প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, কারণ এবং ফলাফল

পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত যত যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে এর মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অন্যতম। প্রাচীন সভ্যতার উত্থান – পতন থেকে আধুনিক ইতিহাসের বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশ পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়েছে এর সবকিছু কে ছাড়িয়ে গেছে এই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত সংঘটিত এই মহাযুদ্ধের ব্যাপ্তি, হতাহতের সংখ্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ অতীত কালের সকল যুদ্ধের নৃশংসতা কে হার মানিয়েছে! শুধু তাই না, যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা বিশ্ব আগে কখনো অবলোকন করেনি। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ১৯১৪ সালের জুলাই মাসের ২৮ তারিখে শুরু হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধের খন্ডাংশ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধের খন্ডাংশ

শুরুটা হয় অস্ট্রো-হাঙ্গেরি এবং সার্বিয়ার মধ্যে এবং কিছু দিনের মধ্যেই পুরো ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পরে। পরবর্তিতে এই আগুন আটলান্টিক পার হয়ে মার্কিনমুলুকে যাত্রা করে এবং এশিয়ার কিছু দেশও এই ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে। আর এই কারনেই এটাকে বলা হয় মহাযুদ্ধ বা বিশ্বযুদ্ধ। এবং প্রথম বারের মতো বিশ্বযুদ্ধ বা মহাযুদ্ধ হয়, তাই এটাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বলা হয়। দুই ব্লকে বিভক্ত পরাশক্তিদের মাঝে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়।

এটা শুধু আস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফ্রান্সিস ফার্দিনান্দের এবং তার স্ত্রীর হত্যার জন্য শুরু হয়না, বরং এটা ছিলো একটি স্ফুলিঙ্গ মাত্র। যা আগে থেকে জ্বলতে অপেক্ষায়  থাকা তেলে আগুন দেয়। এর পিছে আছে কিছু গভীর কারণ, যা আমরা নীচে দেখব। শুধু একজন কে বা দুই জন কে হত্যার জন্য বিশ্ব এই রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষী হয়নি। এর পিছে ছিলো, অর্থনীতি, গোপন চুক্তি, রাজনৈতিক কারণ, ত্রিশক্তি এবং আরো অন্যান্য কারণ। যা আমরা সংক্ষেপে দেখব।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ

অর্থনৈতিক কারণ: International Political Economy, Marxism এর মতে সব কিছুই অর্থনীতির সাথে যুক্ত এবং বিশ্বের সকল ইতিহাস হলো অর্থনৈতিক ইতিহাস (Class Discrimination – শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস)। প্রথম মহাযুদ্ধের পুর্বে ইউরোপের অন্যান্য দেশ, আফ্রিকা, এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকাতে নিজ নিজ কলোনি স্থাপন করে ফেলেছিলো।

ব্রিটিশ এবং ফ্রান্স অর্থনৈতিক ভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও জার্মান দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছিলো। সেই সময় জার্মান পণ্য ব্রিটিশ পণ্যের বাধার সম্মুখীন হয়। আগের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পাশে আরেকটি নতুন শক্তির আগমন ঘটে। যার ফল দ্বন্দ্ব। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাতের সূচনা করে যা পরবর্তীকালে বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়।

গোপন চুক্তি: ১৮৭২ সালে বার্লিন এক সম্মেলন আহ্বান করে। এবং জার্মানি, রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার মাঝে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই সম্মেলনে জার্মানির সম্রাট প্রথম উইলিয়াম, রাশিয়ার জার – প্রথম আলেকজান্ডার এবং অস্ট্রিয়ার সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিস উপস্থিত হন। এই তিন সম্রাটের চুক্তি ইতিহাসে আজো ত্রিশক্তির চুক্তি নামে পরিচিত।

আবার ১৮৭৭-১৮৭৮ সালে রুশ-টার্কিস যুদ্ধে এই মৈত্রীর কার্যকারিতা বিনষ্ট হয়। এবং রাশিয়া এই ত্রিশক্তির চুক্তি থেকে বেড়িয়ে যায়। আবার অন্য দিকে জার্মান খুব দ্রুত অস্ট্রীয়ার সাথে চুক্তি করে। মূলত এই সময় ইউরোপ ছিলো গোপন চুক্তির আতুর ঘর। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। আর এই অবিশ্বাস বয়ে আনে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ!

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত ট্যাংক
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত ট্যাংক

রাজনৈতিক কারন: সেই সময় ইউরোপে গণতন্ত্রের অভাব পরিলক্ষিত হয়। সবাই ছিলো সম্রাজ্য বিস্তারে ব্যস্ত। আগ্রাসী মনোভাবে নিমগ্ন। যেহেতু রাজনৈতিক অবস্থা ছিলো চড়ম আকারে অস্থিতিশীল, তাই সেই সময়কার রাষ্ট্র প্রধানগণ আলোচনায় না যেয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পরেছিলো।

উগ্র জাতীয়তাবাদ: এটা  ছিলো প্রধান করনের একটি। যা সেই সময় রাষ্ট্র প্রধানদের ভাবতে বাধ্য করিয়েছিলো যে তারাই শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য জাতি তাদের মতো শ্রেষ্ঠ না। আর এটা ছিলো যুদ্ধের অন্যতম বড় কারন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল চড়ম দারিদ্র্যতা বয়ে আনে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বীজ বপন। জার্মানির পরাজয় এবং এই পরাজয় ছিলো জার্মানির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং জাতিগত অপমান। যার প্রতিশোধ সরূপ আমরা দেখতে পায় আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধ। আর যুদ্ধ নয়, আর নয় রক্ত! এটাই আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত। যুদ্ধ কিছুই দেয় না, শুধু কেড়ে নেয় প্রাণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যার জ্বলন্ত প্রমাণ।

লেখক: রকিব হাসান



error: