উগান্ডা পরিচিতি: উগান্ডা সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য

উগান্ডা সম্পর্কে আমাদের বেশিরভাগেরই তেমন কোনো ধারনা নেই। দেশটিকে নিয়ে আমরা প্রায়ই বিভিন্ন মজা করে থাকি এবং একরকম তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেই দেখি এই দেশটাকে। কারন উগান্ডা বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। তবে আজকে চলুন আফ্রিকা মহাদেশের এই দেশটি সম্পর্কে জানা অজানা বিভিন্ন তথ্য জেনে নেই।

উগান্ডা পরিচিতি

উগান্ডার সরকারী নাম উগান্ডা প্রজাতন্ত্র (Republic of Uganda)। দেশটি পূর্ব-মধ্য আফ্রিকার একটি দেশ। দেশটি পূর্বে কেনিয়া, উত্তরে সুদান, পশ্চিমে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ-পশ্চিমে রুয়ান্ডা এবং দক্ষিণে তানজানিয়া দ্বারা বেষ্টিত। উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা এবং এটিই উগান্ডার সবচেয়ে বড় শহর। উগান্ডার মুদ্রার নাম হচ্ছে উগান্ডান সিলিং। বর্তমানে বাংলাদেশের ১ টাকা প্রায় ৪৪ উগান্ডান সিলিং এর সমান [জুন ২০২০]। দেশটির সরকারী ভাষা ইংরেজি এবং সোয়াহিলি।

উগান্ডার ইতিহাস

উগান্ডায় বসতি স্থাপন করেছিল আদিম শিকারী মানুষেরা যারা আনুমানিক ১৭০০ থেকে ২৩০০ বছর আগেও প্রাণী শিকার করতো। বান্টু ভাষাভাষীর এই জনগণ খুব সম্ভবত মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে দেশটির দক্ষিণাংশে অভিবাসী হয়ে এসে বসবাস শুরু করে। ১৪শ ও ১৫শ শতকে রাজত্ব বিস্তারকারী কিতারা সাম্রাজ্য এখানকার প্রাচীনতম রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় সংগঠন। এই সাম্রাজ্যের পর দেশটিতে উত্থান ঘটে বুনিইওরো-কিতারা, বুগান্ডা, তোরো, আনকোলে এবং বুসোগা সম্রাজ্যের। পরবর্তী শতকগুলোতেও এভাবেই ক্ষমতার পালাবদল অব্যাহত ছিল।

১৮৩০ এর দশকে আরব ব্যবসায়ীরা পূর্ব আফ্রিকার ভারত মহাসাগর উপকূল থেকে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৬০ এর দশকে নীল নদের উৎস অনুসন্ধান করে উগান্ডায় আগমন ঘটে ব্রিটিশদের। এরপর উগান্ডা ১৯৬২ সালের ৯ই অক্টোবর যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। সেসময় যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধান এবং উগান্ডার রানী ছিলেন কুইন দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ১৯৬৩ সালের অক্টোবরে উগান্ডা একটি প্রজাতন্ত্র হয় তবে কমনওয়েলথ অফ নেশনস-এ তাদের সদস্যপদ বজায় রেখেছিল।

উগান্ডার স্বৈরশাসক ইদি আমিন (গাড়ি চালক)
উগান্ডার স্বৈরশাসক ইদি আমিন (গাড়ি চালক)

১৯৭০ এর দশকে উগান্ডার স্বৈরশাসক ছিলেন ইদি আমিন। ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে যখন তানজানিয়ার সঙ্গে উগান্ডার লড়াইয়ের এক পর্যায়ে তানজানিয়ার সৈন্যরা উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় প্রবেশ করে, তখন পতন ঘটেছিল ইদি আমিনের।

উগান্ডার আয়তন ও ভৌগলিক অবস্থা

উগান্ডার মানচিত্র

উগান্ডার আয়তন ২,৪১,০৩৮ বর্গকিলোমিটার (৯৩,০৬৫ বর্গমাইল)। ফলে আয়তনের দিক দিয়ে দেশটি বিশ্বে ৭৯তম বৃহত্তম দেশ। আর এর আয়তনের প্রায় ১৫.৩৯% পানি। আর হবে না কেন? এডওয়ার্ড লেক, আলবার্ট লেক এবং ভিক্টোরিয়া লেক নামের বেশ কয়েকটি বৃহদাকার লেক দেশটিকে ঘিরে রেখেছে। যারমধ্যে দেশের দক্ষিণের বেশিরভাগ অংশই দখল করেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম লেক, ভিক্টোরিয়া লেক। লেকের আশেপাশে বেশকিছু দ্বীপ রয়েছে। এছাড়া রাজধানী কাম্পালা এবং পার্শ্ববর্তী শহর এন্টেব সহ এই লেকের নিকটে বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ শহর অবস্থিত।

তবে উগান্ডার আয়তনের প্রায় ৬০% ই সংরক্ষিত। এসব সংরক্ষিত জায়গার মধ্যে রয়েছে বিউইন্ডি ইমপেনট্রেবেল ন্যাশনাল পার্ক, রিউঞ্জরি মাউন্টেইন ন্যাশনাল পার্ক (দুটিই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত), কুইন এলিজাবেথ ন্যাশনাল পার্ক, মুরচিসন ফলস ন্যাশনাল পার্ক, কিবালে ফরেস্ট ন্যাশনাল পার্ক, কিদেপো ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কসহ বিভিন্ন পার্ক।

উত্তর-পূর্ব উগান্ডার জলবায়ু অর্ধ-ঊষর বা কিছুটা অনুর্বর প্রকৃতির; এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বার্ষিক ২০ ইঞ্চি বা ৫০০ মিমি.-র চেয়ে কম। অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম উগান্ডাতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৩০০ মিমি.-র বেশি। ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি এবং জুন-জুলাই মাসে দুইটি শুষ্ক মৌসুম দেখা যায়। উগান্ডা বিষুবরেখার উপর অবস্থিত হলেও উচ্চতার কারণে এখানকার জলবায়ু তুলনামূলকভাবে মৃদু। দেশটির বেশিরভাগ এলাকা মালভূমির উপর অবস্থিত। [উইকিপেডিয়া]

উগান্ডার রাজনীতি

উগান্ডার রাষ্ট্রপতি ইওয়ারি মুসাভেনি
ইওয়ারি মুসাভেনি

উগান্ডার রাষ্ট্রপতি একাই রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারপ্রধান উভয় দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি তাকে প্রশাসনে সহায়তার জন্য একজন সহ-রাষ্ট্রপতি এবং একজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। বর্তমানে উগান্ডার রাষ্ট্রপতি ইওয়ারি মুসাভেনি (Yoweri Museveni)। ১৯৮৬ সালের ২৯ শে জানুয়ারী থেকে তিনি উগান্ডার রাষ্ট্রপতি পদে আছেন। এরফলে তিনিই হলেন দেশেটির সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রপতি, এবং ইদি আমিনের পর দেশের দ্বিতীয় একনায়ক।

ন্যাশনাল পার্লামেন্ট গঠিত হয় ৪৪৯ জন সদস্য নিয়ে। যারমধ্যে ২৯০ জন নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি, ১১৬ জন জেলা মহিলা প্রতিনিধি, ১০ জন উগান্ডার গণ প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিনিধি, যুবকদের প্রতিনিধি ৫ জন, শ্রমিকদের প্রতিনিধি ৫ জন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ৫ জন প্রতিনিধি এবং ১৮ জন প্রাক্তন সরকারী সদস্য।

উগান্ডার অর্থনীতি

উগান্ডার অর্থনীতি

উগান্ডার অর্থনীতি মূলত কৃষিকাজ নির্ভর, এবং শ্রমজীবী ​​জনসংখ্যার প্রায় ৮০%ই কৃষিকাজ করে জীবন ধারন করছে। উগান্ডার সহনীয় মাত্রার আবহাওয়া প্রাণিসম্পদ এবং ফসল উভয়ই উৎপাদনের জন্য উপযোগী। ২০১৫ সালে উগান্ডা বেশকিছু পণ্যদ্রব্য রপ্তানি করে, যারমধ্যে আছে কফি ($৪০২.৬৩ মিলিয়ন), তেল ($১৩১.২৫ মিলিয়ন), মাছ ($১১৭.৫৬ মিলিয়ন), ভুট্টা ($৯০.৯৭ মিলিয়ন), সিমেন্ট ($৮০.১৩ মিলিয়ন), তামাক ($৭৩.১৩ মিলিয়ন), চা ($৬৯.৯৪ মিলিয়ন), চিনি ($৬৬.৪৩ মিলিয়ন), ফুল ($৫১.৪৪ মিলিয়ন) ইত্যাদি।

উগান্ডা বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। ২০১২ সালে জনসংখ্যার ৩৭.৮ শতাংশ প্রতিদিন ১.২৫ ডলারেরও নিচে বাস করত। ১৯৯৯ সালে দেশব্যাপী দারিদ্র্যের পরিমাণ ৫৬ শতাংশ থেকে ২০০৯ সালে ২৪.৫ শতাংশে হ্রাস পায়। তবে ব্যাপক অগ্রগতি সত্ত্বেও, দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে দারিদ্র্যতা এখনো রয়ে গেছ। আর গ্রামীণ অঞ্চলই উগান্ডার ৮৮ শতাংশ মানুষের আবাসস্থল।

উগান্ডার মানুষ ও সংস্কৃতি

উগান্ডার জনসংখ্যা ১৯৬৯ সালের ৯৫ লাখ থেকে বেড়ে ২০১৪ সালে এসে দাড়ায় প্রায় সাড়ে ৩ কোটিতে। বর্তমানে উগান্ডার জনসংখ্যা প্রায় ৪.২৭ কোটি [২০১৮, আনুমানিক] এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৫৭.১ জন। তবে এই জনসংখ্যার অধিকাংশই নাবালক কেননা উগান্ডার মেডিয়ান বয়স মাত্র ১৫ বছর যা বিশ্বের সকল দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম।

উগান্ডার জনসংখ্যার অধিকাংশই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। যার মধ্যে ৩৯.৩ শতাংশ রোমান ক্যাথলিক চার্চের অনুগামী এবং ৩২ শতাংশ উগান্ডার অ্যাংলিকান চার্চের অনুগামী। উগান্ডার পরবর্তী সর্বাধিক প্রচারিত ধর্ম হল ইসলাম যা জনসংখ্যার ১৩.৭ শতাংশ [উইকিপেডিয়া]। আর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিন্দু এবং সিখ ধর্মাবলম্বী। প্রচুর সংখ্যক সম্প্রদায়ের কারণে উগান্ডার সংস্কৃতি খুবই বৈচিত্র্যময়। উগান্ডার রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক ও শিল্পকলাসমৃদ্ধ এক সংস্কৃতি। উন্নয়নশীল এই দরিদ্র রাষ্ট্রটি মূলত কৃষিপ্রধান। উগান্ডায় পুরুষদের জাতীয় পোশাক হল কানজু। মধ্য ও পূর্ব উগান্ডার মহিলারা গোমেসি নামে পরিচিত একটি পোশাক পরেন।

উগান্ডার জাতীয় পোশাক কানজু এবং গোমেসি

উগান্ডার জাতীয় খেলা ফুটবল। যদিও তারা কখনো বিশ্বকাপ ফুটবল খেলেনি, ১৯৭৮ সালে আফ্রিকান নেশন্স কাপে দ্বিতীয় হওয়াই তাদের সেরা সাফল্য। আর ক্রিকেট খেলায় তারা পূর্ব আফ্রিকা ক্রিকেট দলের হয়ে ১৯৭৫ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলে। তবে দেশটি অলিম্পিকে পদকজয়ী। ২০১৬ অলিম্পিক পর্যন্ত, উগান্ডা মোট দুটি স্বর্ণ, তিনটি রৌপ্য এবং দুটি ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে; যার মধ্যে চারটি বক্সিং এবং তিনটি অ্যাথলেটিকসে ছিল।

উগান্ডার দর্শনীয় স্থান

উগান্ডার বিউইন্ডি ইমপেনট্রেবেল ন্যাশনাল পার্কের বন্য গরিলা

উগান্ডা আফ্রিকার অন্যতম সুন্দর একটি দেশ। ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন অরণ্য, তুষার-উঁচু পর্বত, কাঁচের হ্রদ এবং বিস্তৃত সভানার ফলে উইনস্টন চার্চিল এই বিস্ময়কর দেশটিকে ‘আফ্রিকার মুক্তো (Pearl of Africa)’ বলে অভিহিত করেন। উগান্ডায় বেশিরভাগ দর্শনার্থীই আসে বৃহদাকার বন্য গরিলা দেখার জন্য। এছাড়া উগান্ডার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হল বিউইন্ডি ইমপেনট্রেবেল ন্যাশনাল পার্ক (Bwindi Impenetrable Forests National Park), ভিক্টোরিয়া লেক, ইদি আমিনের প্রাসাদ, রিউঞ্জরি মাউন্টেইন ন্যাশনাল পার্ক, কুইন এলিজাবেথ ন্যাশনাল পার্ক, মুরচিসন ফলস ন্যাশনাল পার্ক, কিবালে ফরেস্ট ন্যাশনাল পার্ক, কিদেপো ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক, রাজধানী কাম্পালা ইত্যাদি।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 Shares
Share via
Copy link