আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: যন্ত্রের মানুষ হবার শিক্ষা

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা: যন্ত্রের মানুষ হবার শিক্ষা

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: যন্ত্রের মানুষ হবার শিক্ষা

মানুষের তৈরি সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কার সম্ভবত কম্পিউটার, যার সামনে আমরা প্রতিনিয়তই থ বনে ভাবি, কিভাবে এই বাক্স দারুণ সব কাজ নিমিষে করে। আদতে, কম্পিউটার একটা বোকা বাক্স –এর নিজের থেকে কাজ করবার কোন ক্ষমতাই নেই। বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ভাষার মাধ্যমে আমরা একে নানাকাজের আদেশ দেই, সেই প্রোগ্রাম অনুযায়ী কম্পিউটার কাজ করে আমাদের থ বানিয়ে দেয়! অনেককাল থেকেই কম্পিউটারের উৎকর্ষ সাধনের অংশ হিসেবে, কিভাবে এর নিজে থেকে কাজ করবার ক্ষমতা বাড়ানো যায় তা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। নিজ থেকে কম্পিউটারের কাজ করবার এই ক্ষমতার পোশাকি নামই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। অন্য সবার উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তার বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তা করতে পারবার ক্ষমতার কারনে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে যন্ত্রের সেই সক্ষমতায় ‘ভাগ’ বসানোর কথাই আমরা জানবো! আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ধারনার লক্ষ্য হচ্ছে যন্ত্র বা কম্পিউটারকে মানুষের মত চিন্তা করে সিধান্ত নিতে পারার সক্ষমতা দেয়া।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স: যন্ত্রের মানুষ হবার শিক্ষা

যাদের হাত ধরে কম্পিউটার আজকের অবস্থানে এসেছে,তাদের অন্যতম এল্যান টুরিং, ২য় বিশ্বযুদ্ধের কিছুপরে গানিতিকভাবে যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা নির্ণয় করার একটি পদ্ধতি আবিস্কার করেন, যা টুরিং টেস্ট নামে পরিচিত। এ পদ্ধতি অনুযায়ী একজন ব্যাক্তি একটি কম্পিউটার ও একজন মানুষ কে একই ধরনের কিছু প্রশ্ন করে, কে মানুষ আর কে কম্পিউটার তা বোঝার চেষ্টা করে। এমতাবস্থায় মেশিন যদি ব্যাক্তিকে তার দেয়া উত্তরের মাধ্যমে নিজেকে ‘মানুষ’ হিসেবে চিহ্নিত বা ধোঁকা দেয়াতে পারে, তাহলেই সেই কম্পিউটার বা যন্ত্রকে কে আর্টিফিশিয়ালি ইন্টেলিজেন্ট বলা যাবে – মূলত এটি ছিল সে টেস্টের সারমর্ম। তবে টুরিং নিজে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শব্দটি ব্যবহার করেননি। ১৯৫১ সালে, মারভিন মিন্সকি নিউর্যাল নেটওয়ার্ক তৈরির সময় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শব্দটির পরিচয় ঘটান। অবশ্য যন্ত্র কিভাবে নিজে চিন্তা করবে, এই নিয়ে সিমোর প্যাপার্টের অবদানও ফেলনা না।

খুব সাধারণভাবেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের একটা উদাহরণ আমরা পেতে পারি। সার্চ ইঞ্জিন গুগলে আমরা কিছু লিখতে গেলেই সে নিজে থেকে কিছু সাজেশন আমাদের জানায়। খুব সাধারণভাবে, এটাই আমাদের চাওয়ার সাথে সাথে গুগলের নিজস্ব চিন্তা করবার ক্ষমতা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স।
বিজ্ঞানীরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের তিনটি ভাগ

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের তিনটি ভাগ

Artificial Narrow Intelligence ( ANI) বা আর্টিফিশিয়াল ন্যারো ইন্টেলিজেন্স (এএনআই)

ANI কে আমরা বলতে পারি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রথম ধাপ। এক্ষেত্রে যন্ত্র হবে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ। যেমন যে যন্ত্র দাবা খেলতে পারবে, সে শুধু দাবা খেলাই ভালো পারবে। দাবা থেকে সাপলুডু খেলা সহজ হলেও, তাকে দাবার বদলে যদি লুডু খেলতে দেয়া হয়, সে যন্ত্র সেটা পারবে না।

Artificial General Intelligence (AGI) বা আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (এজিআই)

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দ্বিতীয় ধাপ AGI । একে Strong AI বা Human Level AI- ও বলা হয়। AGI ধাপে যন্ত্র মানুষের মত চিন্তা করতে পারবে, পরিকল্পনাকরতে পারবে, সমস্যা সমাধান করতে পারবে, হঠাৎ নতুন ভিন্ন কোন পরিবেশে চারপাশ সাপেক্ষে নিজেকে মানিয়ে নেবার মত সক্ষমতা অর্জন করবে।

Artificial Super Intelligence (ASI) বা আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স (এএসআই)

ASI হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের তৃতীয় ও সর্বাধুনিক পর্যায়। যন্ত্র যখন মানুষ থেকেও দক্ষ ভাবে চিন্তা করতে পারবে তখনই যন্ত্র আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স পর্যায়ে নিজেকে নিয়ে যাবে। অবশ্য এই পর্যায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীরা একই সাথে চিন্তিত ও শঙ্কিত।

আমাদের প্রতিদিনকার স্মার্টফোনেই অনেক ANI প্রোগ্রাম আছে। স্মার্টফোনের সবচেয়ে সফল ANI প্রোগ্রাম হল সিরি বা কর্টনা। হালের সেলফ ড্রাইভিং কার ANI পর্যায়ের চমৎকার উদাহরণ। । অ্যামাজন বা ইবে থেকে শুরু করে সব বড় বড় ওয়েব সাইটেই ANI এর প্রয়োগ রয়েছে। মানবসভ্যতা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে এখনো ANI পর্যায়েই আছে।

আরো পড়ুন:  ভার্চুয়াল রিয়েলিটি: কল্পনাশক্তির ত্রিমাত্রিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবায়ন

ANI সিস্টেম ১৯৯৭ সালে মানুষকে হারিয়ে তার দাপট শুরু করে। ‘ডীপ ব্লু’ নামের একটি কম্পিউটার বিশ্বখ্যাত দাবার গ্রান্ডমাস্টার চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভকে হারিয়ে দেয়। তারপরের বছরেই আলফা গো মানুষকে হারায় ANI ব্যাবহার করে। আলফা গো নামক কম্পিউটার প্রোগ্রামটি তৈরি করে গুগলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডীপমাইন্ড।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা

উপরের আলোচনা পড়তে গিয়ে মনে হতে পারে, তবে কি যন্ত্র বা কম্পিউটার একদিন মানুষের জায়গা দখল করে নিবে? ১৯৮৪ সালে চিত্রপরিচালক জেমস ক্যামেরনের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীনির্ভর মুভি ‘টার্মিনেটর’ নির্মাণ করেছিলেন। আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের দারুণ জনপ্রিয় সেই মুভিতে ক্যামেরন একটি ভিন্ন গল্প তুলে এনেছিলেন যেখানে দেখানো হয়েছিল, ২০১১ সাল হবে মানুষের বিপরীতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জয়ের শুরু। মুভিতে ২০১১ সালে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গেছে রোবটকে। বুদ্ধিমান রোবটরা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় নেয়ার পরিকল্পনায় মানবজাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার মিশনে নামে। যদিও বাস্তবের ২০১১ সালে জেমস ক্যামেরনের সে আশঙ্কা ফলেনি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গ নির্মাণ করেছিলেন ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স – এআই’ । আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে এরপরেও অনেক মুভি হয়েছে। প্রায় সবগুলোতেই দেখানো হয়েছে, কিভাবে কৃত্রিম নিজস্ব বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কে যদি কাজে লাগানো যায় সত্যি এক বিশাল বিপ্লব ঘটে যাবে প্রযুক্তিবিশ্বে। বর্তমানে রোবটিক্স এর উপর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর প্রভাব বেড়েই চলেছে। বিমান চালনায় অটো পাইলটিং এর ব্যবহার বাড়ছে। এমন প্রোগ্রামগুলোকে আরও বেশি বাস্তব পরিস্থিতি বান্ধব করে তৈরি করা হচ্ছে। প্রোগ্রাম ব্যবহার করে একদিন পাইলট ছাড়াই প্লেন চলতে পারবে- এমন লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছেন প্রোগ্রামাররা। অনেকক্ষেত্রে সেলফ ড্রাইভিং গাড়ির মাধ্যমে এব্যাপারে সফলতাও এসেছে।ইহাং-১৪৮ এর মাধ্যমে সেলফ পাইলটিং মানুষবাহী ড্রনও আমরা দেখছি এখন।

আরো পড়ুন:  ভার্চুয়াল রিয়েলিটি: কল্পনাশক্তির ত্রিমাত্রিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবায়ন

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের তৃতীয় পর্যায়ে রোবটরা মানুষের সব কাজেই নিজেকে সামিল করতে পারে, এমনকি মানুষ থেকেও দ্রুতগতিতে ও নির্ভুলভাবে কাজসম্পাদন করতে পারবে। তারা মানবসভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার উদ্যোগ নিতে পারে, এমনটিই ভাবেন বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং।হকিংয়ের মতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ( তৃতীয় পর্যায়) এর কারনে মানবসভ্যতার বিলুপ্তি পর্যন্ত হতে পারে! তাঁর ধারণা রোবট কৃত্রিমভাবে বুদ্ধিসম্পন্ন হলে নিজেদের উন্নতিও মনোযোগ দিবে। যদিও তার এই ধারণার সাথে একমত নন অনেকবিজ্ঞানী। তাদের মাঝে অন্যতম ক্লেভারবটের আবিস্কারক রলো ক্রিপেন্টার। তাঁর ক্লেভারবট আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এক দারুণ উদাহরণ। ক্লেভারবট নিজে অন্যের কথা শুনে তা অবিকল বলতে পারে।মাইক্রোসফটের প্রধান গবেষক এরিখ হরভিজও মনে করেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স মানবজাতির জন্য হুমকি নয় বরং উপকারই করবে নানাভাবে ।যতই বিতর্কিত হোক – আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োগ এবং প্রভাব এখন অনেক বিষয়েই ছড়িয়ে পড়েছে – কম্পিউটার সায়েন্স, গণিত, সাইকোলজি, দর্শন, নিউরোসাইন্স থেকে শুরু করে এরথেকে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম মনোবিজ্ঞানের মত নতুন কিছু বিশেষায়িত শাখা।

তবে যত যাই বলি না আমরা – আগামী দিন যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নির্ভর হতে যাচ্ছে অনেকাংশে, এটা নিশ্চিত।

লেখক: Abid Reza

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *