ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি: ভবিষ্যৎ বিশ্বের বৈপ্লবিক পরিবর্তন

ছেলেবেলায় কাজী নজরুলের সে কবিতা নিশ্চয় পড়েছেন, “বিশ্ব জগত দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে”। কবির সে অবদমিত ইচ্ছা আজ অনেকটাই সত্যি হয়েছে আজকের পৃথিবীর অন্যতমা আলোচিত বিষয় ‘ইন্টারনেট অফ থিংস (Internet of Things)’ কে ঘিরে যার সংক্ষিপ্ত রূপ ‘আইওটি‘। আমাদের চারপাশে প্রতিদিনকার জীবনে আমরা যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি – এসি, কফিমেকার, টেম্পয়ারেচার কন্ট্রোল, ফ্যান, টিভি, দরজার ইলেক্টিক লক, গাড়ির গ্যারেজের দরজা, গাড়ি ইত্যাদি সবই ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজের মুঠো থেকে পৃথিবীর যেকোন জায়গায় বসে নিয়ন্ত্রণের এক উপায়কেই এই ‘ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি’ বলা হচ্ছে। অবশ্য, শুধু ঘরের মাঝেই এর ব্যাপ্তি নয়, আইওটির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হতে পারে যেকোন ইন্ডাস্ট্রি। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল ওয়াং তো তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন,যদি আইওটির ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় তবে আমাদের পোশাকশিল্পের আগুন সংক্রান্ত দুর্ঘটনা ৯০ ভাগ পর্যন্ত এড়ানো সম্ভব হবে।

ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি (IoT) কি?

ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি কি?

ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি কি?

ইন্টারনেট অব থিংসে বিভিন্ন ডিভাইসের সেন্সর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কোন নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কে থাকা বিভিন্ন ডিভাইসের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে ওয়্যার কমিউনিকেশন, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি, সিরিয়াল কমিউনিকেশন, সিরিয়াল পেরিফেরাল ইন্টারফেস সহ নানা মাধ্যম ব্যবহার করে লোকাল প্রসেসিং ডিভাইসে যেমন হতে পারে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে সে তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে, পরবর্তীতে বিভিন্ন কমিউনিকেশন প্রটোকল যেমন HTTP, MQTT, Wi-fi, ব্লুটুথ ইত্যাদি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ওয়েব সার্ভার কিংবা ক্লাউড কম্পিউটিং সার্ভারে পাঠানো হয়। সিস্টেমে ডাটাবেজে এ তথ্যসমূহ জমা থাকে। ডাটা এনালাইটিক্স এর মাধ্যমে বিভিন্ন সেন্সর থেকে পাওয়া বিভিন্ন সময়ের তথ্য প্রসেস করে এবং সিস্টেম থেকেই রেজাল্ট ফিল্টারিং করে কমান্ড তৈরি করা হয়। এতে একই সাথে ডিপেন্ডেন্ট অন্যান্য সিস্টেমকে পরিচালনা করা হয়। সমস্ত প্রক্রিয়াটি অনলাইন নির্ভর হওয়ায় যেকোন জায়গায় বসেই সিস্টেমে কমান্ড পাঠানোর মাধ্যমে ডিভাইস বা এনভায়রনমেন্ট নিয়ন্ত্রণ, স্ট্যাটাস ভিজুয়ালাইজ করা থেকে শুরু করে  চালু – বন্ধ করা সবই করা যাবে এককথায়।

ইন্টারনেট কানেক্টেড ডিভাইস বলতে আমরা এখনও বুঝি আমাদের পিসি, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, স্মার্টফোন এসবই। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এখন অন্যান্য অনেক কিছুই ইন্টারনেট সংযুক্ত হয়ে পড়ছে,পড়বে। এগুলোকেই বলা হচ্ছে স্মার্ট ডিভাইস। অবাক করার মতো হলেও টিভি, ফ্রিজ, গাড়ি, এমনকি দরজার তালাতেও ইন্টারনেট সংযুক্ত হচ্ছে।

বাড়িতে ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি (IoT)

বাড়িতে ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি (IoT)

আইওটির ধারনায় সব যন্ত্রের একটি করে আইপি এড্রেস থাকবে। IPv6 এই কাজটি করবে। ফলে, একই নেটওয়ার্কে থাকা বিভিন্ন ডিভাইস নিজেরাই নিজেদের মধ্য আন্তঃযোগাযোগ করতে পারবে।

আরো পড়ুন:  আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: যন্ত্রের মানুষ হবার শিক্ষা

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে বুদ্ধিমান যন্ত্র তৈরিতে মানুষের চেষ্টার কথা আমরা সবাই জানি। আইওটির গবেষণাও নতুন না তেমন। ডেল কারনেগি মেলন ইউনিভারসিটিতে ১৯৮০ সালে একটি কুকি মেশিন উদ্ভাবন করা হয়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সে মেশিন নিজেই কিছু সিধান্ত নিতে পারতো যেমন: যেমন মেশিনে পানীয় আছে কি না বা মেশিন ট্রিপ করবার প্রয়োজন কি না। এমআইটির ক্যাভিন এস্ট্রে প্রথম আইওটি শব্দটির প্রচলন করেন ১৯৯৯ সালে। ২০০৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে আইওটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি তাঁর ধারণা জানানোর পাশাপাশি এর বৃহৎ বাজার মূল্যের দিকে আলোকপাত করেন।

বিজনেস ইন্টেলিজেন্স ঐ সময়ের মধ্যে আইওটির সক্ষমতার জন্য হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, ম্যানেজমেন্ট, সারভিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের নতুন বাজার তৈরি করবে আইওটি। ২০১৯ সাল নাগাদ ৬৭০ কোটি যন্ত্র বাজারে আসতে পারে, যার মধ্যে হার্ডওয়্যার বিক্রির ফলে মুনাফা হবে মাত্র পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। হার্ডওয়্যার থেকে যে মুনাফা হবে তা আইওটি থেকে আসা মুনাফার মাত্র ৮-১০% হবে।

প্রযুক্তি বিশ্বে ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি

প্রযুক্তি বিশ্বে ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি

প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন কিছুর আগমন মানেই তার দোষগুন বিচারের পালা শুরু করা। আইওটির আশীর্বাদ হিসেবে বলা হচ্ছে,অনেক তথ্য যখন হাতেরনাগালে থাকবে,তখন সবচেয়ে ভালো সিধান্ত নেয়া সহজ হবে। আবার অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্টও হতে পারে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশান নিশ্চিত করা গেলে খরচ কমবে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে, পন্যের মান বাড়বে, কাজে গতিশীলতা আসবে। একই সাথে মানুষের যন্ত্রের উপর নির্ভরশীলতা তার সৃজনশীলতা, কর্মদক্ষতা যেমন নস্ট করবে, একইসাথে অনেকক্ষেত্রেই যন্ত্র মানুষের জায়গা দখল করবে। একই সাথে অনেকে যেমন কোন সুবিধা ভোগ করবে, তেমনি কোন কিছুর নিরাপত্তা বা গোপনীয়তায়ও মারাত্তকভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। যা দিনশেষে সব সাফল্যকেই ভন্ডুল করে দিতে পারে। যদি একক কোন নিয়ন্ত্রণকারী না থাকে, তবে গতিশীলতায়ও এর বিরূপ প্রভাব দেখা যেতে পারে।

তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা যেমন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না তেমনি এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়েই আসবে।

লেখক: Abid Reza

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *