টপ ৫: বাংলাদেশের সবচেয়ে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়

বাংলাদেশ ঝড়ের দেশ, জলোচ্ছ্বাসের দেশ। ব্যতিক্রমী ভৌগোলিক অবস্থানের কারনেই বারবার বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপে পড়ছে এই দেশটি। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ছোট-বড় প্রায় সব ঘূর্ণিঝড়ই কমবেশি বাংলাদেশে আঘাত করে। আর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট এসব ঘূর্ণিঝড়ের ফলে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন ঊপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা। চলুন আজকে জেনে নেই, ঝড়ের দেশ এই বাংলাদেশের সবচেয়ে বিধ্বংসী ৫ ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে। [বাংলাদেশ ইতিহাসের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে পরিচিত থাকলেও এ ঘূর্ণিঝড়গুলো এ ভূখণ্ডেই সংঘটিত হয়েছিল]

বাংলাদেশের সবচেয়ে বিধ্বংসী ৫ ঘূর্ণিঝড়

১৮২২ সালের ঘূর্ণিঝড়

বাংলাদেশের সবচেয়ে বিধ্বংসী ৫ ঘূর্ণিঝড় এর লিস্টে ৫ম স্থানে আছে ১৮২২ সালের ঘূর্ণিঝড়। প্রলয়ংকরী এই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে ১৮২২ সালের জুন মাসে। তবে এই ঘূর্ণিঝড়ের সঠিক তারিখ জানা যায়নি। এই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে বরিশাল-বাকেরগঞ্জ, হাতিয়া ও নোয়াখালীতে। সাগরে উত্তাল ঢেউ আর জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। গাছপালা, ঘরবাড়িসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় গবাদি পশুর। এ ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়। এ ছাড়া গবাদিপশু মারা যায় প্রায় ১ লাখ।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঝড়

দুকূল প্লাবিত কর্ণফুলী নদী (১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঝড়)
দুকূল প্লাবিত কর্ণফুলী নদী (১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঝড়)

বাংলাদেশের সবচেয়ে বিধ্বংসী ৫ ঘূর্ণিঝড় এর লিস্টে পরবর্তী স্থানে আছে ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঝড়। ১৯৯১ সালের ২২ এপ্রিল মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে একটি গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। নিম্নচাপটি ক্রমে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং অগ্রসর হওয়ার সময় এটি আরও শক্তিশালী হয়। ২৮ ও ২৯ এপ্রিল এর তীব্রতা বৃদ্ধি পায় এবং ঘূর্ণিঝড়টির ব্যাস দাড়ায় প্রায় ৬০০ কিলোমিটারে। এরপর ২৯ এপ্রিল শেষ রাতের দিকে এটি চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী অঞ্চলে আঘাত করে। এসময় ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল সন্দ্বীপে, যা ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২২৫ কিলোমিটার। এছাড়া অন্যান্য স্থানের তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রামে ১৬০ কিলোমিটার, খেপুপাড়ায় ১৮০ কিলোমিটার, কুতুবদিয়ায় ১৮০ কিলোমিটার, কক্সবাজারে ১৮৫ কিলোমিটার এবং ভোলায় ১৭৮ কিলোমিটার।

স্থলভাগে প্রবেশের পর এর গতিবেগ ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং ৩০ এপ্রিল এটি বিলুপ্ত হয়। এই ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশের ১৯ টি জেলার ১০২টি উপজেলা। তবে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, খেপুপাড়া, ভোলা, টেকনাফ। ১৯৯১ সালের এই ঝড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে এবং প্রায় সমপরিমাণ মানুষ আহত হয়। এছাড়া প্রায় ৭০,০০০ গবাদি পশু মারা যায়।

গ্রেট বাকেরগঞ্জ সাইক্লোন

বাকেরগঞ্জে আরো একটি প্রলয়ংকরী ঝড়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বিধ্বংসী ৫ ঘূর্ণিঝড় এর লিস্টে ৩য় স্থানে আছে। ১৮২৬ সালের ২৭শে অক্টোবর, দক্ষিণ বঙ্গোপ্রসাগরে এই ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি হয় এবং এর ফলশ্রুতিতে সকাল থেকেই নিন্মচাপের সৃষ্টি হয়, যা ৩০শে অক্টোবর তীব্রতর আকার ধারন করে এবং উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এরপর প্রলয়ংকরী এই ঘূর্ণিঝড় বরিশালের বাকেরগঞ্জে আঘাত হানে ৩১ অক্টোবর (কিছু তথ্যমতে ১ নভেম্বর)।

সেখানে মেঘনা নদীর মোহনার কাছ দিয়ে এই তীব্র ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২২০ কিলোমিটার। ঝড়ের প্রভাবে ১২ মিটারের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয় ঊপকূলীয় এলাকা। চট্টগ্রাম, বরিশাল ও নোয়াখালীর উপকূলে তাণ্ডব চালিয়ে যাওয়া ওই ঘূর্ণিঝড়ে আনুমানিক দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। আরও অধিক মানুষ মারা যায় দুর্যোগ পরবর্তী মহামারী এবং দুর্ভিক্ষে। এছাড়া গবাদিপশুর মৃত্যুর, ফসল এবং অন্যান্য সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

১৫৮২ সালের ঘূর্ণিঝড়

লিস্টের ২য় স্থানে থাকা ঘূর্ণিঝড়টিও বাকেরগঞ্জেই আঘাত হানে। প্রলয়ংকরী এই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে ১৫৮২ সালে। তবে এর দিন ও মাস জানা যায়নি। টানা পাঁচ ঘণ্টার হারিকেন ও বজ্রপাতসহ এই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে বাকেরগঞ্জ এবং পটুয়াখালীর নিকটবর্তী উপকূলীয় এলাকায়। এতে মৃত্যু হয় আনুমানিক দুই লাখ মানুষের। ধ্বংস হয় ঘর ও নৌকা। শুধুমাত্র শক্ত ভিতের ওপর গড়া ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো রক্ষা পায় এই ঝড় থেকে।

ভোলা সাইক্লোন

ভোলা সাইক্লোন
ভোলা সাইক্লোন

বাংলাদেশের সবচেয়ে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় হল ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোন (Bhola cyclone)। মারাত্মক এই সাইক্লোন হয় বাংলাদেশের ভোলায় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)। এই ভোলা সাইক্লোন পৃথিবীর ইতিহাসেই সবচেয়ে ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় হিসাবে পরিচিত।

ঘূর্ণিঝড়টি বঙ্গোপসাগরে ৮ই নভেম্বর সৃষ্ট হয় এবং ক্রমশ শক্তিশালী হতে হতে উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১১ই নভেম্বর এর গতিবেগ সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১৮৫ কিমি (১১৫ মাইল) এ পৌঁছায় এবং সে রাতেই বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) এবং পশ্চিম ভারত উপকূলে আঘাত করে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সৃষ্ট জলচ্ছাসের কারণে প্লাবিত হয় উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপসমূহ। এতে করে সৃষ্টি হয় ভয়ংকর এক বন্যার। যার ফলাফল মানুষকে বহুদিন বহন করতে হয়েছিল। এই ভয়াবহ দুর্যোগে সে সময় আনুমানিক প্রায় ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

এটা বাংলাদেশ এর অথবা বলা যায় সাধারণভাবে ভারতের বিভক্তির আগের ঐতিহাসিক ভাবে চিহ্নিত বাংলার ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের একটি আংশিক তালিকা। কিছু মৃত্যুর সংখ্যা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং তারিখে সামান্য ত্রুটি থাকতে পারে, এখানে অধিকাংশ তথ্য উইকিপেডিয়া থেকে নেওয়া।



error: