টপ ৫: রেনেসাঁ যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্ম

রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ হল মধ্যযুগের পরে বিশেষ করে ইতালিতে ও সাধারণভাবে গোটা ইউরোপের ঐতিহাসিক শিল্প-সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব জাগরণ। এই যুগের ব্যাপ্তিকাল ছিল আনুমানিক চতু্র্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত। আর রেনেসাঁ শিল্প বলতে বোঝানো হয় ইউরোপীয় রেনেসাঁর সময়কার চিত্রকলা, স্থাপত্য, এবং আলংকারিক কার্যকলাপসমূহকে। যার মধ্যে অন্যতম হল রেনেসাঁ যুগের চিত্রকর্মগুলো। এই সময়ে আমরা দেখতে পাই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলোর মত সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পিদের। তাদের আঁকা সেই চিত্রকর্মগুলো তখনকার চেয়েও যেন বর্তমানে আরো বেশি জনপ্রিয়, বেশি বিতর্কিত। আর এতোসব চিত্রকর্ম থেকে আমরা আজকে আলোচনা করব রেনেসাঁ যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্ম সম্পর্কে।

রেনেসাঁ যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্ম

সান্দ্রো বত্তিচেল্লির লা প্রিমাভেরা

লা প্রিমাভেরা
লা প্রিমাভেরা

রেনেসাঁ যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্মের ৫ম স্থানে আছে সান্দ্রো বত্তিচেল্লির লা প্রিমাভেরা (La Primavera)। প্রিমাভেরা শব্দের অর্থ ‘বসন্ত ঋতু বা’ ‘প্রতীকাশ্রয়ী বসন্ত’। ১৪৮২ খ্রিস্টাব্দে এই ছবিটি আঁকেন রেনেসাঁর অন্যতম বিখ্যাত শিল্পী সান্দ্রো বত্তিচেল্লি। বত্তিচেল্লির চিত্তাকর্ষক বিভিন্ন রঙের ব্যবহার এবং ছবিটির নানা রকমের ব্যাখ্যা একে রেনেসাঁ কালের অন্যতম বিখ্যাত চিত্রকর্মে পরিনত করেছে। ইউরোপে আজও এই ছবিটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অন্যতম বিতর্কিত একটি ছবি।

প্রিমাভেরা নিয়ে আজ অবধি অনেক লেখালেখি হয়েছে। সজীব এক বসন্তে চমৎকার এক উদ্যানে উপকথার চরিত্ররা যেন সমবেত হয়েছে। কিন্তু এর মানে কি? অনেক মতামত পাওয়া গেলেও একটা বিষয়ে সবাই একমত হয়েছে যে, ছবিটি পৌরাণিক দৃষ্টিকোণ থেকে নারীদের উর্বরতা বৃদ্ধির কোন এক রীতি। আবার কারও মতে প্রিমাভেরা হল নিও-প্লেটোনিক প্রেমের প্রকাশ।

মাইকেলেঞ্জেলোর দ্য লাস্ট জাজমেন্ট

দ্য লাস্ট জাজমেন্ট
দ্য লাস্ট জাজমেন্ট

রেনেসাঁ যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্মের চতুর্থ স্থানে আছে শিল্পগুরু মাইকেলেঞ্জেলোর দ্য লাস্ট জাজমেন্ট (The Last Judgement)। এটি একটি ফ্রেস্কো (সদ্য প্লাস্টার করা ভিজে দেয়াল বা ছাদে জল মেশানো গুঁড়ো রঙ দিয়ে আঁকা ছবি)। চিত্রকর্মটি মাইকেলেঞ্জেলোর এবং পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এক শিল্পকর্ম। এই ফ্রেস্কোটির অবস্থানও ভ্যাটিকান সিটির সিস্টিন চ্যাপেলে কিন্তু সিলিং এর পরিবর্তে বেদিতে বা দেয়ালে (অল্টারে)। এখানে চিত্রিত আছে ওল্ড টেস্টামেন্টের সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে যিশু খ্রিস্টের ছোট-বড় ৩০০ টি চরিত্র। আর এই ফ্রেস্কোটি তিনি আঁকেন সিস্টিন চ্যাপেলের প্রায় ৫,০০০ স্কোয়ার ফুট জুড়ে।

ফ্রেস্কোটিতে ফুটে উঠেছে ঈশ্বরের শেষ হিসাব-নিকাশ। যেখানে দেখানো হয়েছে যিশু খ্রিস্টের পুনর্জীবন। তিনি অবস্থান করছেন ফ্রেস্কোর মাঝামাঝি। আর তার চারপাশে আছে আরো যিশুর বিশিষ্ট অনুগামীগণ। নিচের দিকে দেখানো হয়েছে মৃতের পুনরূজ্জীবন এবং পাপিদের নরকে প্রেরণের দৃশ্য। তবে নগ্নতা থাকার কারনে ১৫৬৪ সালে কাউন্সিল অব ট্রেন্ট, দ্য লাস্ট জাজমেন্ট ফ্রেস্কোটির নিন্দা করে এবং চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর ড্যানিয়েল দ্য ভোল্টেরা কর্তৃক কিছু অশ্লীল দৃশ্য নতুন করে চিত্রায়িত করে।

রাফায়েলের দ্য স্কুল অব এথেন্স

দ্য স্কুল অব এথেন্স
দ্য স্কুল অব এথেন্স

রেনেসাঁ যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্মের ৩য় স্থানে আছে দ্য স্কুল অব এথেন্স (The School of Athens)। ১৫১০ থেকে ১৫১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে চিত্রকর্মটি করেছেন ইতালির চিত্রকর রাফায়েল (রাফায়েল্লো সেনজিও দ্যা আরবিনো)। এটি রাফায়েলের অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য কর্ম হিসেবে পরিগণিত হয়। এটি তার প্রধান প্রধান চারটি ফ্রেস্কোর মধ্যে অন্যতম। চারটি ফ্রেস্কো চারটি ভিন্ন বিষয়ে করা – দর্শনশাস্ত্র, কবিতা, ধর্মতত্ত্ব, এবং আইন। যার মধ্যে এই দ্য স্কুল অব এথেন্স ফ্রেস্কোটিতে প্রতিফলিত হয়েছে দর্শনশাস্ত্র। এখানে মোট ২১ জন দার্শনিক রয়েছেন যার মধ্যে বেশিরভাগই গ্রীক দার্শনিক। ছবিটির ঠিক মাঝের দুজন প্লেটো আর অ্যারিস্টেটল। ভাববাদী দার্শনিক প্লেটোর হাতে আছে বই আর উপরের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে রাখা। ছাত্র অ্যারিস্টেটলকে এই জগতের দৃশ্যমানের বাইরে অদৃশ্যমান কিছু মহান জ্ঞান সম্পর্কে বোঝাচ্ছেন।

রাফায়েল মারা যান মাত্র ৩৭ বছর বয়সে, তবে এর মধ্যেই অনেক উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম করে গেছেন। তার এই ছবিটির উচ্চমার্গীয় আত্মিক দিক সম্পর্ক বিবেচনা করে এর গ্রহণযোগ্যতা সবার কাছে বেড়ে গেছে। বর্তমানে ছবিটি সংরক্ষিত আছে ভ্যাটিকান সিটিতে পোপের নিজ বাসভবনে। রাফায়েল, পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াসের নির্দেশে তার আবাস কক্ষে এই ক্যানভাসটি করেছিলেন।

ভিঞ্চির দ্য লাস্ট সাপার

দ্য লাস্ট সাপার
দ্য লাস্ট সাপার

রেনেসাঁ যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্মের ২য় স্থানে আছে দ্য লাস্ট সাপার (The Last Supper)। এটি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বিখ্যাত একটি ফ্রেস্কো অর্থাৎ দেয়াল চিত্রকর্ম। এর অবস্থান ইতালীর মিলান শহরের সান্তা মারিয়া ডেলা গ্রেইজি চার্চের ডায়নিং হলের পেছনের দেয়ালে। ছবিটি বিখ্যাত হয়ে আছে এর পেছনের গল্পের জন্য। যদিও যীশু খ্রিষ্টের লাস্ট সাপার বিষয়ে আরও অনেক চিত্র আছে, তবু চিত্রশিল্পবোদ্ধাদের দুনিয়ায় এই ছবিটিই সবচেয়ে বিখ্যাত, আলোচিত এবং ঐতিহাসিক ছবি।

ছবিটিতে আমরা দেখতে পাই, খ্রিস্টান ধর্মমতে, যীশু শেষবারের মতো বসেছেন তার শিষ্যদের নিয়ে নৈশভোজে। খাওয়ার পর তিনি তার শিষ্যদের বলেন, পরদিন তোমাদের মধ্য থেকে কেউ একজন আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। যীশুর সে ভবিষ্যদ্বাণী শোনার পর তার শিষ্যরা নিজেদের মধ্যে “কে সেই বিশ্বাসঘাতক?” এই বিষয়ে আলোচনা করছে। যীশুর খুব নিকটে ডান দিকে বসে থাকা কালো বর্ণের শিষ্যটি হলো সেই জুডাস। সে-ই রোমানদের কাছ থেকে মাত্র ৩০টি রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে এ বিশ্বাসঘাতকতা করে। ছবিতে দেখা যায়, ডান হাতে জুডাস সেই রৌপ্যমুদ্রার থলি ধরে আছে।

ভিঞ্চির মোনা লিসা

মোনালিসা
মোনালিসা

ছবি নিয়ে আলোচনা হবে আর মোনা লিসার কথা আসবে না এতো অসম্ভব। তবে মোনা লিসা (Mona Lisa) সম্পর্কে নতুন করে বলবার মতো কিছু হয়তো বাকি নেই। শুধুমাত্র যেসব রহস্যের জাল এখনও শিল্প গবেষকরা ভেদ করতে পারেননি, সেসব ছাড়া। তার এই চিত্রকর্মের নাম শোনেননি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি সবচেয়ে আলোচিত ছবি এবং এটিই রেনেসাঁ যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম। ধারণা করা হয় ১৫০৩ থেকে ১৫০৬ সালের মধ্যে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এ ছবিটি এঁকেছিলেন।

কিন্তু কে এই মোনা লিসা?

অনেক শিল্প গবেষক পোর্ট্রেটের এই বিখ্যাত নারীকে ফ্লোরেন্টাইনের বণিক ফ্রান্সিসকো দ্য গিওকোন্ডার (Gioconda) স্ত্রী লিসা গেরাদিনি বলে সনাক্ত করেছেন। আবার অনেকে প্রায় লোমহীন মুখটায় অনেকে দাড়ি লাগিয়ে স্বয়ং লিওনার্দোকেই আবিষ্কার করে ফেলেন, অর্থাৎ তারা দাবি করেন, মোনা লিসা চরিত্রটি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নারীসত্ত্বা (এক্ষেত্রে ড্যান ব্রাউন এর দ্য ভিঞ্চি কোড বইটিতেও কিছুটা বলা হয়েছে)!

রেনেসাঁ যুগের আরো কিছু চিত্রকর্ম: বার্থ অব ভেনাস, দ্য ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম, দ্য কিস অফ জুডাস, সিস্টিন ম্যাডোনা, অ্যাজামশন অফ দ্য ভার্জিন ইত্যাদি।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

33 Shares
Share via
Copy link