হাস্যকর যুদ্ধ

যুদ্ধ শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে অদ্ভুতসব পোশাক পরিহিত, অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যবাহিনী ও তাদের সাথে থাকা বিদ্ধংসী কামান, ট্যাংক আর যুদ্ধজাহাজ, যারা কিনা খুবই গুরুতর কোনো কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেছে। সত্যিই তো তাই, উপযুক্ত কারণ ছাড়া কেনই বা কেউ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করতে আসবে!

আপনার ধারণা যদি হয় এমনই, তাহলে আজ নিশ্চয়ই আপনার ধারণা পালটে যাবে। কারণ নিছক অপ্রয়োজনীয় ও হাস্যকর কিছু অজুহাতে যুদ্ধ হয়েছে এমন উদাহারণের সংখ্যা ইতিহাসের পাতায় মোটেও কম নয়। তেমনি একটি হল – দ্য পিগ ওয়ার (The Pig War) বা শূকর যুদ্ধ। নাম দেখেই কিছুটা ধারণা করা যায় যুদ্ধটা কি নিয়ে! আমেরিকা ও গ্রেট ব্রিটেনের (বর্তমান যুক্তরাজ্য) মতো মহা শক্তিধর দুটি দেশের মাঝে এত ছোট একটি কারণে যুদ্ধ হওয়াটা নিঃসন্দেহে হাস্যকর আর তাই ঐতিহাসিকগণও এ যুদ্ধকে ‘অদ্ভুত কারণে ঘটে যাওয়া যুদ্ধের‘ তালিকায় শীর্ষে রাখেন।

দ্য পিগ ওয়ার বা শূকর যুদ্ধ

জুন, ১৮৫৯, সান জুয়ান নামক এক অতি উর্বর আইল্যান্ড কোন দেশের অধিনে তা নিয়ে বিরাজ করছিল অগাধ সংশয়। একদিকে আমেরিকা বলছে এটি তাদের, অন্যদিকে ব্রিটেনও দাবী করছে এটি থাকবে তাদের অধিনে। কেউ ছাড় দেবার পাত্র নয়। কোনো সমাধান না হওয়ায় বেশ কিছু বছর আগে থেকেই দু’দেশ থেকেই মানুষ গিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেছিল।

১৮৫৯ সালের সান জুয়ান দ্বীপপুঞ্জের পিগ ফার্ম
১৮৫৯ সালের সান জুয়ান দ্বীপপুঞ্জের পিগ ফার্ম

কাল্টার ছিল সেইসব মানুষের মাঝে যারা ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় আমেরিকা থেকে এই দীপে এসে বসবাস শুরু করে। তার বাসার সাথেই নিজ হাতে গড়া আলুর ক্ষেত। আর ক্ষেতের পাশে তার ‘ভালো’ প্রতিবেশী গ্রিফিন, যিনি এসেছেন ব্রিটেন থেকে, কিছু শূকর পালতেন। স্বাভাবিকভাবেই শূকর আলুর ক্ষেতে ঢুকে কাল্টারের পরিশ্রম নষ্ট করত! কিন্তু ভালো সম্পর্কের খাতিরে কাল্টার তেমন কোনো পদক্ষেপ নিত না। কিন্তু সকলেরই তো ধৈর্যের একটা সীমা থাকে! কাল্টার যেহেতু একজন মানুষ, তাই তারও ধৈর্য্য সীমাহীন নয়। তার ধৈর্যের বাঁধটা ভাঙে ১৫ জুন, সেদিনো রোজকার মত গ্রিফিনের শূকর তার আলুক্ষেতে ঢুকে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করছিল!কাল্টার কিছু না ভেবেই, বন্দুকে বারুদ ভরিয়ে শুট করলেন শূকরটাকে, অমনি তা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল!

গ্রিফিন ব্যাপারটা জানতে পারার পর তাদের দুজনের মাঝে বেশ কিছুক্ষণ চলল তর্কযুদ্ধ। যদিও শেষ পর্যন্ত কাল্টারই তার কাছে ক্ষমা চাইল এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুত দিল! কিন্তু গ্রিফিনের ১০ ডলারে কিছু হবে না, সে বরং চেয়ে বসল ১০০ ডলার!!

গ্রিফিনের দাবী শোনার পর তাদের মাঝে যে কথোপকথন হয় তা ছিল কিছুটা এরকম :-
কাল্টার: আসলে আমার এক পেনিও দেওয়া উচিত না কেননা তোমার শূকর আমার আলুর ক্ষেতে ঢুকে আলু খেয়েছে।
গ্রিফিন: তোমার আলুকে আমার শূকর থেকে দূরে রাখা সম্পূর্ণ তোমার দায়িত্ব!

বলা বাহুল্য, কাল্টার তাতে মোটেও রাজি হয়নি। আর তাই গ্রিফিন ব্রিটিশ অথোরিটিকে অনুরোধ করে তাকে গ্রেফতার করতে। বাকি আমেরিকানরা এটাকে মোটেও সুবিধাজনক মনে করেনি, তারাও আমেরিকান অথোরিটিকে ব্যাপারটা জানায় এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য আর্মি পাঠানোর অনুরোধ করে। আমেরিকার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উইলিয়াম এস হ্যারনি ক্যাপ্টেন জর্জ পিকেটের নেতৃত্বে ৬৬ সদস্যের একটি সৈন্যদলকে সেখানে পাঠায়। এটি জানার পর ব্রিটিশরাও বসে থাকে না, ব্রিটিশ রয়েল নেভি তাদের তিনটি যুদ্ধ জাহাজ সেই আইল্যান্ডে পাঠায়।

এভাবে দুটি দেশ থেকেই যুদ্ধের জন্য সৈন্য ও সরঞ্জাম আনা হতে থাকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত। সব মিলিয়ে আমেরিকা আনে ১৬ টি কামান ও প্রায় ৪৬১ জন সৈনিক অন্যদিকে ব্রিটেন নিয়ে আসে ৫ টি রণতরী যেখানে ছিল ৭০টি মেশিন গান, আর ২১৪০ জন সৈনিক! কিন্তু এত দিনেও একটি গুলিও কেউ ছোড়েনি। কারন দুপক্ষকেই আদেশ দেওয়া হয়েছিল- বিপক্ষ দল শুট না করা পর্যন্ত কেউ শুট করবে না। কারন যে দেশ প্রথমে শুট করবে সে দেশকেই যুদ্ধের আরম্ভকারী হিসেবে ধরা হবে, আর কোনো দেশই চায় না এই হাস্যকার কারনের যুদ্ধের আরম্ভকারী হতে! তাই দুপক্ষই তাদের বিপরীত দলকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ও গালি দিয়ে রাগিয়ে তোলার চেষ্টা শুরু করল যাতে তারা প্রথমে শুট করে! কিন্তু সৌভাগ্যবশত কেউ প্রথমে শুট করার দায়িত্ব নিল না।

এদিকে ওয়াশিংটন ও লন্ডনে খবরটি পৌছে গেলে বিশ্বব্যাপী এটি নিয়ে হাস্যকর পরিস্থিতির অদ্ভব হয়। ওয়াশিংটন থেকে প্রেসিডেন্ট জেমস বুকানন তাৎক্ষনিক অ্যামেরিকান সৈন্যদের আদেশ দেন আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে যাতে একটি শূকরের জন্য মানুষকে মরতে না হয়! নিঃসন্দেহে এটি একটি বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত ছিল যার কারনে শত শত মানুষের জীবন রক্ষা পায়। শেষে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হল এবং ‘পিগ ওয়ার’ কোনো ধরণের রক্তপাত ছাড়াই একটি ওয়ার বা যুদ্ধর খেতাব পেল। বর্তমানে দুটি দেশেরই তৈরিকৃত সেনা ঘাটি সেই দীপে সুরক্ষিত রয়েছে এবং ঘাটিতে নিজ নিজ পতাকা উড়ছে দেশ দুটির বন্ধুত্বের নিদর্শনসরূপ।

পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। পোস্টটি আপনাদের ভালো লাগলে কমেন্ট এবং শেয়ার করতে কার্পণ্য করবেন না। আপনাদের কমেন্ট এবং শেয়ার আমাদেরকে আরো বেশি লিখতে অনুপ্রেরণা যোগায়?।



error: