ঘানা পরিচিতি: ঘানা সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য

আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে ঘানা অন্যতম সম্ভাবনাময় এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী একটি দেশ। আর বাংলাদেশীদের কাছেও দেশটি আফ্রিকার অন্যান্য দেশের মত একেবারে অপরিচিত নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা ঘানার ফুটবলারদের কারনে দেশটি অনেকের কাছেই পরিচিত নাম। তাছাড়া ঘানার সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও ভালো। তবে নামটি পরিচিত হলেও ঘানা সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। জানিনা ঘানার ইতিহাস, আয়তন কিংবা তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে। তাই চলুন আজকে আফ্রিকা মহাদেশের দেশ ঘানা সম্পর্কে জানা অজানা বিভিন্ন তথ্য জেনে নেই।

ঘানা পরিচিতি

ঘানার সরকারী নাম ঘানা প্রজাতন্ত্র (Republic of Ghana)। দেশটি পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশ। ঘানার পশ্চিমে আইভরি কোস্ট, উত্তরে বুরুকিনা ফাসো, পূর্বে টোগো এবং দক্ষিণে গিনি উপসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগর রয়েছে। সোনিনকে ভাষায় ঘানার অর্থ “ওয়ারিয়র কিং (Warrior King)”। ঘানার রাজধানীর নাম আক্রা (Accra) এবং এটিই ঘানার সবচেয়ে বড় শহর। দেশটির মুদ্রার নাম ঘানাইয়ান সেডি। ঘানাইয়ান সেডির মুল্যমান বাংলাদেশী টাকার চাইতে বেশি। বর্তমানে ১ ঘানাইয়ান সেডি সমান বাংলাদেশের প্রায় ১৪.৫ টাকা [জুন ২০২০]। দেশটির সরকারী ভাষা ইংরেজি। তবে ঘানায় আশান্তে, আকান, মোরে, এওয়ে, গা, হাউসাসহ আরো বেশকিছু ভাষা ব্যবহৃত হয়।

ঘানার ইতিহাস

মধ্যযুগের মধ্যেই ঘানার দক্ষিণ ও মধ্য অঞ্চলে বেশকিছু প্রাচীন আকান সাম্রাজ্যের লোক বাস করত। এসব সাম্রাজ্যের মধ্যে রয়েছে আশান্তি সাম্রাজ্য, আকওয়ামু সাম্রাজ্য, বনোমান সাম্রাজ্য, ডেনকিরা সাম্রাজ্য এবং মানকেসিম সাম্রাজ্য। আর নবম শতাব্দীর মধ্যেই ঘানা সাহারা অঞ্চলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য হিসাবে পরিচিতি পায়। সে সময় বর্তমান ঘানা অঞ্চলে বহু গোষ্ঠীর চলাচল থাকলেও, ৫ম শতাব্দীর মধেই আকানরা দৃঢ়ভাবে বসতি স্থাপন করে।

১৫ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের সাথে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয়দের সাথে আকানদের বাণিজ্য শুরু হয়েছিল। পর্তুগীজরা ঘানায় গোল্ড কোস্ট অঞ্চলে আসে স্বর্ণের ব্যবসা করতে এবং স্থাপন করে পর্তুগীজ গোল্ড কোস্ট। পরবর্তীতে সুইডেন, নরওয়, ডেনমার্ক এবং ১৮৭৪ সালে ইংরেজরা স্বর্ণের ব্যবসা করার জন্য তাদের নিজ নিজ গোল্ড কোস্ট স্থাপন করে। তবে তখন থেকেই ইউরোপীয়রা স্বর্ণের ব্যবসা করার পাশাপাশি দাস ব্যবসাও করতে থাকে।

১ম-অ্যাংলো-আশান্তি-যুদ্ধ
১ম অ্যাংলো আশান্তি যুদ্ধ

ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির স্থাথে আকান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্টেটের মধ্যে বিভিন্ন যুদ্ধ চলতে থাকে। এবং পরে ১০০ বছর দীর্ঘ অ্যাংলো-আশান্তি যুদ্ধে কয়েকবার ব্রিটিশদের পরাজিত করলেও ১৯ শতকের গোঁড়ার দিকে শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন স্টুল যুদ্ধে হেরে যায়।

১৯৫৭ সালের ৬ই মার্চ, সকাল ১২ টায়, গোল্ড কোস্ট অঞ্চল, আশান্তি অঞ্চল, উত্তরাঞ্চলীয় কিছু অঞ্চল এবং ব্রিটিশ টোগোল্যান্ড ঘানা নামে একটি একক স্বাধীন দেশ হিসাবে একীভূত হয়। এটি করা হয়েছিল ১৯৫৭ সালের ঘানা স্বাধীনতা আইনের অধীনে। এরপর ১৯৬০ সালের ১ জুলাই, ঘানার সাংবিধানিক গণভোট এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরে, ঘানার প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসাবে নক্রমাহ ঘানাকে প্রজাতন্ত্র হিসাবে ঘোষণা করেন। আর তাই ৬ মার্চ দেশটির স্বাধীনতা দিবস এবং ১ জুলাই প্রজাতন্ত্র দিবস হিসাবে পালিত হয়। [সূত্র: উইকিপিডিয়া]

ঘানার আয়তন ও ভৌগলিক অবস্থা

ঘানার আয়তন ২,৩৯,৫৬৭ বর্গকিলোমিটার (৯২,৪৯৭ বর্গমাইল)। ফলে আয়তনের দিক দিয়ে দেশটি বিশ্বে ৮০তম বৃহত্তম দেশ। আর দেশটির আয়তনের প্রায় ৪.৬১% পানি।

ঘানার অবস্থান নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে কয়েক ডিগ্রি উত্তরে গিনি উপসাগরে। তাই এটি একটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় উষ্ণ জলবায়ুর দেশ। ঘানার দুটি প্রধান ঋতু রয়েছে: বর্ষা মৌসুম এবং শুষ্ক মৌসুম। ঘানার দক্ষিণ উপকূলীয় ঝোপঝাড় এবং বনভূমিতে মিশ্র ঘাসভূমি (Grasslands) দিয়ে ঘেরা। দক্ষিণাংশ ছাড়াও এ ঘাসভূমি ঘানার বেশ খানিকটা অংশজুড়ে রয়েছে। এছাড়া ঘানাকে ঘিরে আছে বিভিন্ন সমভূমি, জলপ্রপাত, নীচু পাহাড়, নদী, কৃত্রিম হ্রদ এবং দ্বীপ। ঘানার উত্তরতম অংশটি হচ্ছে পুলমাকং এবং ঘানার দক্ষিণতম অংশটি হল কেপ থ্রি পয়েন্ট।

ঘানার রাজনীতি

ঘানার একটি সংসদীয় বহুদলীয় সিস্টেম সহ একক রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক গণতন্ত্রের দেশ। ১৯৯২ সাল অবধি ঘানায় সিভিল ও সামরিক সরকারের বেশ কয়েকবার পরিবর্তন হয়েছিল। কিন্তু সামরিক শাসনের অবসানের পর ১৯৯২ সাল থেকে ঘানায় বহুদলীয় গণতন্ত্র রয়েছে। ১৯৯২ সালের সংবিধানে ঘানা সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি (ঘানার রাষ্ট্রপতি), সংসদ (ঘানার সংসদ), মন্ত্রিপরিষদ (ঘানার মন্ত্রিপরিষদ), কাউন্সিল অফ স্টেট (ঘানায়ান কাউন্সিল অফ স্টেট) এবং একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ (ঘানার বিচার বিভাগ) এর মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেয়।

জন মহামা এবং নানা আকুফো-এদো
জন মহামা এবং নানা আকুফো-এদো

দেশটির সরকার প্রতি চার বছর পর সর্বজনীন ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ঘানার সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জন মহামা (John Mahama) কে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি পদ লাভ করেন নানা আকুফো-এদো (Nana Akufo-Addo)। নানা আকুফো-এদো ২০১৭ সালের ৭ জানুয়ারী রাষ্ট্রপতির শপথ বাক্য পাঠ করেন।

ঘানার অর্থনীতি

ঘানার অর্থনীতির ভিত্তি খুবই বিচিত্র (Diverse) এবং সমৃদ্ধ। যারমধ্যে আছে ডিজিটাল প্রযুক্তি সামগ্রীর উত্পাদন ও রপ্তানি, অটোমোটিভ এবং জাহাজ নির্মাণ ও রপ্তানি এবং হাইড্রোকার্বন এবং শিল্প খনিজগুলির মতো নানাবিধ এবং সমৃদ্ধ সম্পদ। ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঘানার ৫৩.৩% কর্মীই কৃষিকাজে যুক্ত ছিলেন। ঘানা আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদনকারী (দক্ষিণ আফ্রিকার পরে) এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম কোকো পাউডার উৎপাদক। এছাড়া দেশটি হীরা, ম্যাঙ্গানিজ আকরিক, বক্সাইট এবং তেল সমৃদ্ধ।

ঘানার মাথাপিছু জিডিপি পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে সর্বোচ্চ জিডিপি পুনর্বাসনের কারণে ২০১১ সালে ঘানার অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়। দেশটির একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে যা “ঘানা ভিশন ২০২০ (Ghana Vision 2020)” নামে পরিচিত। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ঘানাকে আফ্রিকার ১ম দেশ হিসাবে ২০২০ সাল থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে উন্নত দেশে এবং ২০৩০ সাল থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে একটি নতুন শিল্পায়িত দেশ হিসাবে পরিনত করা।

ঘানার মানুষ ও সংস্কৃতি

ঘানার ট্রেডিশনাল কাপড় পরিহিত জাতিগোষ্ঠী
ঘানার ট্রেডিশনাল কাপড় পরিহিত জাতিগোষ্ঠী

২০১৯ সালের ২২ জুন পর্যন্ত, ঘানার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। সাম্প্রতিক ঘানা কার্ডধারী দক্ষ কর্মী অভিবাসনের আইনের কারণে, ঘানায় চীন, মালয়েশিয়া, ভারত, মধ্য প্রাচ্য এবং ইউরোপীয় দেশের অল্পকিছু নাগরিক রয়েছে। ঘানার জনসংখ্যার অধিকাংশই খ্রিস্ট ধর্মালম্বী, এর বাইরে একটি বিশাল সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীও রয়েছে। এছাড়া প্রচলিত (আদিবাসী) বিশ্বাসও চর্চা হয় ঘানায়। ২০১০ সালের আদমশুমারি মতে ঘানার ৭১.২% নাগরিক খ্রিস্টান। এরপরে আছে ইসলাম (১৭.৬%), প্রচলিত (আদিবাসী) বিশ্বাস (৫.২%)।

ঘানার সংস্কৃতি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অনুশীলন এবং বিশ্বাসের বিচিত্র মিশ্রণ। ২০১০ সালের আদমশুমারিতে মতে ঘানার বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী হ’ল আকান (৪৭.৩%), মোল-ডাগবানী (১৬.৬%), ইও (১৩.৯%), গা-ডাংমে (৭.৪%), গুরমা (৫.৭%) এবং গুয়ান (৩.৭%)। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, ঘানার বাসিন্দারা আদিনক্রা (Adinkra) নামে মুদ্রণের অনন্য একটি শিল্প বিকাশ করে। তৎকালীন ঘানার উচ্চপদের ব্যাক্তিরা বিভিন্ন ভক্তিমূলক অনুষ্ঠানে হ্যান্ড-প্রিন্টেড এবং হ্যান্ড-এমব্রয়ডার্ড আদিনক্রা কাপড় ব্যবহার করতো।

আদিনক্রা (Adinkra) মুদ্রণ
আদিনক্রা (Adinkra) মুদ্রণ

ঘানা ফুটবল দল ৪ বার আফ্রিকান কাপ অব ন্যাশন্স জিতেছে, একবার ফিফা অ-২০ বিশ্বকাপ জিতেছে এবং ২০০৬, ২০১০, এবং ২০১৪ সালে পরপর টানা তিনটি ফিফা বিশ্বকাপে অংশগ্রহন করেছে। ২০১০ ফিফা বিশ্বকাপে, ৩য় আফ্রিকান দেশ হিসেবে ঘানা ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল পৌছায়। ঘানা গ্রীষ্ম অলিম্পিকে মোট ৪টি অলিম্পিক পদক জিতে, বক্সিংয়ে ৩টি, এবং অ্যাসোসিয়েট ফুটবলে একটি।

ঘানার দর্শনীয় স্থান

ঘানার অন্যতম দর্শনীয় স্থান কেপ কোস্ট ক্যাসেল
ঘানার অন্যতম দর্শনীয় স্থান কেপ কোস্ট ক্যাসেল

উপকূলীয় দেশ হওয়ায় ঘানা আফ্রিকার অন্যতম পর্যটক আকর্ষণকারী দেশ। ঘানার দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে অন্যতম হল রাজধানী আক্রা, কেপ কোস্ট ক্যাসেল (দাস প্রথাকে ধিক্কার জানানোর জন্য নির্মিত মিউজিয়াম), এমবার্ক সাফারি, কক্রোবাইট সমুদ্র সৈকত, কাকুম ন্যাশনাল পার্ক, ফোর্ট সেন্ট জাগো, সেন্ট জর্জেস ক্যাসেল, বুসুয়া সমুদ্র সৈকত, লারাবাঙ্গা মসজিদ (ঘানার সবচেয়ে পুরাতন মসজিদ), মোল ন্যাশনাল পার্ক, বটি ফলস, লেক ভোল্টা, আবুরি বোটানিক্যাল গার্ডেন, এলমিনো ক্যাসেল ইত্যাদি।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 Shares
Share via
Copy link
Powered by Social Snap