টপ ৫: গুগলের ডিপমাইন্ড সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য

বর্তমান প্রযুক্তি বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। স্টিফেন হকিং থেকে শুরু করে ইলন মাস্কসহ বিশ্বের শীর্ষ বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এই প্রযুক্তি নিয়ে মানবজাতির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, বিল গেটস সহ অনেকেই মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জীবনকে সহজ করবে, এটি আমাদের বন্ধু হয়ে উঠবে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বনাম মানুষ যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে তা এখন বলা না গেলেও গুগলের ডিপমাইন্ড সম্পর্কে কিছু তথ্য জানলে এই প্রযুক্তি নিয়ে উত্তেজনার পাশাপাশি ভয়ও হয়। তবে চলুন গুগলের ডিপমাইন্ড সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য জানার আগে গুগলের ডিপমাইন্ড সম্পর্কে একটু জেনে নেই।

গুগল ডিপমাইন্ড কি?

ডিপমাইন্ড একটি গুগলের অধীনস্থ সংস্থা যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিপ রিইনফোর্সমেন্ট মেশিন লার্নিংয়ের বিকাশের দিকে মনোনিবেশ করে। সংস্থাটি ২০১০ সালে গঠিত হলেও ২০১৪ গুগল একে অধিগ্রহণ করে। ২০১৫ সালে ডিপমাইন্ডের আলফাগো এআই (AlphaGo AI) যখন গো (Go) খেলার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন লি সিডোল‘কে পরাজিত করে, তখন কোম্পানিটি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে বর্তমানে ডিপমাইন্ডের অগ্রগতি গো বোর্ড সীমানা ছাড়িয়ে আরো বহু দূরে এগিয়ে গেছে। ডিপমাইন্ডের ডিপ রিইনফোর্সমেন্ট মেশিন লার্নিং এর অ্যালগরিদমকে গবেষণাসহ বাস্তবিক অনেক কাজেই ব্যবহার করা হয়েছে। আপনি যদি গুগল হোম বা গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করে থাকেন তবে ইতিমধ্যেই আপনি গুগল ডিপমাইন্ডের সুফল ভোগ করছেন। তবে ডিপমাইন্ড সম্পর্কে নিচের তথ্যগুলো জানলে হয়ত আপনি আরো আশ্চর্যবোধ করবেন।

ডিপমাইন্ড সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য

ডিপমাইন্ড নিজেই নিজেকে হাঁটতে শিখিয়েছে

ডিপমাইন্ডের নিউরাল নেটওয়ার্ক এআইকে হাঁটতে দেখা সত্যিই অসাধারণ। এ কাজের জন্য এআইকে ইনপুট হিসেবে টর্ক-নিয়ন্ত্রিত একটি ভার্চুয়াল বডির জন্য বিভিন্ন প্যারামিটার দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল বডিতে জয়েন্ট সংখ্যা, অঙ্গগুলি কতটুকু স্বাধীন এবং ভার্চুয়াল পরিবেশ হাঁটার জন্য প্রয়োজনীয় বাধা (ফাকা স্থান, বেড়া ইত্যাদি)।

কীভাবে এই প্রতিবন্ধকতাগুলি কাটিয়ে উঠতে হবে তা শেখানো ছাড়াই, ডিপমাইন্ডের এআইকে কীভাবে চলাচল করতে হবে তা স্ক্র্যাচ থেকে শিখতে হত। আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, ডিপমাইন্ডের এআই এই সীমিত তথ্যের সাহায্যেই নিজেকে হাঁটতে শিখিয়েছে, তাও ২ পা, ৪ পা সহ বেশ কয়েকটি গঠনে। হাঁটাচলা এবং দৌড়াতে শিখার পাশাপাশি, এটি ঐ ভার্চুয়াল পরিবেশের প্রতিবন্ধকতাগুলি কিভাবে সফলভাবে মোকাবেলা করতে হয় তাও শিখে গেছে। যেমন-ফাঁকস্থানগুলি লাফিয়ে লাফিয়ে পার হওয়া।

ডিপমাইন্ড ছবি তৈরি করতে পারে

গুগলের ডিপমাইন্ড কর্তৃক তৈরি করা ছবি
গুগলের ডিপমাইন্ড কর্তৃক তৈরি করা ছবি

উপরের ছবিগুলো দেখতে সত্যিকারের মনে হলেও আসলে এগুলো ডিপমাইন্ডের তৈরি করা। ডিপমাইন্ড এগুলো নিজে থেকে তৈরি করেছে বলতে বুঝানো হয়েছে, এই ছবিগুলো ক্যামেরা দিয়ে তোলা হয়নি। ডিপমাইন্ড এগুলো একেবারে শুন্য (Zero) থেকেই তৈরি করেছে (ডিপমাইন্ডের কাল্পনিক ছবি)। কিন্তু কে বলবে যে, এগুলো মানুষের তোলা ছবি না? হ্যাঁ, এটাই ডিপমাইন্ডের আরেকটি চমৎকার ক্ষমতা।

ডিপমাইন্ডের এআইকে এই কাজটি শিখানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ইমেজনেট (ImageNet ) ডাটাসেট। আর অ্যালগরিদম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে জেনারেটিভ অ্যাডভার্সিয়াল নেটওয়ার্কস বা গ্যান (Generative Adversarial Networks বা GAN)। ছবি তৈরি করা ছাড়াও এটি বাস্তব কোন ছবি এবং তৈরি করা ছবিকে পার্থক্য করতে পারে।

ডিপমাইন্ড নিজেই নিজেকে ম্যাপ ছাড়া চলাচল করা শিখিয়েছে

ডিপমাইন্ড এআইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সাফল্যগুলির মধ্যে আরেকটি হল ম্যাপ ছাড়াই চলাচল করতে পারার দক্ষতা। এটি ম্যাপের পরিবর্তে অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। এটি একটি তুলনামূলকভাবে সহজ কাজ যা মানুষ সর্বদাই করে থাকে। তবে অন্তর্নিহিত যেই মানসিক প্রক্রিয়াগুলির কারনে আমরা এটি করতে পারি, তা খুব জটিল।

ডিপমাইন্ড এআইকে বড় বড় শহরগুলিতে নেভিগেট করতে হয়েছিল এবং ম্যাপ ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে হয়েছিল। ট্রেইন করার জন্য ডিপমাইন্ড এআই গুগল স্ট্রীট ভিউ ছবিগুলো ব্যবহার করে এবং সময়ের সাথে সাথে এটি কিভাবে ম্যাপ ছাড়া চলাচল করা যায় তা শিখে ফেলে।

ডিপমাইন্ড কিছু কিছু রোগ ডাক্তারদের চেয়েও ভাল সনাক্ত করতে পারে

যদিও এআই শীঘ্রই ডাক্তারদের প্রতিস্থাপন করতে যাচ্ছে না, তবুও এই প্রযুক্তি বিভিন্ন উপায়ে স্বাস্থ্যসেবাতে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। আর গুগলের ডিপমাইন্ডও চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবাক করার মতো কিছু কাজ করেছে।

লন্ডনের মুরফিল্ডস চক্ষু হাসপাতালের সাথে অংশীদারিত্বের পরে, ডিপমাইন্ডের এআই ৫০ টিরও বেশি চোখের রোগ সনাক্ত এবং সঠিকভাবে নির্ণয় করতে শিখেছে। হাজার হাজার স্ক্যান বিশ্লেষণ করে এটি এই কাজ করতে পেরেছে। চোখের রোগগুলোর মধ্যে আছে এর মধ্যে রয়েছে গ্লুকোমা, ম্যাকুলার অবক্ষয় এবং অন্যান্য রোগ যা দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

এছাড়া গুগল স্তন ক্যান্সারের স্ক্রিনিং প্রকল্পটি জাপানেও সম্প্রসারণ করেছে। গবেষকরা আশাবাদী ভবিষ্যতে এই এআই রোগীদের স্ক্যানগুলি বিশ্লেষণ করে ডাক্তারদের সময় বাঁচাতে পারবে। আর এরফলে রোগীরও উপকার হবে কেননা প্রাথমিক পর্যায়ে কোন রোগ চিহ্নিত করা গেলে রোগীর রোগ নির্মূল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে এবং চিকিৎসা খরচও কমে যাবে।

কৌশলগত চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষেত্রে ডিপমাইন্ড মানুষকেও হারাতে পারে

ডিপমাইন্ডের এই কাজটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানলে হয়তো আপনার টার্মিনেটরের স্কাইনেটের কথা মনে পরে যেতে পারে। কেননা ডিপমাইন্ড এআই কৌশলগত চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষেত্রে মানুষকেও হারাতে পারে। বিভিন্ন গেমে পারদর্শী হওয়ার পাশাপাশি এটি কিভাবে মানুষ বা অন্য বটের সাথে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হয় তা শিখে গেছে।

এই কাজটি করার জন্য ডিপমাইন্ডের গবেষকরা একে Quake III Arena নামে একটি গেমে ট্রেইন করান। আর সেজন্য একে কিভাবে এই গেমের কম্পিউটার জেনারেটেড পরিবশে দেখতে হয় এবং কোন কিছুতে রিঅ্যাকশন করতে হয় তা শিখতে হয়েছে। এমনকি এই কাজ শিখার সময় ডিপমাইন্ড এআই জানতোও না যে এই গেমটি কিভাবে খেলতে হয়। সবকিছু একেবারে স্ক্র্যাচ থেকে শিখতে হয়েছে। জয়লাভের জন্য কিভাবে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হয় এবং প্রতিযোগিতা করতে হয় তাও একে একাই শিখতে হয়েছে।

Quake III Arena খেলার সময় ডিপমাইন্ড এআইয়ের পারফর্মেন্স
Quake III Arena খেলার সময় ডিপমাইন্ড এআইয়ের পারফর্মেন্স

গবেষকরা এই এআইয়ের নাম দিয়েছিলেন “For The Win (FTW) agents“। পরে এই এআই ৪০ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে একটি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিল, যেখানে বাকিরা ছিল মানুষ। গবেষকরা এআইয়ের কর্মক্ষমতা কমাতে এর অ্যাকুরেসি এবং রিয়েকশন হ্রাস করেছিলেন। তা সত্ত্বেও, তারা জয়লাভের জন্য মানুষের মতো বিভিন্ন আচরণ করা শিখে গেছে, যেমন ঘাঁটি স্থাপন করা বা সতীর্থদের অনুসরণ করা।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

1 Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

29 Shares
Share via
Copy link
Powered by Social Snap