নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনী: একজন রাষ্ট্রনায়ক এবং বর্ণবাদ বিরোধী নেতা

নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা

নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা

মানুষটা সম্পর্কে বিশদভাবে বলার আগে প্রথমেই একটা পাগল করে দেবার মতো তথ্য দিচ্ছি। তার নাম নেলসন ম্যান্ডেলা (Nelson Mandela), আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা। তিনি প্রায় ২৭ বছর কারাগারে বন্দী ছিলেন, যা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ হঠাৎই ১৯৮০ সালে যখন তিনি কারাগারে বন্দী, তখনই মানুষ ভাবতে শুরু করেন, নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগারেই মারা যান। আচ্ছা, কেমন লাগবে যদি দেখেন, আপনি ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনাল দেখার জন্য বন্ধুদেরকে বাসায় ডাকলেন। আজ আর্জেন্টিনা বনাম জার্মানির ফাইনাল ম্যাচ। সবাই টিভি স্ক্রিনের সামনে চিপস হাতে বসে আছে। কিন্তু টিভিতে চলছে, পাকিস্তান বনাম ভারতের ক্রিকেট ম্যাচ! তাহলে কেমন লাগবে?

যদি এমনটা দেখেন, তবে ভাবতেই পারেন, আপনি পাগল হয়ে গেছেন। কিন্তু আপনার বন্ধুরাও যদি ঠিক তাই দেখে, তাহলে? ১৯৮০ সালে কি ঘটেছিল তাহলে? লক্ষ লক্ষ মানুষের কেন মতিভ্রম ঘটেছিল? যেখানে আমরা জানি নেলসন ম্যান্ডেলা ২০১৩ সালে মারা যান। মানুষের ভালবাসা এমন উঁচুতে পৌঁছে গিয়েছিল যে, মানুষ ১৯৮০ সালে এটা ভেবেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং তিন মিনিট নিরবতাও পালন করেন। এই লক্ষ লক্ষ মানুষের মতিভ্রমের নামই, ‘ম্যান্ডেলা ইফেক্ট‘। বিষয়টা নিয়ে আরেকদিন বিস্তারিত আলোচনা করব। আজ তাহলে এই মানুষটাকে নিয়েই কথা বলা যাক।

নেলসন ম্যান্ডেলা

নেলসন ম্যান্ডেলা

তার নাম নেলসন ম্যান্ডেলা হলেও পূর্ণ নাম নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা। ডাক নাম “রোলিহ্লাহ্লা”র অর্থ হলো “গাছের ডাল ভাঙে যে”- অর্থাৎ দুষ্ট ছেলে। যার আরেকটি মানে উত্তেজনা সৃষ্টিকারক। তার নাম পরিবর্তন করার পরেও দেখা গেল যে তিনি সেই ইংরেজদের উত্তেজনার কারণ হয়েই রয়ে গেলেন। ম্যান্ডেলা তাঁর পরিবারের প্রথম সদস্য যিনি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। স্কুলে পড়ার সময়ে তাঁর শিক্ষিকা মদিঙ্গানে তাঁর ইংরেজি নাম রাখেন “নেলসন”। ম্যান্ডেলার বয়স যখন ৯ বছর, তখন তাঁর পিতা যক্ষ্মা রোগে মারা যান। শাসক জোঙ্গিন্তাবা তখন তাঁর অভিভাবক নিযুক্ত হন।

তিনি ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই, মভেজো গ্রামে থেম্বু রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেন। থেম্বু জাতিগোষ্ঠীর রাজার পুত্র ম্যান্ডেলা ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলার পিতামহ । ম্যান্ডেলা নাম নেলসন ম্যান্ডেলার বংশীয় নাম। যদিও নেলসন ম্যান্ডেলা এবং তার পিতা রাজ বংশের সন্তান ছিলেন। কিন্তু তারা রাজা হওয়ার কোন সুযোগ পাননি কারণ নেলসনের পিতামহী ইক্সহিবা গোত্রের হওয়ায় রীতি অনুযায়ী তাঁর শাখার কেউ থেম্বু রাজবংশে আরোহণ করার অধিকার রাখেন না।

নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনী

নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনী

স্কুল পাশ করার পর ম্যান্ডেলা ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এ কোর্সে ভর্তি হন। জীবনের পরবর্তী সময়ে কারাগারে বন্দী অবস্থায় তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের অধীনে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি ইউনিভার্সিটি অব উইটওয়াটার্সরান্ডে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শুরু করেন। ছাত্র অবস্থায় সাদা কালোর ভেদাভেদ তাঁকে মানসিক ভাবে উৎপীড়িত করত। একই দেশে দুই সমাজ ব্যবস্থা। এসব দেখে এক ধরনের আক্রোশ জন্ম নিয়েছিল মনের ভিতরে। বস্তিবাসী শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য, দারিদ্র, ক্ষুধা ও পুলিশের অবিরাম হয়রানি নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে তিনি বিপদে ছিলেন ধীরস্থির এবং ন্যায়ের সংগ্রামের অটল। তিনি বলতেন, ‘সংগ্রামই আমার জীবন। আমি স্বাধীনতার জন্য আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাব’। তাঁর জীবন ছিল জনগণের জন্য।

ম্যান্ডেলার নিজ গোষ্ঠী থেম্বুর দলনেতা জঙ্গিতারা দালিদিয়াবোর তাকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে নেলসন জোহানেসবার্গের পূর্ব অন্তরীপে পালিয়ে আসেন। ওই সময় জীবিকা নির্বাহের জন্য উন্মুক্ত খনিতে কাজ করা শুরু করেন। পরে অবশ্য ম্যান্ডেলা একবার নয় তিন তিনবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন ইভিলিন নতোকো মাসে। ১৩ বছর সংসার করার পর ১৯৫৭ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ম্যান্ডেলার দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম উইনি মাদিকিজেলা ম্যান্ডেলা। তৃতীয় স্ত্রী হলেন গ্রাসা মাচেল। নেলসন ম্যান্ডেলার ৬ সন্তানের জনক।

জেলে থাকার সময় নেলসন ম্যান্ডেলা

জেলে থাকার সময় নেলসন ম্যান্ডেলা

বর্ণবৈষ্যমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার কারণে ১৯৬২ সালের ৫ অাগস্ট নেলসন ম্যান্ডেলাকে গ্রেপ্তার করে জোহানেসবার্গের দূর্গে বন্দী করা হয়। ফাঁসির পরিবর্তে তাকে ১৯৬৪ সালের ১২ জুন যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। ২৭ বছরের কারাদন্ডে প্রথম ১৮ বছর কাটান রবেন দ্বীপে। ১৯৮৫ সালে ম্যান্ডেলাকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। তিনি জেলখানায় তার জীবনের ২৭ বছর অতিবাহিত করেছিলেন এবং ছদ্মবেশে তাকে কেউ টেক্কা দেওয়ার মতো ছিল না সে সময়। ১৯৬২ সালে যখন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তখন তিনি ড্রাইভারের ছদ্মবেশে ছিলেন। মূলত তার এই দীর্ঘ কারাবাসের সময়েই লক্ষ লক্ষ মানুষের মতিভ্রম হয় যে, তিনি আর বেঁচে নেই। পরে অবশ্য তিনি জেল থেকে ছাড়া পান এবং আফ্রিকার প্রেসিডেন্টও হন।

দক্ষিণ অাফ্রিকার সরকারের সাথে শান্তি অালোচনায় অবদান রাখার জন্য ১৯৯৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।

কনভারসেশন উইথ মাইসেলফ

কনভারসেশন উইথ মাইসেলফ

নেলসন ম্যান্ডেলা বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। ‘কনভারসেশন উইথ মাইসেলফ (Conversation with Myself)’ তার লেখা অন্যতম একটি বই। এই বইটিতে স্থান পেয়েছে ম্যান্ডেলার বাছাইকৃত ব্যক্তিগত চিঠি, ডায়েরি। বইটি ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর প্রকাশিত হয়। ২০টি ভাষায় অনূদিত হয় বইটি। ২২টি দেশে বইটি প্রকাশ পায়। তার লেখা অন্য বইগুলো লং ওয়াক টু ফ্রিডম (Long Walk to Freedom), দ্য স্ট্রাগ্রল ইজ মাই লাইফ (The Struggle Is My Life), নো ইজি টু ওয়াক (No Easy to Walk), এ প্রিজনার ইন দ্য গার্ডেন (A Prisoner in The Garden) ইত্যাদি।

নিপীড়িত মানুষের প্রিয় নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। নেলসন ম্যান্ডেলা সম্পর্কে কয়েকটি অজানা তথ্য দিয়ে লেখাটা শেষ করছি।

নেলসন ম্যান্ডেলার হাতের ছাপ

ম্যান্ডেলার হাতের ছাপ

১. আপনাদের কি জানা আছে যে, ম্যান্ডেলার হাতের ছাপ অবিকল আফ্রিকান মহাদেশের আকৃতির মতো! হ্যাঁ এটা একেবারে সত্যি ঘটনা কিন্তু!

২. একবার তিনি ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের নাম ধরে ডেকেছিলেন এবং তার ওজন এবং তার ড্রেসিং শৈলী নিয়েও কিছু মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন।

৩. গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে তার অবদানের জন্য জাতিসংঘ ১৮ জুলাই দিনটিকে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করে।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *