চীন পরিচিতি: চীন সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হল চীন। অর্থনীতি, তথ্য-প্রযুক্তি, সামরিক, মানব-সম্পদ, শিক্ষাসহ সব দিক দিয়েই চীন বিশ্বে দাপট দেখাচ্ছে। বাংলাদেশীদের কাছেও চীন অনেকটা পরিচিত দেশ। চীনা বিভিন্ন পণ্য কিছুটা কম দামে পাওয়া যাওয়ায় বাংলাদেশীদের কাছে চীনা পণ্যের ভালো চাহিদা রয়েছে। আর তাছাড়া বাংলাদেশের সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও ভালো। চলুন আজকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য জেনে নেই।

চীন পরিচিতি

চীনের সরকারী নাম গণপ্রজাতন্ত্রী চীন যা সংক্ষেপে চায়না বা চীন (China)। দেশটি পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ। দেশটি ২২টি প্রদেশ, পাঁচটি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল, চারটি কেন্দ্রশাসিত পৌরসভা (বেইজিং, থিয়েনচিন, সাংহাই এবং ছুংছিং), এবং দুইটি প্রায়-স্বায়ত্বশাসিত বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল (হংকং এবং মাকাউ) নিয়ে গঠিত। এর বাইরে চীন তাইওয়ানের ওপরেও সার্বভৌমত্ব দাবী করে আসছে। চীনের রাজধানী হল বেইজিং এবং সবচেয়ে বড় শহর সাংহাই। চীনের মুদ্রার নাম রেন্মিন্বি। বর্তমানে চীনের এক রেন্মিন্বি সমান বাংলাদেশের প্রায় ১২ টাকা [জুলাই, ২০২০]। চীনের সরকারী ভাষা হল ম্যান্ডারিন। এছাড়া উ, ইউয়ে, মিন, সিয়াং, গান, এবং হাক্কা ভাষাও চীনে ব্যবহৃত হয়।

চীনের ইতিহাস

চীনের ইতিহাস
চীনের ইতিহাস

হাজার হাজার বছর ধরে হোয়াংহো নদী ও ইয়াংজি নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠেছে চীনের অনেক আঞ্চলিক সংস্কৃতি যা চীনের সভ্যতাকে বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছে। ফলে হোয়াংহো নদীকে চৈনিক সভ্যতার সুতিকাগার বলা হয়। কয়েক হাজার বছরের ধারাবাহিক ইতিহাসের ফলে গঠিত এই চৈনিক সভ্যতা পৃথিবীর আদিমতম সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই কারণে চৈনিক সভ্যতাকে মানব সভ্যতার অন্যতম সুতিকাগারও বলা হয়।

চীনা ঐতিহ্য অনুসারে, চীনের প্রথম রাজবংশটি ছিল শিয়া (Xia), যা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ এর দিকে আবির্ভূত হয়। তবে প্রথম লিখিত ও গ্রহণযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায় শাং (Shang) সাম্রাজ্যের (১৬০০ থেকে ১০৪৬ খ্রিস্টপূর্ব)। শাংদের পরাজিত করে ঝউ রাজবংশ। ঝউ রাজবংশীরা খ্রিস্টপূর্ব ১১ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী পর্যন্ত চীনে রাজত্ব করে। এই শাসনামলে চীনের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও দর্শনের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়।

এরপর আরো অনেক সাম্রাজ্যের অধীনে থাকে চীন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ছিন সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ২২১ থেকে ২০৬ অব্দ), সিন সাম্রাজ্য, জিন সাম্রাজ্য (২৬৫ থেকে ৪২০ খ্রিস্টাব্দ), সুই সাম্রাজ্য (৫৮৯ থেকে ৬১৮ খ্রিস্টাব্দ), তাং সাম্রাজ্য (৬১৮ থেকে ৯০৭ খ্রিস্টাব্দ), সং – লিয়াও – ঝিন এবং পশ্চিম সিয়া সাম্রাজ্য (৯৬০ থেকে ১২৩৪ খ্রিস্টাব্দ), ইউয়ান সাম্রাজ্য (১২৭১ থেকে ১৩৬৮ খ্রিস্টাব্দ), মিং সাম্রাজ্য (১৩৬৮ থেকে ১৬৪৪ খ্রীস্টাব্দ), কিং সাম্রাজ্য (১৬৪৪ থেকে ১৯১১)। চীনের সর্বশেষ সাম্রাজ্য ছিল এই কিং সাম্রাজ্য, যার উচ্ছেদের পর ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিপাবলিক অব চায়না, এবং ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় গনপ্রজাতন্ত্রী চীন।

চীনের আয়তন ও ভৌগলিক অবস্থা

চীনের আয়তন প্রায় ৯,৫৯৬,৯৬১ বর্গ কিমি. বা ৩,৭০৫,৪০৭ বর্গ মাইল। এই বিশাল আয়তনের ফলে আয়তনের দিক দিয়ে চীন বিশ্বের ৩য়/৪র্থ বৃহত্তম দেশ এবং এশিয়ার বৃহত্তম দেশ। দেশটির মোট আয়তনের প্রায় ২.৮% পানি। চীনের স্থলসীমার দৈর্ঘ্য প্রায় ২২,৮০০ কিমি.।

চীনের মানচিত্র
চীনের মানচিত্র

দেশটির সাথে ১৪টি দেশের স্থল সীমান্ত রয়েছে। যারমধ্যে চীনের পূর্ব দিকে উত্তর কোরিয়া, উত্তর দিকে মঙ্গোলিয়া, উত্তর -পূর্ব দিকে রাশিয়া, উত্তর-পশ্চিম দিকে কাজাকিস্তান, কিরগিজস্তান, ও তাজিকিস্তান, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ও ভুটান, দক্ষিণ দিকে মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনাম। এর বাইরে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে চীনের সমুদ্র সীমানা রয়েছে। দেশটির ভূপ্রকৃতি বিচিত্র। এখানে আছে বিস্তীর্ণ মরুভূমি, সুউচ্চ পর্বত ও মালভূমি, এবং প্রশস্ত সমভূমি।

চীনের রাজনীতি

গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের রাজনীতি একটি একদলীয় সমাজতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক কাঠামোয় সংঘটিত হয় যেখানে রাষ্ট্রপতি হন রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রিমিয়ার (এক্সিকিউটিভ ইউয়ান রাষ্ট্রপতি) হন সরকার প্রধান। রাষ্ট্রপতি ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস দ্বারা নির্বাচিত হন। আর প্রিমিয়ার হলেন সরকার প্রধান, জিনি চারজন ভাইস প্রিমিয়ার এবং মন্ত্রনালয় ও কমিশন প্রধানদের সমন্বয়ে গঠিত স্টেট কাউন্সিলের সভাপতিত্ব করেন।

শি জিনপিং
শি জিনপিং

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (Communist Party of China) দেশটির রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। ১৯৮০-র দশকের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর থেকে চীনে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাব হ্রাস পেয়েছে এবং স্থানীয় সরকারের নেতাদের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে চীনের রাষ্ট্রপতি হলেন শি জিনপিং (Xi Jinping), যিনি চীন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক (General Secretary) এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিমিয়ার হলেন লি কেকিয়াং (Li Keqiang)। [সূত্র: উইকিপেডিয়া]

চীনের অর্থনীতি

চীনের অর্থনীতি
চীনের অর্থনীতি

জিডিপির দিক দিয়ে আমেরিকার পরে চীনের অর্থনীতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। তবে এবং ক্রয়ক্ষমতার (পিপিপি) দিক দিয়ে চীনের অর্থনীতি বিশ্বে প্রথম। বর্তমানে চীনের জিডিপি $১৪.১৪০ ট্রিলিয়ন (নমিয়াল; ২০১৯) এবং $২৭.৩০৭ ট্রিলিয়ন (পিপিপি; ২০১৯)। দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক এবং দ্বিতীয় আমদানিকারক দেশ। বিগত ৩০ বছর ধরে চীন উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। চীনের মধ্যাঞ্চলের চেয়ে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে বেশি শিল্পায়ন হতে দেখা যায়।

চীনা অর্থনীতির প্রধান শিল্প গুলো হল শিল্পৎপাদিত পণ্য, লোহা, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং অন্যান্য খনিজ, মোটর গাড়ি, রাসায়নিক উপাদান ও পণ্য, টয়লেট্রিজ, খেলনা, প্লাস্টিকজাত দ্রব্য, কার্পাস, যন্ত্রপাতি, উৎপাদন উপকরণ, ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রি, যাহাজ, ভারি যন্ত্রপাতি, কৃষি উপকরন ইত্যাদি। তবে বর্তমানে চীনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হল তথ্য প্রযুক্তি। এই ক্ষেত্রটিতে চীন বর্তমানে আমেরিকার সবচেয়ে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী।

চীনের মানুষ ও সংস্কৃতি

চীনের মানুষ ও সংস্কৃতি
চীনের মানুষ ও সংস্কৃতি

চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি। যারফলে বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠী চীনেই বাস করে এবং জনসংখ্যার দিক দিয়ে দেশটি বিশ্বে ১ম। চীনের জনসংখ্যার ঘনত্ব ১৪৫ জন প্রতি বর্গ কিমি.। ২০১৪ সালের জরীপ অনুসারে চীনের প্রায় ৭৪% জনসংখ্যার কোন ধর্ম নেই বা আঞ্চলিক ধর্মাবলম্বী। এর বাইরে অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রায় ১৫.৮৭%, খ্রিষ্টান ধর্মের প্রায় ২.৫৩%, ইসলাম ধর্মের প্রায় ০.৫%।

চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শুধু যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে তা-ই নয়, এর বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন সময় অন্য সংস্কৃতির মানুষ মহান মেনে নিয়ে একাত্ম হতে চেয়েছে। কেননা দেশটি সঙ্গীত, চিত্রকলা ও মার্শাল আর্টের মতো শিল্পকলায় বেশ সমৃদ্ধ।

আর চীনের ক্রীড়া সংস্কৃতিও বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন। বাস্কেটবল বর্তমানে চীনের সর্বাধিক জনপ্রিয় খেলা। চীনা বাস্কেটবল এবং আমেরিকান ন্যাশনাল বাস্কেটবলের বিপুল আগ্রহ আছে চাইনিজ মানুষের মধ্যে। বাস্কেটবল খেলার বাইরে চীনের অন্যান্য জনপ্রিয় খেলা গুলো হল, ফুটবল, মার্শাল আর্ট, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার এবং স্নুকার, গো (বোর্ড গেম), জিয়াংকি (বোর্ড গেম), মাহজং (বোর্ড গেম), দাবা, সাইক্লিং, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি। ১৯৩২ সাল থেকে চীন অলিম্পিক গেমসে অংশ নিচ্ছে। চীন ২০০৮ গ্রীষ্মকালীন বেইজিংয় অলিম্পিকের আয়োজক হয়েছিল, যেখানে চীনের ক্রীড়াবিদরা অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫১ টি স্বর্ণপদক পায়।

চীনের দর্শনীয় স্থান

চীনের মহাপ্রাচীর
চীনের মহাপ্রাচীর

চীন সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের দিক দিয়ে খুবই সমৃদ্ধ। চীনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়, নদী, সমুদ্রসহ আধুনিক নগরায়নের জন্যই সারা বিশ্বের ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। আর তাই দেশটি বিশ্বের পর্যটন গন্তব্যস্থলগুলির মধ্যে অন্যতম। চীনের দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল চীনের মহাপ্রাচীর (The Great Wall of China) – ‘দ্যা গ্রেট ওয়াল অফ চায়না’। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাচীর এবং চীনের প্রতীক। চীনের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম আরও কিছু স্থান হল বেইজিং এর নিষিদ্ধ নগরী, দ্য ট্যারাকোটা আর্মি, লি নদী, চেংদু রিসার্চ বেজ অব জায়ান্ট পান্ডা ব্রিডিং, রেইনবো মাউন্টেইন, লাসায় অবস্থিত পোতালা প্রাসাদ, সাংহাই এর দ্যা বান্ড, ভিক্টোরিয়া হারবার, হুয়াংশান এর হলুদ পাহাড় (মাউন্ট হুয়াং), হংজ়ৌ এর ওয়েস্ট লেক, লেশান জায়ান্ট বুদ্ধ, হানি টেরেস, লংমেন গুহা, ইয়ুংগ্যাং গুহা ইত্যাদি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 Shares
Share via
Copy link