টপ ৫: সর্বকালের সেরা ৫ ফুটবল অধিনায়ক

সেরা ফুটবল অধিনায়ক হওয়ার জন্য একজন ফুটবলারের অনেকগুলো ভালো গুণাগুণ থাকা প্রয়োজন। যেমন: নেতৃত্বগুণ, অভিজ্ঞতা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, মাঠে নিজে এবং দলের অন্যান্য খেলোয়াড়দের মেজাজ ঠান্ডা রাখা, খেলোয়াড়দের প্রেরণা দেওয়া ইত্যাদি। মাঠে তাদের স্বরব উপস্থিতি থাকে। আর তাদের দায়িত্ব শুরু হয় ম্যাচ শুরুর আগে টস করা থেকে। আর শিরোপা জয়ের পর প্রথম অধিনায়কই ট্রফিটা উচূ করে ধরেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ফুটবল মাঠে, একজন অধিনায়কের অনেক দায়িত্বই আছে। আর যারা আছেন সর্বকালের সেরা ৫ ফুটবল অধিনায়ক দের লিস্টে, তারা অবশী এই দায়িত্বগুলো ভালোভাবেই করেছেন।

এখনো পর্যন্ত অনেক ফুটবল অধিনায়কই এসব দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করেছেন এবং দলকে সফলতা এনে দিয়েছেন। তার নিচে এদের মধ্যে এমন কয়েকজন সেরা ফুটবল অধিনায়ককে তুলে ধরা হয়েছে যারা তাদের অধিনায়কত্ব দিয়ে তার দলকে শিরোপা এনে দিয়েছেন; সফলতা এনে দিয়েছেন। তো চলুন দেখে নেই কারা সেই সর্বকালের সেরা ৫ ফুটবল অধিনায়ক।

সর্বকালের সেরা ৫ ফুটবল অধিনায়ক

৫. অব্দুলিও ভারেলা

অব্দুলিও ভারেলা
অব্দুলিও ভারেলা

আমাদের সর্বকালের সেরা ৫ ফুটবল অধিনায়ক দের লিস্টে ৫ম স্থানে আছেন অব্দুলিও ভারেলা, যিনি শত বাধা থাকা শর্তেও উরুগুয়েকে ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ জয়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই বিশ্বকাপের ফাইনালে যখন উরুগুয়ে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয় তখন উরুগুয়ের ফুটবল ফেডারেশন পর্যন্ত ভয় পেয়েছিলো। আর উরুগুয়ে দলকে সাবধান করে দিয়েছিলো যাতে বেশি গোল খেয়ে দলকে লজ্জায় ফেলে না দেয়। এমনকি শোণা যায় এও বলেছিল যে, “৪ টি গোল খেলেও সমস্যা নেই”। কিন্তু ভারেলা এই মানসিকতা গ্রহন করেনি বরং তার সতীর্থদের বলেন, “যা শুনেছো ভুলে যাও। স্টেডিয়ামের লক্ষাধিক দর্শেকদের উপেক্ষা করে শুধু নিজেদের খেলাটাই খেলো”।

ভারেলার উদ্দীপ্ত ভাষনের পরেও উরুগুয়ে প্রথমার্ধে ১ গোল খেয়ে বসে। তবে শেষ পর্যন্ত ভারেলার অসাধারন নেতৃত্বগুণে উরুগুয়ে ব্রাজিলকে তাদের নিজের দেশেই ফাইনালে ২-১ গোলে পরাজিত করে। তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন “দ্য ব্ল্যাক চীফ” নামে। আর ভারেলা খেলেছে বিশ্বকাপের এমন কোন ম্যাচে উরুগুয়ে হারেনি।

তিনি উরুগুয়ে জাতীয় দলের হয়ে ১৯৪২ সালে কোপা আমেরিকাও জিতেন। এছাড়া তার ক্লাব পেনারল এর হয়ে অব্দুলিও উরুগুয়ের লীগ ও বিভিন্ন সম্মানীয় লীগ ও টুর্নামেন্ট জিতেছেন।

৪. ফ্র্যাঙ্কো বারেসি

ফ্র্যাঙ্কো বারেসি
ফ্র্যাঙ্কো বারেসি

ফুটবল ইতিহাসের সেরা কিছু চরিত্রের মধ্যে অন্যতম হলো এই ফ্র্যাঙ্কো বারেসি। ফুটবলের প্রতি ছিলেন খুবই প্যাশনিয়েট। ইন্টার মিলান থেকে রিজেক্ট হয়ে তিনি এসি মিলানে নাম লেখান। সেখানে ১৭ বছর বয়সেই তিনি তার প্রথম ম্যাচ খেলেন। ১৯৮৯ সালে নেদারল্যান্ডস এর বিপক্ষে তিনি পুরো দ্বিতীয়ার্ধ ভাঙা হাতেই খেলেন। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে বারেসি ইন্জুরিতে পড়লেও দেশে ফিরে যাননি বরং কঠোর মনোবলের মাধ্যমে ফাইনালের আগেই সুস্থ্য হয়ে উঠেন।

১৯৮২ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সেই তিনি এসি মিলানের অধিনায়ক হন। এরপর তিনি প্রায় ১৫ বছর সেখানে অধিনায়ক হিসেবে ছিলেন। তার শুরুর দিকে এসি মিলান দুই বার রেলিগেটেড হলেও তিনি নেতৃত্ব নেওয়ার পরই এসি মিলান ছয়টি সিরিআ টাইটেল, তিনটি চ্যাম্পিয়নস লীগ, চারটি সুপারকোপা, তিনটি ইউএফা সুপার কাপ, দুইটি ইন্টার কন্টিনেন্টাল কাপ এবং একটি মিট্রোপা কাপ জয় করে।

শুধুমাত্র সাফল্যের জন্যই নয় ফুটবল মাঠে তার নেতৃত্ব এবং ফুটবলের প্রতি তার গভীর ভালবাসার জন্যই আজও তিনি এসি মিলান তথা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধিনায়ক বিবেচিত হন।

৩. ইকার ক্যাসিয়াস

ইকার ক্যাসিয়াস
ইকার ক্যাসিয়াস

ইকার ক্যাসিয়াস ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র ক্যাপ্টেন হিসেবে আটটি বড় শিরোপা জিতেছেন। যেগুলো হলো: লা লীগা (স্প্যানিশ লীগ), কোপা ডেল রে, স্প্যানিশ সুপার কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, ইউরোপিয়ান সুপার কাপ, ক্লাব বিশ্ব কাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউরো কাপ) এবং বিশ্বকাপ। আর তাই সেরা অধিনায়ক দের লিস্টে তার নাম থাকাটা যথার্থ। তিনি আমাদের সেরা অধিনায়কদের এই লিস্টে ৩য় স্থানে রয়েছেন। তবে অধিনায়কের পাশাপাশি ফুটবলার হিসেবেও ক্যাসিয়াস সেরা। তিনি সর্বকালের সেরা গোলকিপারদের একজন

রিয়ালের আরেকজন লীজেন্ডারী অধিনায়ক রাউল গন্জালেস এর পর ২০১০ সালে তিনি রিয়ালের অধিনায়কত্ব তুলে নেন। আর পরে ক্লাবের মত স্পেন জাতীয় দলেও ২০০৮ সালের রাউলের পর ক্যাসিয়াস অধিনায়ক হন। অধিনায়ক হওয়ার পর ২০০৮ সালেই ইউরো জিতে দেশকে ৪৪ বছর পর বড় কোন শিরোপা এনে দেন। আর ২০১০ সালে স্পেনকে প্রথম বারের মত বিশ্বকাপ এনে দেন। এর আগে মাত্র দুই জনই গোলকিপার এবং অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন। ২০১২ সালে ইউরো জয়ের মাধ্যমে প্রথম বারের মত কোন দল ইউরো-বিশ্বকাপ-ইউরো জিতেছে। অধিনায়ক হিসেবে মাঠে তিনি খেলোয়াড়দের উজ্জিবিত করছেন এবং অনেক সাহসী এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যার প্রমান ক্যারিয়ার জুড়ে তার সফলতা। তাই নিঃসন্দেহে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবল অধিনায়ক।

২. ববি মুর

ববি মুর
ববি মুর

সর্বকালের সেরা ৫ ফুটবল অধিনায়ক এর লিস্টে ২য় স্থানে আছেন ববি মুর। তিনি ইংল্যান্ড ফুটবল দলের সর্বকনিষ্ঠ অধিনায়ক। মাত্র ২২ বছর বয়সেই তিনি ইংল্যান্ড জাতীয় দলের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পান। তবে প্রথমদিকে এটা তার উপরে একটা বড় চাপ ছিলো কারন ইংল্যান্ডের মত দলের উপর এমনিতেই প্রত্যাশা একটু বেশি থাকে। তবুও তিনি সে দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করেছেন। ববি চার্লটনের মতে তিনি হচ্ছেন “জাত অধিনায়ক”। আর ১৯৭০ সালে যখন ইংল্যান্ড পেলের ব্রাজিলের সাথে ১-০ গোলে হারে তখন পেলে ববি মুরকে সেরা প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার বলে আক্ষ্যায়িত করেন।

ববি মুর ইংল্যান্ড ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জিতেছেন। আর ১৯৬৮ সালে UEFA Euro তে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছেন। ক্লাব পর্যায়ে তিনি বেশির ভাগ সময়ই খেলেছেন ওয়েস্ট হাম ইউনাইটেড এর হয়ে। এছাড়া তিনি ফুলহাম, সিটেল সাউন্ডার্স, হার্নিং ফ্রিমাদ এর হয়েও খেলেছেন। তার নেতৃত্বগুন হ্যামারদের জন্যও উজ্জ্বল ছিলো। ওয়েস্ট হামের হয়ে মুর ১৯৬৪ সালে এফএ কাপ এবং সেই বছরই ইন্টারন্যাশনাল সকার লীগ জিতেন। ১৯৬৫ সালে UEFA Cup winners’ Cup জিতেছেন।

১. ফ্রান্জ বেকেনবাওয়ার

ফ্রান্জ বেকেনবাওয়ার
ফ্রান্জ বেকেনবাওয়ার

আন্তর্জাতিক এবং ক্লাব পর্যায়ে একজন ফুটবলার এবং ফুটবল অধিনায়ক হিসেবে যা কিছু জিততে পারা যায়, তার সবকিছুই জিতেছেন ফ্রান্জ বেকেনবাওয়ার। তার খেলার সৌন্দর্য, ক্ষমতা, ইস্পাত কঠিন সংকল্প এবং দুর্দান্ত ইচ্ছাশক্তি সবকিছুর ঝলক ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপেই দেখা যায়। যেখানে জার্মানি “দ্য গেম অফ দ্য সেন্ঞুরি” খ্যাত ম্যাচে, যেখানে তারা ইতালির কাছে ৪-৩ গোলে হারে। বেকেনবাওয়ার ঐ ম্যাচে স্থানচ্যুত কাঁধ এবং হাত বেধে খেলেন। এরপর ২৪ বছর বয়সে তিনি পশ্চিম জার্মানির অধিনায়ক এর দায়িত্ব পান। যদিও এর আগেই তিনি বায়ার্ন মিউনিখ এর অধিনায়কত্ব করেন।

অধিনায়ক হিসেবে বেকেনবাওয়ার তার প্রথম দুইটি বড় টুর্নামেন্টেই পশ্চিম জার্মানি কে চ্যাম্পিয়ন করে। যার একটি হলো ১৯৭২ সালের ইউরো এবং ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের ফাইনালে তার দল ক্রুইফের “টোটাল ফুটবল” খ্যাত নেদারল্যান্ডস কে পরাজিত করে। ক্লাব লেভেলেও অধিনায়ক হিসেবে তিনি দারুন সফল। তিনি মোট পাঁচটি বুন্দেসলীগা টাইটেল, চারটি ডিএফপি-পোকাল কাপ, তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ, একটি কাপ উইনার্স কাপ এবং এবং একটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জিতেন।

ফ্রান্জ বেকেনবাওয়ার এর ব্যক্তিগত সাফল্যও কম নয়। এরমধ্যে সবচেয়ে উল্লেকযোগ্য হলো ২ টি ব্যালন ডি’অর জয়। এছাড়া তিনি চার বার বর্ষসেরা জার্মান প্লেয়ার হয়েছেন এবং ভিন্ন তিনটি বিশ্বকাপে সেরা একাদশে জায়গা করে নেন। জার্মানদের কাছে ফ্রান্জ বেকেনবাওয়ার “কাইজার” নামে পরিচিত যার অর্থ সম্রাট। সত্যিকারেই তিনি ফুটবল ইতিহাসের সম্রাট। তার অসাধারন অধিনায়কত্ব দিয়েই তিনি ফুটবল সমর্থকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। আর তাই তিনিই আমাদের সর্বকালের সেরা ৫ ফুটবল অধিনায়ক এর লিস্টে প্রথম স্থানে রয়েছেন।

স্পেশাল সম্মাননা: ফ্রান্সিসকো গেন্টো, টনি অ্যাডামস্, রয় কেন, কার্লেস পুয়োল, ডিয়াগো ম্যারাডোনা, ফ্রান্সসকো টট্টি, স্টিভেন জেরার্ড, পাওলো মালদিনি, জিয়াওনলোজি বুফন।



error: