রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮: বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা: কাটবে কি শিরোপা খরা?

বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে ম্যারাডোনা

বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে ম্যারাডোনা

বিশ্বকাপ ফুটবলে অন্যতম আকর্ষণ আজেন্টিনা। সেই ম্যারাডোনার সময় থেকে দলটি এখন অবধি তাদের চমকপ্রদ ও উত্তেজনাময় খেলা দেখিয়ে মাঠে নিজেদের ভক্তদের ধরে রেখেছে। দলটি এখন অবধি পাঁচ বার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে। যেখান থেকে তিন বার নিরাস হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। তারপরও তাদের চমকপ্রদ খেলা গ্যলারিতে দর্শকের মন ধরে রেখেছে।

১৯০১ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দল গঠিত হলেও দলটি  খেলা শুরু করে ১৮৬৭ সালে। উরুগুয়ের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যচে প্রথম মুখোমুখি হয় যা অণুষ্ঠিত হয় ১৯০১ সালের ১৬ মে; যেখানে আর্জেন্টিনা ৩–২ ব্যবধানে জয় লাভ করে। এটি ছিল আর্জেন্টিনার প্রথম রেকর্ডকৃত ম্যাচ। ফিফা বিশ্বকাপে দলটি জিতেছে ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালে। এছাড়াও আর্জেন্টিনা ১৪ বার দক্ষিণ আমেরিকা চ্যম্পিয়ান শীপ জিতেছে। বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা টিমের দীর্ঘ অনুপস্হিতে লক্ষ্যণীয়। এর মধ্যে একটি অন্যতম কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৩৮ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। এর মাঝে একটিতেও অংশ গ্রহণ করে নি আর্জেন্টিনা।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: রাশিয়া বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের সবচেয়ে ফেবারিট ৫ দল

১৯৩৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ফ্রান্সে। টানা দ্বিতীয়বার ইউরোপে বিশ্বকাপ আয়োজন করায় আর্জেন্টিনা ঐ আসরে অংশ গ্রহণ করে নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে কয়েক বছর ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল বন্ধ ছিল। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করলে ঐখানেও ব্রাজিলীয় ফুটবল সংস্হার সাথে দ্বন্ধের কারণে অংশ নিতে পারে নি দলটি। এরপর ১৯৫৪ এর বিশ্বকাপেও দলটি অংশগ্রহণের অনিচ্ছা প্রকাশ করে।যার ফলে আর্জেন্টিনা ফিফা বিশ্বকাপ থেকে অনেকটা দূরেই সরে যায়। তবে এ সময়ে দলটি যথাক্রমে ১৯৩৭, ১৯৪১, ১৯৪৫, ১৯৪৬, ১৯৪৭, ১৯৫৫ ও ১৯৫৭  সালে দক্ষিণ আমেরিকা চ্যম্পিয়ান শীপের শিরোপা জিতে।

১৯৩০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দল

১৯৩০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দল

২৪ বছর পর ১৯৫৮ সুইডেন বিশ্বকাপে অংশগ্রহন করে আর্জেন্টিনা। ম্যাশিও, অ্যাঞ্জিলিলো এবং সিভরির মত খেলোয়াড়রা অণুপস্থিত থাকলেও, দলটি অ্যামাদিও ক্যারিজো, পেদ্রো দেলাচা, হোসে র‍্যামোস দেলগ্যাদো, অরেস্তে করবাতা, অ্যাঞ্জেল লাব্রুনা এবং হোসে স্যানফিলিপোর মত খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। কিন্তু ইউরোপীয় দলগুলোর মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা কম থাকায় চরম দূর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের। বিশ্বকাপে তাদের প্রথম খেলায় তারা পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৩–১ ব্যবধানে পরাজিত হয়।দ্বিতীয় খেলায় উত্তর আয়ারল্যান্ডকে হারালেও, তৃতীয় খেলায় চেকস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ৬–১ ব্যবধানে পরাজিত হয় তারা, যা ছিল বিশ্বকাপে কোন দলের সর্বোচ্চ ব্যবধানে পরাজয়। ফলে আর্জেন্টিনা প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যায়।বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার এই ঘটনা ‘‘এল দিজাস্ট্রে দি সুইসিয়া (দ্য সুইডেন ডিজাস্টার)’ ’নামে পরিচিত। দলটি যখন বিশ্বকাপ থেকে ফিরে বুয়েনোস আইরেসে  পৌছায়, তখন এজিজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ১০,০০০ মানুষ তাদেরকে অপমান করার আশায় অবস্হান করে। সুইডেন ডিজাস্টারের পর আর্জেন্টিনা প্রথম অফিসিয়াল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করে ১৯৫৯ সালে,কোপা আমেরিকার নতুন সংস্করনে। তারা এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়।

এরপর ১৯৬২ বিশ্বকাপও আর্জেন্টিনার ভাল যায়নি। চিলিতে অণুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপ ছিল ফিফা আয়োজিত ৭ম বিশ্বকাপ। দ্বিতীয় খেলায় ইংল্যন্ডের বিপক্ষে ৩–১ ব্যবধানে পরাজয় এবং শেষ খেলায় হাঙ্গেরির সাথে ড্র করায় প্রথম পর্বে তিন পয়েন্ট অর্জন করে তারা। গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে।

আরো পড়ুন:  রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮: বিশ্বকাপে স্পেন: হবে কি ২০১০ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি?

আবার ব্যর্থতার গ্লানি! ১৯৬৬ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা অংশগ্রহন করে।এবং কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১–০ ব্যবধানে হেরে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে দলটি।

১৯৬৯ সালে, আর্জেন্টিনা কোচ পেদেরনেরার অধীনে ১৯৭০ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অংশগ্রহন করে।কিন্তু তারা বাছাইপর্ব টপকাতে সমর্থ হয়নি।আর্জেন্টিনার ফুটবলের ইতিহাসে এই প্রথম কোন বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব পার হতে অপারগ হয় তারা। ফলে পেদেরনেরাকে হটিয়ে কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয় হুয়ান হোসে পিজুতিকে। তিনি তিন বছর কোচের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। বাছাইপর্ব সফলভাবে টকপাতে সমর্থ হয় আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের মূলপর্বে স্থান করিয়ে দেওয়ার পর কোচের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নেন সিভরি। মূলপর্বে পোল্যান্ড, ইতালি এবং হাইতির সাথে গ্রুপ ভাগাভাগি করে আর্জেন্টিনা প্রতিযোগিতায় ছয়টি খেলার মাত্র একটিতেই জয় পায় আর্জেন্টিনা।

১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার জন্য তৈরি হয় এক সুবর্ণ সুযোগ। সব ব্যর্থতা মুছে যায় কয়েক মিনিটে। ইস্ত্যাদিও মনুমেন্তালে নেদারল্যন্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা।খেলার ৩৮তম মিনিটে দলকে এগিয়ে নিয়ে যান মারিও কেম্পেস। ৮২তম মিনিটে নানিঙ্গার গোলে সমতায় ফেরে নেদারল্যন্ড।খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।১০৪তম মিনিটে কেম্পেস খেলায় তার দ্বিতীয় গোল করলে আবারও এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। এরপর ১১৫তম মিনিটে বার্তোনির গোলে ৩–১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে তারা। আর্জেন্টিনা তাদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দল

১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দল

আবার দীর্ঘ সময়ের ব্যর্থতার ইতিহাস সঙ্গি হয় আর্জিন্টিনার। এরপর ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় ও শেষ বিশ্বকাপ জিতার স্বাদ পায় দলটি। দিয়েগো ম্যারাডোনার নৈপুনতায় জার্মানিকে ৩-২ গোলের ব্যবধানে জয় লাভ করে আর্জেন্টিনা। যা আজেন্টিনার  ফুটবল ইতিহাসে অনন্য একটি দিন!

৮৬ এরপর আর্জেন্টিনার ভাগ্যে আর বিশ্বকাপ জুটে নি। ১৯৯০ এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বাছাই পর্ব থেকে আবার ছিটকে পরে। আবার তাদের পুরানে ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হতে থাকে। ম্যারাডোনা কোকেন কেলেংকারিতে জরিয়ে গেলে এবং দল থেকে  অব্যাহতী নিলে দল আরো ভঙ্গুর হয়ে পরে।

১৯৯৪ সালে আয়োজিত বিশ্বকাপও দলটির জন্য সুখের খবর নিয়ে আসতে পারে নি। পুরানো অতীতের মত ব্যর্থতা! প্রথম খেলায় গ্রীসকে ৪-০ গোলে বিধস্ত করলেও রাইন্ড অফ ১৬ তে রোমানিয়ার বিপক্ষে ৩-২ গোলে পরাজিত হয়ে বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে। গ্রীসের বিপক্ষে খেলার পর ম্যারাডোনা আর বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতে পারে নি। ঐ খেলাতেই শেষ বিশ্বকাপ গোল করেছিল। ঐদিনের পর ড্রাগ টেস্ট প্রমাণিত হওয়ায় ম্যারাডোনাকে ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর আর তিনি বিশ্বকাপের কোনো আসরে অংশগ্রহণ করে নি।

১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬ ও ২০১০ সালের বিশ্বকাপের ইতিহাসও তাদের অতীত ইতিহাসের মতোই বেদনাময়। শিরোপা ছোঁয়ার স্বাদ কপালে জুটে নি। শুধু ব্যর্থতা আর ব্যর্থতা!

আর্জেন্টিনা ফুটবল দল

আর্জেন্টিনা ফুটবল দল

শিরোপা জিততে না পারলেও গত ব্রাজিল বিশ্বকাপ্ ২০১৪ তে ফাইনাল খেলার কৃতীত্ব অর্জন করে ও বর্তমান রানার আপ দল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে আর্জেন্টিনা।বিশ্ব সেরা খেলোয়াড় মেসি এই দলটাকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও গঞ্জালো হিগুইন, ডি মারিয়ার মতো নিপুন খেলোয়াড়দের উপর ভক্তরা আস্থা রাখছে। এবার ২০১৮ তে রাশিয়ায় আয়োজিত বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা তাদের সেরাটা দিয়েই খেলবে এমনটাই আশা করা যায়।

এক নজরে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা

বছর অবস্থান
১৯৩০ রানার্সআপ
১৯৩৪ প্রথম পর্ব
১৯৩৮ প্রত্যাহার
১৯৫০ প্রত্যাহার
১৯৫৪ প্রত্যাহার
১৯৫৮ গ্রুপ পর্ব
১৯৬২ গ্রুপ পর্ব
১৯৬৬ কোয়ার্টার ফাইনাল
১৯৭০ বাছাই পর্ব
১৯৭৪ দ্বিতীয় গ্রুপ পর্ব
১৯৭৮ চ্যাম্পিয়ন
১৯৮২ দ্বিতীয় গ্রুপ পর্ব
১৯৮৬ চ্যাম্পিয়ন
১৯৯০ রানার্সআপ
১৯৯৪ রাউন্ড অব ১৬
১৯৯৮ কোয়ার্টার ফাইনাল
২০০২ গ্রুপ পর্ব
২০০৬ কোয়ার্টার ফাইনাল
২০১০ কোয়ার্টার ফাইনাল
২০১৪ রানার্সআপ
data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *