অগমেন্টেড রিয়েলিটি: মস্তিষ্কের স্নায়বিক অনুভূতির বাস্তব রূপান্তর

অগমেন্টেড রিয়েলিটি

অগমেন্টেড রিয়েলিটি

আপনি কি টেবিল জম্বী গেমটি খেলেছেন বা খুব সম্প্রতি আহসানউল্লাহ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর আমাদের বিমানবাহিনীর জন্মগাঁথা নিয়ে বানানো কিলোফাইট এন্ড্রয়েড গেমটি? আয়রনম্যান তো আপনি অবশ্যই দেখেছেন। তাহলে অগমেন্টেড রিয়েলিটি আপনার কাছে অজানা-অচেনা নয় একেবারেই।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি বা এআর

অগমেন্টেড রিয়েলিটি (Augmented Reality) মূলত একটি বাস্তব নয়, কিন্তু বাস্তবের কোনকিছুর সাথে আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা আর কম্পিউটার সিমুলেশান ব্যবহার করে দুটি ভিন্ন ঘটনাকে মিলিয়ে দেবার একটি উপায়। এই প্রযুক্তি শুধু কল্পবিজ্ঞানকেই বাস্তবায়িত করে না, অদৃশ্য জগৎকেও দেখতে সাহায্য করে। যেমন আপনি চেয়ারে বসে চোখে হেড মাউন্টেড ডিসপ্লে লাগিয়ে একটা সিমুলেটেড সিস্টেমের মাধ্যমে একেবারেই ভিন্ন কিছু যেমন আয়রনম্যান মুভির মতই একটা ত্রিমাত্রিক পরিবেশের স্বাদ পেতে পারেন!

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মরটন হেলিগ (Morton Helig) নামক এক ভদ্রলোক সর্বপ্রথম সেন্সোরামা (Sensorama) নামক একটি যন্ত্র তৈরি করা শুরু করেন। তিনি এই যন্ত্রের সাহায্যে দর্শকদের সিনেমার ভেতরে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, যাতে দর্শকদের মনে হয় তারা সিনেমার ভিতরেই আছেন। এতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন মাল্টিসেন্সরি টেকনোলজি যার কারনে দর্শকেরা বাতাস, ঠাণ্ডা, তাপ ইত্যাদির অনুভূতি পেত। আমাদের নভোথিয়েটার অনেকটা মরটন হেলিগের তৈরি সেন্সোরামার মতই। এখানে ছবি, শব্দ, চেয়ারের কাপুনি ইত্যাদির মাধ্যমে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় যাতে দর্শকেরা মনে করেন তারা যেন মহাকাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

অগমেন্টেড রিয়েলিটির দুনিয়া

অগমেন্টেড রিয়েলিটির দুনিয়া

প্রযুক্তি আজ এতই এগিয়েছে যে, একে এখন আর কাল্পনিক বা বেখাপ্পা কিছু মনে হয় না। আপনি চাইলে গুগল লাইভলি’র মাধ্যমে কোন ভার্চুয়াল পরিবেশে বসে বহুদূরের বন্ধুর সাথে হরেক রকম গ্রাফিক্যাল ইমেজের মাধ্যমে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারেন। বলা হচ্ছে, আগামী দিনের বাস্তবতাই হবে এই অগমেন্টেড রিয়েলিটি। কেউ কেউ ভাবছেন, অগমেন্টেড রিয়েলিটির কল্যানে মানুষের টেলিপ্যাথি ক্ষমতার স্বপ্ন আর খুব বেশী দূরে নয়।

আরো পড়ুন:  ভার্চুয়াল রিয়েলিটি: কল্পনাশক্তির ত্রিমাত্রিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবায়ন

হলিউড এমনকি বলিউডের সিনেমাতে অগমেন্টেড রিয়েলিটির ব্যবহার অনেক আগে শুরু হলেও, আমাদের প্রতিদিনকার জীবনেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উন্নত বিশ্বে, নতুন ডাক্তারদের প্রশিক্ষণে অগমেন্টেড রিয়েলিটি এখন খুবই পরিচিত এক নাম। বিশেষকরে, সার্জিক্যাল আর ল্যাপরোস্কপিক প্রশিক্ষণে এখন অগমেন্টেড রিয়েলিটির ব্যবহার নিত্য। খুব সহজেই আর প্রশিক্ষন ব্যয়-সময় কমিয়ে এনে দারুণভাবে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা যাচ্ছে। এমনকি সাধারণ ক্লাসেও, বৈজ্ঞানিক কঠিন বিষয়কে সহজেই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে। কিংবা ইতিহাস-ভূগোল ক্লাসেও প্রয়োজনীয় আবহ তৈরির মাধ্যমে শিক্ষাদান সহজ হচ্ছে। গুগল সেবা অগ্ম্যান্ট্রিক্স তো বাংলাদেশেই, আমেরিকার ডাক্তারদের মাধ্যমে উন্নত সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, গুগল গ্লাসের ফিচার ব্যবহার করে। এখানেও আছে অগমেন্টেড রিয়েলিটির কিছু ব্যবহার।

আরো পড়ুন:  আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: যন্ত্রের মানুষ হবার শিক্ষা

ড্রাইভিং শেখাতেও অগমেন্টেড রিয়েলিটি আজকাল ব্যবহার হচ্ছে। মাইক্রো কম্পিউটার টেকনোলোজি সহজলভ্য হওয়াতে, হেড মাউন্টেড ডিসপ্লের মাধ্যমে সহজেই নতুন চালকদের রাস্তায় এক্সিডেন্ট না ঘটিয়ে কম সময়ে, কম খরচে দক্ষ করে তোলা যাচ্ছে।

সামরিক বাহিনীতে অগমেন্টেড রিয়েলিটির ব্যবহার অনেক আগেই শুরু হয়েছে। বিশেষ করে নৌ বাহিনী আর বিমানবাহিনীর ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণ অগমেন্টেড রিয়েলিটির ব্যবহারের মাধ্যমে দারুণভাবে উপকৃত হচ্ছে। সেনাবাহিনীও ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ঝালিয়ে নিতে পারছে। সিনেমার মত বিজ্ঞাপন জগতে অগমেন্টেড রিয়েলিটি জাদুকরী বিপ্লব এনে দিবে বলে ভাবা হচ্ছে। মার্কেট স্ট্যান্ডের মতপ্রথম সারির এনালাইসিস কোম্পানি তো ইতিমধ্যেই ভবিষ্যৎবানীকরে বসেছে যে, ২০২২ সালের মধ্যে অগমেন্টেড রিয়েলিটির সামগ্রিক বাজার হবে ১১৯ বিলিয়ন ডলারের বেশী। এরমাঝেই মোবাইল এপ্স নির্মাতারা অগমেন্টেড রিয়েলিটি ভিত্তিক এপ্স বানাতে উঠেপড়ে লেগেছেন। অগমেন্টেড রিয়েলিটি ভিত্তিক গেম পকোমন গো (Pokemon Go), গেম নির্মাতাদের চিন্তাভাবনাই পাল্টে দিয়েছিল ২০১৫ সালে। এখন অব্দি ইন্টারনেট থেকে সবচেয়ে বেশীবার ডাউনলোড হয়েছে অগমেন্টেড রিয়েলিটি ভিত্তিক এই পকোমন গেম। গুগল, মাইক্রোসফট, আপ্যালের পাশাপাশি লেনোভোর মত কোম্পানিরাও অগমেন্টেড রিয়েলিটি নির্ভর ডিভাইস তৈরিতে সামিল হয়েছেন।

মাইক্রোসফ্ট হলোলেন্স

মাইক্রোসফ্ট হলোলেন্স

কিন্তু এই পর্যন্ত সবচেয়ে তাক লাগানো অগমেন্টেড রিয়েলিটি সম্বলিত ডিভাইসটি তৈরি করেছে মাইক্রোসফ্ট (Microsoft)। তাদের যন্ত্রের নাম হলোলেন্স (Microsoft Hololens)। এই যন্ত্রটিতে রয়েছে একটি Head Gear যা অনেকটা একটি আধুনিক সানগ্লাসের মতই। এই গ্লাসের সহায়তায় ব্যবহারকারীরা খুব সহজেই ঢুঁ মেরে আসতে পারেন গেমস বা সিনেমার দুনিয়ায় অথবা ঘুরে আসতে পারেন দূরের কোন দেশ থেকে।

অবশ্য এখনো অগমেন্টেড রিয়েলিটি খুব সহজলভ্য কোন প্রযুক্তি নয়।প্রাথমিকভাবে এর ব্যয়ভার অনেক বেশী। অন্যদিকে, বিজ্ঞানীরা অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে মানুষের ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে যাবার ব্যাপারে নিজেদের আশংকা জানিয়েছেন। কারোর মতে, এটা মানবজাতিকেই নিঃশেষ করে দিতে পারে। কল্পনানির্ভর এই প্রযুক্তি ক্রমেই মানুষের চিন্তা করবার ক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে বলে তারা বারবার হুঁশিয়ার করছেন। অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে মানুষের সামাজিক যোগাযোগের ক্ষমতাও হ্রাস পেতে পারে বলে তারা মনে করছেন। মাত্রারিক্ত স্মার্টফোন আসক্তি আমাদের ক্ষতিই করবে বলে ভাবছেন তারা।

সবকিছুরই কিছু নেতিবাচক দিক থাকবেই। বুদ্ধিমান মানুষ সবসময়ই প্রযুক্তির ভালো দিকটিই বারবার বেছে নিয়েছে, আর তাকে সাথে করেই এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। যাবে সামনে আরও অনেকপথ। অগমেন্টেড রিয়েলিটি মানুষের জন্য প্রযুক্তির এক আশীর্বাদ হয়ে উঠবে, এটাই আমাদের চাওয়া।

লেখক: Abid Reza

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *