ভারত পরিচিতি: ভারত সম্পর্কে জানা অজানা কিছু তথ্য

বিশ্বের মানচিত্রে সাহিত্য, বিজ্ঞান, সংস্কৃতিসহ আরো অনেক ক্ষেত্রে ভারতের অবদান অসীম। দেশটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এবং উন্নয়নশীল দেশ। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী হাজারো বৈচিত্রে ভরা এই দেশটি। তাইতো একদা বিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েন ভারত সম্পর্কে বলেছেন, “মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ উপাদানগুলি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে-লুকিয়ে আছে ভারতবর্ষের মাটিতে”। চলুন আজকে প্রাচীন দেশ এই ভারত সম্পর্কে জানা অজানা কিছু তথ্য জেনে নেই।

ভারত পরিচিতি

এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী, দ্রুত উন্নয়নশীল এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রিক দেশ হলো ভারত (India)। এটি বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ। এর অফিসিয়াল নাম ভারত রাজ্য। দেশটি ইন্ডিয়া নামেও পরিচিত। এর অবস্থান দক্ষিন এশিয়ায়। ভারতের সীমান্তবর্তী দেশগুলো হলো পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার এবং বাংলাদেশ। ২৯ টি রাজ্য ও ৭ টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় গনপ্রজাতন্ত্র। দেশটির রাজধানীর নাম নয়াদীল্লি এবং মুদ্রা হলো রূপি। ভারতীয় রূপি এবং বাংলাদেশের টাকার মান প্রায় সমান। ভারতের ১ রূপি সমান বাংলাদেশের ১.১২ টাকা [জুন, ২০২০]। ভারতে বসবাসকারী লোকদের বলা হয় ভারতীয় এবং তাদের প্রধান এবং সরকারী ভাষা হিন্দী ও ইংরেজি। তবে ভারতে বাংলা, তেলেগু, মারাঠি, তামিল, উর্দু ইত্যাদি ভাষাও বহুল প্রচলিত।

ভারতের ইতিহাস

ভারতের ইতিহাস
ভারতের ইতিহাস

যতদূর জানা যায়, ভারতীয় সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় ৫০০০ বছর পূর্বে সিন্ধু নদের তীরে। প্রাচীন আর্য ঋষিরা খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ সালে ভারতে আসে। তারা ছিলো কৃষক এবং তাদের ভাষা ছিলো সংস্কৃত। যা পৃথিবীর অন্যতম পুরাতন ভাষা। যুগে যুগে সেই ভারতে পরিবর্তন হয় এবং বহু শ্বাসক দেখা যায়। এরমধ্যে মুঘলরা ভারতের শিল্প, সাহিত্য এবং স্থাপত্যশিল্পে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। এই সময়ে বিভিন্ন রাস্তাঘাট, বাগান মসজিদ ইত্যাদি নির্মাণের পাশাপাশি নির্মিত হয় তাজমহল যা সপ্তমাশ্চর্যের একটি।

১৪০০ সালে ইউরোপীয়রা বাণিজ্য করতে আসে এবং ১৭৫৭ সালে যুক্তরাজ্য বা ব্রিটিশরা ভারত তথা ভারতবর্ষের দখল নেয়। ১৮৫৬ সালের মধ্যেই ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নেয়। এরপর ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা সিপাহি বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও তা দেশে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের দুর্বলতার দিকগুলি উন্মোচিত করে দেয়। ফলে ভারত ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে চলে যায়।

কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলি দেশজুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। এরপর মহাত্মা গান্ধী লক্ষাধিক মানুষকে সঙ্গে নিয়ে অহিংস আন্দোলনের ডাক দেন। এসময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস ও তার আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রামও ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। যার ফলশ্রুতিতে প্রায় ২০০ বছর শ্বাসনের পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট ভারত ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

ভারতের আয়তন ও ভৌগলিক অবস্থা

ভারতের আয়তন ও ভৌগলিক অবস্থা
ভারতের আয়তন ও ভৌগলিক অবস্থা

ভারতের আয়তন প্রায় ৩,২৮৭,২৬৩ বর্গ কিমি. (১,২৬৯,২১৯ বর্গমাইল)। এটি বিশ্বের ৭ম বৃহত্তম রাষ্ট্র। ভারতের মোট আয়তনের প্রায় ৯.৬% পানি। গত কয়েক দশক ধরেই দেশটির আয়তন কিছুটা বদলেছে। ভারতের দক্ষিণে রয়েছে ভারত মহাসাগর, দক্ষিন পশ্চিমাংশে রয়েছে আরব সাগর, দক্ষিনপূর্বে রয়েছে বঙ্গোপসাগর এবং উত্তরে হিমালয়। দেশটির স্থলভাগের বর্ডারের সাথে সংযুক্ত আছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন, নেপাল, মায়ানমার ও ভুটান।

ভারতের ভৌগলিক অবস্থা খুবই বৈচিত্র্যময়। যেমন দেশটির পশ্চিমদিক মরুময় কিন্তু উত্তর-পূর্বে বন জঙ্গল। আবার উত্তরে গঙ্গা নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠা সমতল ভূমি এবং পূর্বে সুন্দরবন। আর এই বৈচিত্র্যতার প্রভাব প্রাণিজগৎেও দেখা যায়। ভারতই একমাত্র দেশ যেখানে সিংহ এবং বাঘ উভয়ই আছে। এছাড়া এশিয়ান হাতি, গন্ডার, চিতা, ভাল্লুক, হরিন, বানর, হনুমান, কিং কোবরা ইত্যাদি দেখা যায়। আর জলে দেখা যায় ডলফিন, কাছিম, হাঙ্গর, কুমির ইত্যাদি।

ভারতের রাজনীতি

ভারতের রাজনীতি
ভারতের রাজনীতি

ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ। স্বাধীনতার পর থেকে এখনো পর্যন্ত অধিকাংশ সময় জুড়েই দেশটি শাসন করেছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। এছাড়া ভারতের আরো বিভিন্ন দলগুলো হলো ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) (সিপিআইএম) প্রভৃতি জাতীয় দল ও আঞ্চলিক দল দেখা যায়।

ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। তিনি পরোক্ষভাবে একটি নির্বাচক মণ্ডলী কর্তৃক পাঁচ বছরের সময়কালের ব্যবধানে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে ভারতের সরকার প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। অধিকাংশ শাসনক্ষমতা তার হাতেই ন্যস্ত থাকে। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীকে প্রথাগতভাবে সংসদের নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ট আসনপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দল বা জোটের সমর্থন লাভ করতে হয়। বর্তমানে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি এবং দলটির পার্লামেন্ট চেয়ারপার্সন ও ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হলেন নরেন্দ্র মোদি। রাষ্ট্রপতি হলেন রামনাথ কোবিন্দ এবং উপরাষ্ট্রপতি হলেন মুপ্পাভারাপু ভেঙ্কাইয়া নাইডু।

ভারতের অর্থনীতি

ভারতের অর্থনীতি
ভারতের অর্থনীতি

ভারতের অর্থনীতি একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি হিসাবে চিহ্নিত। ২০১৭ সালে ভারতের জিডিপি (GDP) ছিল ৯.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (PPP) এবং ২.৪৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (Nominal)। নমিনাল (Nominal) জিডিপিতে ভারতের অর্থনীতি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ক্রয় ক্ষমতার সমতা ((PPP)) ভিত্তিতে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। ২০১৯ সালে, ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারী দেশগুলো হল আমেরিকা, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, হংকং, ইরাক, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সুইজারল্যান্ড।

ভারতের অর্থনীতি বৈচিত্র্যময়। কৃষিকাজ, হস্তশিল্প, বস্ত্রশিল্প, উৎপাদন, এবং বিভিন্ন সেবা ভারতের অর্থনীতির প্রধান ক্ষেত্র। ভারতের শ্রমশক্তির প্রায় ৭০% প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিখাতে যুক্ত। তবে সেবাখাত ক্রমেই প্রসার লাভ করছে এবং ভারতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এছাড়া বর্তমানে ভারত আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার ও আর্থিক সেবা এবং কারিগরি সহায়তা দানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলেও পরিণত হয়েছে। এসব ছাড়া উৎপাদন, ওষুধ শিল্প, জীবপ্রযুক্তি, ন্যানোপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, জাহাজ নির্মাণ, বিমানভ্রমণ এবং পর্যটন শিল্পগুলিতেও ভবিষ্যতে জোরালো প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে।

ভারতের মানুষ ও সংস্কৃতি

কুম্ভমেলায় আগত ভক্ত এবং দর্শনার্থী
কুম্ভমেলায় আগত ভক্ত এবং দর্শনার্থী

ভারত বিশ্বের ২য় বৃহত্তম জনবহুল দেশ। ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১.২৬ বিলিয়ন। এটি একটি খুবই আধ্যাত্মিক দেশ। দেশটির কোন প্রধান ধর্ম না থাকলেও প্রায় ৭৯.৮% হিন্দু, ১৪.২% মুসলমান এবং বাকিরা খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন প্রভৃতি। সাংস্কৃতিক বৈশিষ্টের মধ্যে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট হলো ঐক্য। এই সংস্কৃতি নিজ ঐতিহ্যরক্ষার পাশাপাশি এশিয়ার অন্যান্য দেশের সংস্কৃতির উপরেও নিজ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

স্থাপত্য, রন্ধনশিল্প এবং সংগীত শিল্পে ভারতের বিশ্বজোড়া খ্যাতি রয়েছে। এছাড়া ভারতের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিও খুব শক্তিশালী। ভারতের জনপ্রিয় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে বলিউড, কলিউড, টলিউড অন্যতম। ভারতে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হল ক্রিকেট। ক্রিকেট খেলায় দেশটির সাফল্যও এর অন্যতম কারন। দেশটি ২ বার ওয়ানডে সংস্করণে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এবং ১ বার টি-টুয়েন্টি সংস্করণে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ক্রিকেটের বাইরে ভারতে ফুটবল, হকি, কাবাডি, দাবা, টেনিস, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি খেলাও জনপ্রিয়। তবে জনসংখ্যা এক বিলিয়ন অতিক্রম করলেও ভারত খুব অল্প সংখ্যক অলিম্পিক পদক জিতেছে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত, ভারত মোট ২৮ টি গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক পদক জিতেছে।

ভারতের দর্শনীয় স্থান

পড়ন্ত বিকালে সোনালী আলোয় তাজমহল
পড়ন্ত বিকালে সোনালী আলোয় তাজমহল

ভারতে অসংখ্য দর্শনীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থান দেখা যায়। ভারতের দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তাজমহল (Taj Mahal), যা পৃথিবীর সপ্তমাশচর্যের একটি। আরো আছে গঙ্গা নদী, বারানসির পবিত্র নগরী (Varanasi), অম্রতসরের সোনার মন্দির, ভারতের প্রবেশদ্বার (Gateway of India), কুতুব মিনার (Qutb Minar), অজান্তা ও ইলোরা গুহা (Ajanta & Ellora Caves), জয়পুরের জন্তর মন্তর ও আমির দূর্গ, আগ্রার দূর্গ, গোয়ার সমুদ্রসৈকত, দার্জিলিং (Darjeeling) ইত্যাদি।



error: