টপ ৫: বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী বিমান (২০১৭)

১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাইট ভ্রাতৃদ্বয় এমন কিছু একটা অর্জন করে ফেললো যা ছিল মানবজাতির স্বপ্ন। তারা আবিষ্কার করেন বিমান (উড়োজাহাজ)। সেই যে শুরু – এরপর আর মানুষকে থেমে থাকতে হয়নি আকাশপথে। একের পর এক উদ্ভাবনী সংযোজনে সেই বিমান আজকের বিশ্বের সবচেয়ে ভরসার ও দ্রুতগতির এক বাহন। যুদ্ধক্ষেত্রে, ভ্রমণে ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে এই বিমান। কিন্তু দ্রুতগতির এই বাহনগুলি আসলে কতটা দ্রুতগতির? তো চলুন দেখে নেই বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী বিমান গুলো সম্পর্কে:

বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী বিমান

(Fastest Planes in The World)

লকহিড ওয়াইএফ-১২

লকহিড ওয়াইএফ-১২

লকহিড ওয়াইএফ-১২

বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী বিমানের ৫ম স্থানে রয়েছে লকহিড ওয়াইএফ-১২ (Lockheed YF-12)। ১৯৫০ সালের শেষ দিকে এফ-১০৬ ডেল্টা ডার্ট ইন্টারসেপ্টর (আটককারী বিমান) এর সম্ভাব্য প্রতিস্থাপন হিসাবে উন্নত এই প্রোটোটাইপ ইন্টারসেপ্টর তৈরি করা হয়। টেস্টিং এর সময় এটি ৮০,০০০ ফুট উপরে প্রতি ঘণ্টায় ২,০০০ মাইলেরও বেশি গতিতে উড়েছিল। তবে এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩ মাক বা ২২৭৫ মাইল। মনে করা হয়েছিল ১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝিতে এটিই হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার অন্যতম একটি প্রধান বিমান। তবে ১৯৬৫ সালে আমেরিকার বিমান বাহিনীর জন্য আরো ৯৩টি লকহিড ওয়াইএফ-১২ অর্ডার করা হলে তা প্রত্যাখ্যান করেন স্টেট সেক্রেটারি। কারন ভিয়েতনাম যুদ্ধের জন্য তহবিল বৃদ্ধি করতে অনেক তাকার প্রয়োজন ছিল। আর তারা স্বদেশের ডিফেন্স শক্তিশালী করার চাইতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের জন্য তহবিল বৃদ্ধি করাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। পরে আলোচনার প্রচেষ্টা করেও কোন লাভ হয়নি এবং ১৯৬৮ সালে এই প্রোজেক্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়।

লকহিড এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড

লকহিড এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড

লকহিড এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড

লিস্টের ৪র্থ স্থানে আছে লকহিড এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড (Lockheed SR-71 Blackbird)। ১৯৬৬ সালে এটি আসার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিমান বাহিনী এবং নাসা উভয়ই এই বিমানটি ব্যবহার করে। সর্বমোট ৩২টি ব্ল্যাকবার্ড তৈরি করা হয়েছিল। এই এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড বিমানগুলো ব্যবহার করা হত নিরীক্ষণ এবং পরীক্ষামূলক গবেষণার জন্য। এর গুরুত্বপূর্ণ একটি ফিচার ছিল স্টিলথ টেকনোলজি। যে কারনে বিমানটিকে রাডারে সহজে শনাক্ত করা যায় না। তবে যদিও বা ধরা পরে যায় তবুও ইন্টারসেপ্টর (আটককারী বিমান) এর নিক্ষিপ্ত মিসাইল থেকে পালিয়ে যেতে পারে এর গতির জন্য। টেস্টিং এর সময় এটি ৮৫,০০০ ফুট উপরে প্রতি ঘণ্টায় ২,২০০ মাইলেরও বেশি গতিতে উড়েছিল। তবে এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩.২ মাক বা ২৪৫৫ মাইল। এতো উঁচুতে এতো স্পীডে চলার কারনে এতো তাপ খুব বেশি উৎপন্ন হতো, তাই এই এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড কে দুটি ছোট খণ্ডে বানানো হয়েছে।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধ বিমান
আরো পড়ুন:  টপ ৫: বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির গাড়ি (২০১৭)

বোয়িং এক্স-৫১ ওয়েভরাইডার

বোয়িং এক্স-৫১ ওয়েভরাইডার

বোয়িং এক্স-৫১ ওয়েভরাইডার

বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী বিমানের পরবর্তী স্থানে আছে বোয়িং এক্স-৫১ ওয়েভরাইডার (Boeing X-51 Waverider)। এটি একটি পরীক্ষামূলক বিমান যা হাইপারসনিক গতিতে চলতে পারে (বাতাসের চেয়ে কমপক্ষে পাঁচগুণ দ্রুত বা ঘন্টায় ৩ হাজার ৮০০ মাইল গতিতে ছুটতে পারলে ওই যানকে হাইপারসনিক বলা হয়)। বোয়িং এক্স-৫১ ওয়েভরাইডার এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৫ মাক বা ৩৮৫০ মাইল। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমানটির মূল উদ্দেশ্য অবশ্য যাত্রী বহন করা নয়৷ তাদের লক্ষ্য এই গতিকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে মাত্র এক ঘন্টার মধ্যে হামলার যোগ্যতা অর্জন৷ সেজন্য বোয়িং এক্স-৫১ ওয়েভরাইডারকে বিমান বলা হলেও এটা হতে পারে একটা ক্ষেপণাস্ত্র যা ছুটে গিয়ে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে। এখনও ফ্লাইট টেস্টিং চলছে এবং ২০১৩ সালের একটি পরীক্ষায় এটি ৫ মাক এর বেশি গতিতে আকাশে ২১০ সেকেন্ড এর মত ছিল। আশা করা যাচ্ছে ২০২৫ সালের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে এটি প্রস্তুত করা হয়ে যাবে এবং তখন তার গতি হতে পারে ঘণ্টায় প্রায় ৩৯০০ মাইল।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিমান বা উড়োজাহাজ
আরো পড়ুন:  টপ ৫: বিশ্বের সবচেয়ে সেরা এয়ারলাইন্স (২০১৮)

নর্থ আমেরিকান এক্স-১৫

নর্থ আমেরিকান এক্স-১৫

নর্থ আমেরিকান এক্স-১৫

লিস্টের ২য় স্থানে আছে কাস্টমাইজড নর্থ আমেরিকান এক্স-১৫ (North American X-15)। এটিই মানুষচালিত সবচেয়ে দ্রুত গতির বিমান। বিমানটি ১৯৫০ সালের শেষের দিকে তৈরি করা হয়েছিল। এটি তৈরি করে নর্থ আমেরিকান অ্যাভিয়েশন (North American Aviation) ও রিয়েকশন মোটরস্ (Reaction Motors)। যার মধ্যে এয়ারফ্রেম তৈরি করেছিল নর্থ আমেরিকান অ্যাভিয়েশন এবং ইঞ্জিন তৈরি করেছিল রিয়েকশন মোটরস্। এটিও একটি হাইপারসনিক বিমান। রকেটচালিত এই নর্থ আমেরিকান এক্স-১৫ বিমানটি ঘণ্টায় প্রায় ৬ মাক বা ৪৫০০ মাইল গতিতে ছুটতে পারে। তবে এই উচ্চ গতিতে স্থিতিশীল হওয়ার জন্য, এতে একটি বড় শঙ্কু আকৃতির লেজ যুক্ত করা হয়েছিল যার কারনে স্পীড কম থাকলে বিমানটি কিছুটা সমস্যা করতো। এটি ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি উচ্চতায় পৌঁছে বিশ্ব রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয়।

নাসা এক্স-৪৩

নাসা এক্স-৪৩

নাসা এক্স-৪৩

বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী বিমান হলো নাসা এক্স-৪৩ (NASA X-43)। এটি হাইপো-এক্স প্রোগ্রামের অংশ হিসাবে নাসা কর্তৃক নির্মিত একটি হাইপারসনিক বিমান। দ্রুতগতি দেওয়ার জন্য এই নাসা এক্স-৪৩ বিমানটিকে স্থাপন করা হয়েছে রকেটের ফুয়েল বুস্টার এর উপর যা প্যাগাসাস রকেটের একটি সংশোধিত সংস্করণ। আর এর ফলে বিমানটি পেয়েছে এক অবিশ্বাস্য গতি যা ঘণ্টায় প্রায় ৯.৫ মাক বা ৭২০০ মাইল। অর্থাৎ এর গতি শব্দের গতির থেকে প্রায় দশ গুন বেশি! মোট ৩টি এক্স-৪৩ বিমান তৈরি করা হয়েছিল। যার মধ্যে প্রথমটি ফ্লাইট চলাকালীন ধ্বংস হয়ে যায় এবং বাকি দুটিকে সফল ভাবে ফ্লাইট সম্পন্ন হওয়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে মহাসাগরে ক্র্যাশ করা হয়। তবে এর মধ্যে সর্বশেষ এক্স-৪৩  বিমানটির গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৭৩১০ মাইল।

পোস্টটি ভালো লাগলে বা যেকোনো মতামত থাকলে কমেন্টে জানাবেন। আর আপনার বন্ধুদের জানাতে শেয়ার করতে ভুলবেন না যেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *