ভার্চুয়াল রিয়েলিটি: কল্পনাশক্তির ত্রিমাত্রিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবায়ন

বাস্তব নয়, কিন্তু কল্পনার কোন মুহূর্তকে কম্পিউটার মডেলিং আর সিমুলেশান কাজে লাগিয়ে এক ত্রিমাত্রিক আবহে, আমাদের স্নায়ুবিক অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে কল্প-বাস্তব দৃশ্য বা ঘটনার অবতারনাকেই আমরা বলছি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তি। অনেকটা আমাদের রাতে ঘুমের ঘোরে দেখা স্বপ্নের মত, তবে আধুনিক বিজ্ঞানের আশীর্বাদে এ যেন সে স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখা যাবে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা ভিআর

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

আজকের দিনে প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত এক অধ্যায়ের নাম ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ডিভাইস হেডসেট যে পদ্ধতিতে কাজ করে তা হল – এদের ডিসপ্লেটিকে দুই ভাগে ভাগ করে ব্যবহারকারীর দুই চোখে আলাদা ভাবে প্রবেশ করানো হয়। দুই ভাগে একই চিত্র দুই কোণায় থাকার কারণে বাস্তবে আমরা যেভাবে দেখে ঠিক একই ভাবে ঐ চিত্রটিকেও দেখতে পারি, একই সাথে ব্যাক্তির মাথার অবস্থান বা ঘূর্ণন অনুযায়ী পর্দার চিত্রপটও স্থান পরিবর্তন করে – সব মিলিয়ে ব্যবহারকারীর মনে হয় তিনি আসলেই পর্দার দৃশ্যের জগতে আছেন!

এই সাদামাটা প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে গুগোলও বের করেছে সাধারণ কার্ডবোর্ডে তৈরি চোখে পরার উপযোগী একটি ডিভাইস, তাও খুবই কম দামে। এতে যেকোন স্মার্টফোন ঢুকিয়ে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির স্বাদ নেয়া যাবে। কার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি হাল্কা এই ডিভাইসে আছে দু’টি বিশেষ লেন্স – যা চোখের সামনে বড়পর্দার অনুভূতি সৃষ্টি করে। দুটি গোল চুম্বক – যা মোবাইলের ম্যাগনেটিক সেন্সর কে ট্রিগার করে, কন্ট্রোলার হিসেবে কাজ করে।

সেন্সোরামা
সেন্সোরামা

আমেরিকান সিনেমাটোগ্রাফার ১৯৭০ এরদিকে মর্টন হিলিগ দর্শকদের জন্য এমন এক ধরনের সিনেমা প্রযুক্তির কথা চিন্তা করলেন যা তাদের সিনেমা দেখার অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দেবে, দর্শককে নিয়ে যাবে কাহিনীর আরও ভেতরে। নিজের ধারনাকে ১৯৫৭ সালে ‘সেন্সোরামা’ আবিষ্কাকারের মাধ্যমে বাস্তবে রুপ দেন তিনি। যন্ত্রটি একইসঙ্গে সর্বোচ্চ চারজন ব্যবহার করতে পারতো। থ্রিডি মোশনের সঙ্গে তিনি ঘ্রাণ, স্টেরিও সাউন্ড, সিটের অবস্থান আর বাতাসে চুল উড়ার মত ব্যাপারগুলোর বিন্যাস ঘটিয়েছিলেন। ফলে দর্শক পর্দার সাথে নিজেকে নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে পারতো অনুভবের মাধ্যমে। হিলিগের সেই অসাধারণ উদ্ভাবনের জন্য তাকে ‘ভার্চুয়াল রিয়েলিটি’ র জনক বলা হয়ে থাকে।

১৯৮০’র পরে মিলিটারিতে এর ব্যবহার শুরু হয়। ফলে দারুণভাবে কমে আসে প্রশিক্ষণ ব্যয় আর প্রশিক্ষণজনিত দুর্ঘটনা, ক্ষয়ক্ষতি। সময়ও কমে যায় দক্ষভাবে সৈন্যদের প্রশিক্ষিত করতে। নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীতে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এখন খুবই সাধারণ বিষয়। সেনাবাহিনীও কল্পিত যুদ্ধের মাধ্যমে নিজের কৌশল ঝালিয়ে নিচ্ছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি
চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

মাইক্রোসার্জারি,থোরাসিক আর ল্যাপ্রোস্কোপিক সার্জারিতে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বলা যায় এক আশীর্বাদের নাম। খুব অল্প সময়েই নবীন চিকিৎসকদের এর মাধ্যমে দক্ষভাবে প্রশিক্ষিতকরা যাচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ারিং বা এপ্লাইড সাইন্সের ব্যয়বহুল ল্যাবের খরচ কমিয়ে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে গভীরভাবে শিক্ষার্থীরা সমস্যার সমাধান করতে পারছে। বিশেষকরে পরিকল্পনা বা স্থ্যপাত্যে এর ব্যবহার বহুমুখী। ভূগোল কিংবা প্রানীবিদ্যার ক্লাসগুলোতেও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহারের কারনে ক্লাস হয়ে উঠছে জীবন্ত। এমনকি ইতিহাসের ক্লাসে ফিরে যাওয়া যাচ্ছে পুরাতন দিনের দৃশ্যে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি যেহেতু দৃশ্যের অবতারণা করে, তাই বলা যায় মুখস্তের দিন ফুরিয়েই গেল যেন শিক্ষাথীদের কাছ থেকে! কম্পিউটার গেমস বা চলচিত্রে এর ব্যবহার এতই বিস্তৃত যে, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ছাড়া এসব আর ভাবাই যায় না এখন।

বাস্তব জীবনে অধিকাংশ জিনিসেরই মত ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কিছু মন্দ দিকও এখন সামনে আসছে। যেসব ব্যক্তি এসব ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে নেতিবাচক পরিবেশের মাঝে সময় কাটাচ্ছেন বা বিনোদন খুঁজছেন, তাদের বাস্তব জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সাইবার এডিকশনের মাত্রা বাড়াচ্ছে। খুন, সহিংসতা, যৌনতা ইত্যাদি বিষয়গুলো আমাদের বাস্তব জগতে নানা আইনের বেড়াজালে বন্দী হলেও, কাল্পনিক জগতে এরা সহজলভ্য। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কাল্পনিক জগতে এসব পরিস্থিতিতে একজন মানুষ বাস্তব জীবনের মতোই স্নায়ুবিক ও শারীরিক অনুভূতির স্বাদ পান। ফলে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কি আসলে আমাদের মনুষ্যত্ববোধকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে কিনা, মনোবিদরা সেটিও ভেবে দেখতে বলেছেন প্রযুক্তিবিদদের।

কোন শঙ্কাই আজ পর্যন্ত নতুন প্রযুক্তিকে মানুষের হাতের মুঠোয় আসা থামাতে পারেনি। বুদ্ধিমান মানুষও ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আরও এগিয়ে যাবে, এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: Abid Reza

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 Shares
Share via
Copy link
Powered by Social Snap