ব্রেক্সিট কি? প্রিমিয়ার লীগ তথা ফুটবলে ব্রেক্সিট এর প্রভাব

২০১৭ সালের জুন মাসের ২৩ তারিখ, বৃহস্পতি বার ব্রিটেনে (ইংল্যান্ড) ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) এ থাকা না থাকা নিয়ে গনভোট অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে গনভোটে ব্রিটিশ ভোটাররা ইইউ থেকে বের হওয়ার মতামত দেয়। আর ইইউ থেকে ব্রিটেন এর বের হওয়ার এই বিষয়টিই ব্রেক্সিট নামে পরিচিত (Br (Britain) + Exit -> Brexit)। বিশেষজ্ঞদের মতে ইইউ থেকে বের হওয়ায় প্রাথমিকভাবে যুক্তরাজ্যে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রিমিয়াম লীগ তথা ইউরোপিয়ান ফুটবলে কি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে? আর পড়লেই বা তা কি ধরনের হতে পারে?

ব্রেক্সিট কি?
ব্রেক্সিট কি?

গনভোটের আগেই প্রিমিয়ার লীগের সব কটি দলই যুক্তরাজ্যের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে (ইইউ) থাকার পক্ষেই মতামত দিয়েছিলো। এমনকি প্রধান নির্বাহী রিচার্ড শুডামোর আগেই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে ব্রেক্সিট এর কারনে লীগ কমিটিতে মতবিরোধ দেখা দিবে। আর এতে করে প্রিমিয়াম লীগের মেধাসত্ব অধিকার (কপিরাইট), সম্প্রচার চুক্তি এবং অন্যান্য বিষয় রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। শুডামোর পরিচালকবৃন্দের বার্ষিক সম্মেলনের একটি বক্তৃতায় বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোন থেকে চিন্তা করলে যুক্তরাজ্যের অবশ্যই ইইউ তে থাকা উচিত”। তিনি আরো বলেন, “আমি পণ্যের অবাধ চলাচলে বিশ্বাস করি কিন্তু যখন কাজের কথা আসে তখন আমাদের অবশ্যই একত্রে কাজ করতে হবে বিশেষত এই অডিও ভিজ্যুয়াল বিশ্ব এবং প্রাদেশিকতার ক্ষেত্রে”।

আর তাই ব্রিটিশরা ইইউ ত্যাগ করার পক্ষে ভোট দেয়ার ফলে প্রিমিয়ার লীগে বেশ কিছু প্রভাব দেখা দিতে পারে যার ফল ভোগ করতে হবে পুরো ইউরোপ তথা সমগ্র ফুটবল বিশ্বকেই। চলুন দেখে নেই ব্রেক্সিটের ফলে কি ধরনের প্রভাব পড়তে পারে…

ব্রেক্সিটের ফলে ট্রান্সফার মূল্যে প্রভাব

প্রিমিয়ার লীগ তথা ফুটবলে ব্রেক্সিট এর প্রভাব
প্রিমিয়ার লীগ তথা ফুটবলে ব্রেক্সিট এর প্রভাব

ব্রেক্সিট এর কারনে স্বভাবতই ধারনা করা হচ্ছে যে এর ফলে ব্রিটিশ পাউন্ড কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে ভবিষ্যৎে খেলোয়াড় বেচাকেনা করতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের দলগুলোর কিছুটা সমস্যা হবে। ইইউর ফ্রি এক্সেস না থাকার কারনে প্রিমিয়ার লীগে বিভিন্ন বৈদেশিক কোম্পানির বিনিয়োগের পরিমানও কমে যাবে।এর ফলে বিদেশি খোলায়াড়দের মূল্য বৃদ্ধি পাবে যার ফলে প্রিমিয়ার লীগেে দলগুলোরও খেলোয়াড় কিনতে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। যেমন, ধরি জুভেন্টাস পল পগবা কে ১৬০ মিলিয়ন ইউরোতে বিক্রির মূল্য ধার্য করছে। কিন্তু দেখা যাবে প্রিমিয়ার লীগের কোন দলকে তখন আরো ৩০ মিলিয়ন বেশি দিয়ে পগবা কে কিনতে হবে। কারন ব্রেক্সিট এর পরে ইউরো / পাউন্ড এক্সচেন্জ রেট ০.৭০৯ থেকে বেড়ে ০.৯ কিংবা তার বেশিও হয়ে যেতে পারে। আর অন্যদিকে ইইউর সদস্য অন্য দেশের ক্লাবগুলোকে পগবাকে কিনতে হলে ঐ এক্সট্রা খরচ দিতে হবে না।

ফলে প্রিমিয়ার লীগের দলগুলোর ফাইনান্সিয়াল ফেয়ার প্লে রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। আর অপরদিকে পাউন্ডের মান কমায় ইইউ তথা অন্য দেশগুলো আরো কম মূল্যেই প্রিমিয়ার লীগ থেকে খেলোয়াড় সাইন করাতে পারবে। আর এক্ষেত্রে চীনও অনেকটা এগিয়ে থাকবে কারন গত দেড় বছরে চীনে যেন ফুটবলের বিপ্লব শুরু হয়েছে। তারা প্রিমিয়ার লীগ থেকে আরো খেলোয়ার কিনতে পারবে।

ব্রেক্সিটের ফলে বিনিয়োগের ক্ষেত্র

বিনিয়োগের জন্য প্রিমিয়ার লীগ এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে পছন্দের শীর্ষে। আর এর প্রতিফলন প্রিমিয়াম লীগেও দেখা যায় কারন প্রিমিয়ার লীগের ২০ দলের মধ্যে ১৪ দলেরই মালিক যুক্তরাজ্যের বাইরের।

ব্রেক্সিটের ফলে প্রিমিয়ার লীগের দল কেনা আগের তুলনায় কিছুটা সহজ হবে কারন দলগুলোর মূল্যও কিছুটা কমে যাবে। তাই আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে প্রিমিয়ার লীগের দলগুলোতে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু কোন দল কেনার পর যে ব্রিটিশ পাউন্ড পাউন্ডের দাম আরো কমবে না এই নিশ্চয়তা কে দিবে? আর তাই এই অনিশ্চয়তার কারনেই হয়তোবা প্রিমিয়ার লীগে বৈদেশিক বিনিয়োগ কিছুটা কমতে পারে।

ব্রেক্সিটের ফলে প্লেয়ার কেনার সক্ষমতা

বর্তমানে প্রিমিয়ার লীগের প্রায় ৬৫% খেলোয়ার বাইরের। আর ইংলিশ ক্লাবগুলো ইইউ পাসপোর্টধারী যে কোন খেলোয়াড়কে স্বাধীন বিচরেনের নিয়ম অনুসারে ফ্রি তেই সাইন করাতে পারে। কিন্তু ব্রেক্সিট ভোটের কারনে প্লেয়ার সাইন করানোর ক্ষেত্রে ইইউর সাথে ব্রিটিশদের কি ধরনের রিলেশন থাকবে তা এখনো ঘোর অনিশ্চয়তায় আছে।

সবচেয়ে ভালো যা হতে পারে তা হলো ইইউ রিলেশনে থাকা অবস্থায় ইইউর অন্যান্য দেশগুলো থেকে প্রিমিয়াম লীগের দলগুলো যেই স্বাধীন ভাবে প্লেয়ার কিনতে পারতো ঐ নিয়মটাই থাকবে। আর সবচেয়ে খারাপ যা হতে পারে তা হলে, আগে প্রিমিয়ার লীগের দলগুলোর অইউরোপীয় প্লেয়ার কেনার ক্ষেত্রে যেই নিয়মগুলো মানতে হতো এখন ইইউর থেকে পরলেয়ার কিনতে হলেও সেই নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে। যেখানে অনেকগুলো জটিল নিয়ম রক্ষা করে খেলোয়ার সাইনিং করাতে হবে। তবে ব্রেক্সিটের ফলে এখন প্রিমিয়ার লীগের দলগুলো আরো বেশি ইংলিশ প্লেয়ার দেখা যাবে। যার ফলে উপকৃত হবে ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দল।

ব্রেক্সিটের ফলে ইইউ ওয়ার্ক পারমিট

প্রিমিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়ন লেস্টার সিটি
প্রিমিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়ন লেস্টার সিটি

আগে দেখা যেত কোন প্লেয়ার জন্মসূত্রে কিংবা পিতা-মাতা কারো সূত্রে ইইউর কোন এক দেশের নাগরিক হলে অন্য দেশগুলোতে সহজেই ওয়ার্ক পারমিট পেত। কিন্তু এখন ব্রিটিশরা ইইউর বের হওয়ায় খেলোয়ারদের নতুন করে ইংল্যান্ড থেকে ওয়ার্ক পারমিট নিতে হবে। যার ফলে প্রিমিয়ার লীগ অনেক খেলোয়ারের আকর্ষনের কেন্দ্রে নাও থাকতে পারে।

ব্রেক্সিটের ফলে আর্টিকেল ১৯ এর প্রভাব

ফিফা নিয়ম অনুসারে অনুর্ধ ১৮ খেলোয়ারদের আন্তর্জাতিক ট্রান্সভার নিষিদ্ধ। তবে এই নিয়মটি ১৬-১৮ বছর বয়সী খেলয়াড়দের ইইউর মধ্যেই কিংবা ইউরোপিয়ান ইকোনোমিক এরিয়ার (ইইএ) মধ্যে ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে খাটে না। আর তাই ইংল্যান্ড ইইউ থেকে বের হয়ে গেলে এমন একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে যেখানে প্রিমিয়ার লীগের দলগুলো তরুন খেলোয়াড় (অ১৬-অ১৮) সাইন করাতে পারবে না। এরফলে অন্যান্য বিদেশি ক্লাব গুলো খুশি হবে কারন এখন দেখা যায় অনেক যুবা খেলোয়াড়দেরই কোন ইংলিশ ক্লাব কিনে নেয় যা ইউকে এর ইইউ থেকে বিভাজনের ফলে আর হবে না। আর প্রিমিয়ার লীগের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে হয়তোবা ক্লাবগুলোকে খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত বেতন দিতে হবে।

তাই বলা যায়, ব্রিটেন এর এই গনভোট ব্রিটেনে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবে প্রভাব ফেলার পাশাপাশি এই গনভোট (ব্রেক্সিট) প্রিমিয়ার লীগের ভবিষ্যৎ এবং ইংল্যান্ড জাতীয় দলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



error: