টপ ৫: ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ৫ মহামারী

কোনো সংক্রামক রোগ যখন খুব দ্রুত সময়ে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মাঝে সংক্রমিত হয়ে পড়ে তখন সেই রোগটি মহামারী আকার ধারণ করেছে বলা হয়। বর্তমানে বিশ্বায়নের প্রভাবে যেমন রোগ ছড়িয়ে পড়া সহজ, তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির কারনে অনেক মহামারী তেমন মারাত্মক হয়ে উঠতে পারেনি। তবে মহামারীর কারনে যুগে যুগে অসংখ্য মৃত্যু হয়েছে, কখনও কখনও তা পরিবর্তন করে দিয়েছে ইতিহাসের গতিপথ, আবার কখনও কখনও বিলুপ্তি করে দিয়েছে পুরো একটি সভ্যতা। ইতিহাসে এরূপ অনেক মহামারীর তথ্য আমরা পাই। সেইসব মহামারীগুলোর মধ্য থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ৫ মহামারী নিয়ে আমাদের আজকের লেখা।

ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ৫ মহামারী

দ্য থার্ড প্লেগ প্যানডেমিক

দ্য থার্ড প্লেগ প্যানডেমিক
দ্য থার্ড প্লেগ প্যানডেমিক

ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ৫ মহামারী গুলোর মধ্যে ৫ম স্থানে আছে দ্য থার্ড প্লেগ প্যানডেমিক (The Third Plague Pandemic)। ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্তৃত আকারে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে মোটামুটি ৩ বার। যারমধ্যে তৃতীয়টির উৎপত্তি ১৯ শতকে চীনে। সেসময় বিশ্ববাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে দেশটি। দেশটির ইউয়ান নামক একটি ছোট্ট গ্রামে প্রথম এই প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ক্রমে তা বিস্তার লাভ করে হংকং আর গুয়াংঝু প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। আর এসব শহরগুলোর সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরাসরি বাণিজ্য সম্পর্ক থাকায় তা ক্রমে ছড়িয়ে পরে বিশ্বের আরো অনেক দেশে। প্লেগ ছড়িয়ে যায় ভারত, আফ্রিকা, ইকুয়েডর, এমনকি আমেরিকাতেও। ১৮৫৫ সাল থেকে প্রায় দুই দশক স্থায়ী এ মহামারীতে প্রাণ হারায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ। যার মধ্যে শুধুমাত্র ভারতেই মারা যায় প্রায় ১ কোটি মানুষ।

এইচআইভি/এইডস

এইচআইভি/এইডস
এইচআইভি/এইডস

ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ৫ মহামারী গুলোর মধ্যে পরবর্তী স্থানে আছে এইচআইভি/এইডস (HIV/AIDS)। ক্লিনিক্যালি এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত রোগী প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৮১ সালের ৫ই জুন। আর এই মহামারী রোগের ভাইরাস শনাক্ত হয় ১৯৮৪ সালে, যা আবিস্কার করেন ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা। এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৬ মিলিয়ন বা ৭ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। বর্তমানে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৮ মিলিয়ন। আর এ পর্যন্ত এইডসে মারা গেছে পায় ৩৩ মিলিয়ন বা সাড়ে তিন কোটি মানুষ [WHO]। এরমধ্যে ২০১৯ সালে এইডস রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ১.৭ মিলিয়ন, আর মারা গেছেন প্রায় ৭ লাখ মানুষ [UNAIDS]।

স্প্যানিশ ফ্লু

স্প্যানিশ ফ্লু
স্প্যানিশ ফ্লু

ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ৫ মহামারী গুলোর মধ্যে ৩য় স্থানে আছে স্প্যানিশ ফ্লু (Spanish Flu)। ১৯১৮ সালের শেষের দিকে স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা নামের ভয়ঙ্কর এক মহামারী সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এটি “দ্য ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক” বা “দ্য গ্রেট ফ্লু প্যানডেমিক” নামেও পরিচিত। নামে স্পেন থাকলেও ধারনা কড়া হয় এই ভাইরাসের উৎপত্তি হয়তোবা আমেরিকাতে। তবে স্পেনের সংবাদ মাধ্যমগুলো এই ফ্লুর খবরটি মুক্তভাবে পরিবেশন করছিল বলে এই ফ্লু এর নামকরণ হয় স্প্যানিশ ফ্লু। এই স্প্যানিশ ফ্লু প্রায় ২ বছর ধরে ছিল। আর এর চারটি ওয়েভের মধ্যে ২য় ওয়েভটি ছিল সবচেয়ে মারাত্মক। ধারনা করা হয় স্প্যানিশ ফ্লু’তে বিশ্বেজুড়ে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল, যা ছিল তখনকার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। আর ভয়ঙ্কর এই মহামারীতে প্রাণহানি হয়েছিল প্রায় ১০ কোটি মানুষের।

দ্য ব্ল্যাক ডেথ

দ্য ব্ল্যাক ডেথ
দ্য ব্ল্যাক ডেথ

ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ৫ মহামারী গুলোর মধ্যে ২য় স্থানে আছে দ্য ব্ল্যাক ডেথ (The Black Death)। পৃথিবীর ইতিহাসে কিংবা একটু ছোট পরিসরে বললে ইউরোপের ইতিহাসে ব্ল্যাক ডেথের মতো আলোচিত মহামারী আর নেই। এরকম ভয়ানক, সর্বগ্রাসী রোগের প্রাদুর্ভাব সম্ভবত পৃথিবী একবারই দেখেছিল। কৃষ্ণ সাগরের (ব্ল্যাক সি) উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল বলে একে ব্ল্যাক ডেথ বলা হয়। সেসময় ইউরোপ ও এশিয়ার বাণিজ্য হতো এ কৃষ্ণ সাগর দিয়েই। আর এখান থেকে খাদ্যদ্রব্যের জাহাজগুলোতে চড়ে বসতো অসংখ্য ইঁদুর, যেগুলো কি-না রোগের প্রধান জীবাণুবাহী।

১৩৪৬-৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ছিল এই মহামারীর সময়কাল। তবে ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সাল ছিল ব্ল্যাক ডেথের সবচেয়ে বিধ্বংসী সময়। এ সময় ইউরোপের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় এই মহামারী। তবে এ অভিশপ্ত মহামারীর প্রভাব টিকে ছিল অন্তত ২০০ বছর। ইতিহাসবিদদের মতে, এ ২০০ বছরে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি থেকে ২০ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন! এটি এমনই এক মহামারী ছিল যে, এর কারণে সমগ্র ইউরোপের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সার্বিক জীবন কাঠামোই বদলে যায়, প্রভাবিত হয় ধর্ম-শিল্প-সাহিত্যও।

দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান

দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান
দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান

ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক মহামারী ছিল দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান (Plague of Justinian)। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী সম্রাট জাস্টিনিয়ান বিভিন্ন কারনে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। কিন্তু তার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় তার শাসনামলে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ মহামারীর কারণে। ৫৪০-৫৪১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মিশরে এই ভয়ানক প্লেগের উৎপত্তি ঘটে। আর সম্রাটের নাম অনুসারেই এই প্লেগের নাম হয় প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান।

ভয়াবহ এই মহামারী বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে ইঁদুর। তৎকালীন পৃথিবীতে মিশরই ছিল সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যশস্যের জোগানদাতা। ফলে মিশরে সৃষ্ট এই রোগ সহজেই অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে যায়। প্রায় ৫০ বছর টিকে থাকা এ মহামারী আড়াই কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। তবে কিছু কিছু উৎসে সংখ্যাটা ১০ কোটিতেও ঠেকেছে। প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক এ মহামারীই ইউরোপে ‘ডার্ক এজ’র সূচনা করেছিল।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

0 Shares
Share via
Copy link
Powered by Social Snap