নাইজেরিয়া পরিচিতি: নাইজেরিয়া সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য

আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী এবং ধনী দেশ হল নাইজেরিয়া (Nigeria)। আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় নাইজেরিয়া দেশটি বাংলাদেশীদের কাছে মোটামুটি পরিচিত। বিশেষ করে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা এবং ইউরোপের জনপ্রিয় লীগগুলো ও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলে খেলা নাইজেরিয়ার ফুটবলারদের কারনেই দেশটি বাংলাদেশীদের কাছে পরিচিত এক নাম। তবে দেশটি শুনতে পরিচিত মনে হলেও নাইজেরিয়া সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। জানিনা নাইজেরিয়ার ইতিহাস, আয়তন কিংবা তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে। তাই চলুন আজকে আফ্রিকা মহাদেশের দেশ নাইজেরিয়া সম্পর্কে জানা অজানা বিভিন্ন তথ্য জেনে নেই।

নাইজেরিয়া পরিচিতি

নাইজেরিয়ার সরকারী নাম ফেডারেল রিপাবলিক অব নাইজেরিয়া (নাইজেরিয়া যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র)। নাইজেরিয়া নামটি দেশেটির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নাইজার (Niger) নদী থেকে নেওয়া হয়েছিল। দেশটির এর পশ্চিমে বেনিন, উত্তরে নাইজার, উত্তর-পূর্বে চাদ, পূর্বে ক্যামেরুন এবং দক্ষিণে আটলান্টিক মহাসাগর তথা গিনি উপসাগর। দেশটি ৩৬টি রাজ্য নিয়ে গঠিত। নাইজেরিয়ার রাজধানীর নাম আবুজা (Abuja) এবং নাইজেরিয়ার সবচেয়ে বড় শহর হল লেগোস (Lagos)। ১৯৯১ সালে দেশের রাজধানী লেগোস থেকে আবুজাতে স্থানান্তরিত করা হয়। নাইজেরিয়ার মুদ্রার নাম নাইরা (Naira)। নাইজেরিয়ান নাইরার মুল্যমান বাংলাদেশী টাকার চাইতে কম। বর্তমানে বাংলাদেশের ১ টাকা সমান নাইজেরিয়ার প্রায় ৪.৫ নাইরা [জুন ২০২০]। নাইজেরিয়ার সরকারী ভাষা ইংরেজি। তবে দেশটিতে হাউসা, ইগবো, ইয়োরুবা, ফুলানিসহ আরো বেশকিছু ভাষা ব্যবহৃত হয়।

নাইজেরিয়ার ইতিহাস

নাইজেরিয়াতে প্রাচীন কাল থেকেই মানব বসতি ছিল। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দে নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে নোক সভ্যতার প্রমান পাওয়া যায়। সেখানকার ইগবো সম্প্রদায়ের ন্রি (Nri) সাম্রাজ্য ১০ম শতাব্দী হতে সংকুচিত হতে হতে ১৯১১ সালে ব্রিটিশদের কাছে এর সার্বভৌমত্ব হারায়। ন্রি (Nri) সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন ইজে ন্রি (Eze Nri) এবং ন্রি শহরকেই ইগবো সভ্যতার ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় নাইজেরিয়ার ওইয়ো এবং ইফে’দের ইওরুবা সাম্রাজ্য যথাক্রমে দ্বাদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দীতে স্থাপিত হয়। এছাড়া বোর্নু, বেনিন, হাউসা, ফুলানিসহ আরো কিছু জাতিগোষ্ঠী সেখানে বসতি স্থাপন করে।

প্রথম ইউরোপীয় জাতি হিসেবে পর্তুগিজরা ১৬শ শতকে নাইজেরিয়ার দক্ষিনাঞ্চল লেগোস এবং ক্যালবার শহরে আসে। পড়ে অঞ্চলটিই আফ্রিকার ক্রীতদাস বাণিজ্যের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয় যা স্লেভ কোস্ট নামে পরিচিত। ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা ক্রীতদাস বাণিজ্য অবৈধ ঘোষণা করে। পরে ১৮৬১ সালে ব্রিটিশরা লেগোসকে অধিগ্রহণ করে। এরপর ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ১৮৮৫ সালের মধ্যেই ব্রিটিশরা সমগ্র অঞ্চলটিকে আয়ত্তে নিয়ে ফেলে।

নাইজেরিয়ার প্রথম স্বাধীনতা দিবস উৎযাপন
নাইজেরিয়ার প্রথম স্বাধীনতা দিবস উৎযাপন

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, পুরো আফ্রিকা জুড়ে স্বাধীনতার এক বিশাল ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। এই ঢেউ নাইজেরিয়াতেও আছড়ে পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে, ১৯৬০ সালের ১লা অক্টোবর নাইজেরিয়া ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৯৬৩ সালে এটি একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যার রাষ্ট্রপতি ছিলেন এনামদি আজিকিওয়ে (Nnamdi Azikiwe)। কিন্তু শীঘ্রই ক্ষমতার জন্য জাতিগত সংঘাত শুরু হয়ে যায় এবং সামরিক অভ্যুত্থান দেখা দেয়। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত এবং পরবর্তীতে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সামরিক গোষ্ঠী দেশটিকে শাসন করে।

নাইজেরিয়ার আয়তন ও ভৌগলিক অবস্থা

নাইজেরিয়ার আয়তন ৯,২৩,৭৬৯ বর্গকিলোমিটার (৩.৫৬,৬৬৯ বর্গমাইল)। ফলে আয়তনের দিক দিয়ে দেশটি বিশ্বে ৩২তম বৃহত্তম দেশ আর পশ্চিম আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ। আর দেশটির আয়তনের প্রায় ১.৪% পানি। নাইজেরিয়ার সর্বোচ্চ পয়েন্টটি চপল ওয়াদডি (Chappal Waddi) যা ২,৪৯৯ মিটার উঁচু। আর প্রধান নদীগুলো হল নাইজার এবং বেনু।

নাইজেরিয়া প্রাকৃতিকভাবে একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। দক্ষিণাঞ্চলে আছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইন ফরেস্ট জলবায়ু, যেখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ৬০ থেকে ৮০ ইঞ্চি (১,৫০০ থেকে ২,০০০ মিমি.)। দক্ষিণ-পূর্বে আছে ওবুদু (Obudu) মালভূমি। দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে পাওয়া যায় উপকূলীয় সমভূমি। নাইজেরিয়ার বনাঞ্চলের দক্ষিণ অংশটিকে “লবণাক্ত জলের জলাভূমি (Salt Water Swamp)” বলা হয়, যা এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ম্যানগ্রোভের কারণে ম্যানগ্রোভ জলাভূমি হিসাবেও পরিচিত।

নাইজেরিয়ার রাজনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের মত নাইজেরিয়াও একটি ফেডারেল রিপাবলিক দেশ, যেখানে রাষ্ট্রপতি সকল কার্যনির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে। রাষ্ট্রপতি একাই রাষ্ট্রপ্রধান এবং ফেডারেল সরকারের প্রধান। ২০১৫ সালের ২৮শে মার্চ জেনারেল মুহাম্মদু বুহারি তৎকালীন ডক্টর গুডলাক জনাথনকে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। ন্যাশনাল পার্লামেন্টে আসন সংখ্যা ৩৬০টি যা প্রতিটি রাজ্যে সেই রাজ্যের জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

নাইজেরিয়ার অর্থনীতি

নাইজেরিয়ার অর্থনীতি
নাইজেরিয়ার অর্থনীতি

নাইজেরিয়ার অর্থনীতি আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি। দেশটির অর্থনীতি ১৯৬০ এর দশকের শেষের দিক থেকে মূলত পেট্রোলিয়াম শিল্পের উপর নির্ভরশীল। ১৯৭৩ সাল থেকে বিশ্বে বেশ কয়েকবার তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন, নির্মাণ, উৎপাদন ও সরকারী চাকরিতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে। এতে করে প্রচুর সংখ্যক গ্রামীণ নাইজেরীয় শহরাঞ্চলে চলে আসে। ফলে কৃষি উৎপাদন এতটাই স্থবির পরে যে পাম তেল, চিনাবাদাম এবং তুলার মতো ফসল থেকেও আর উল্লেখযোগ্য রফতানি আয় ছিল না [Britannica]।

তবে নাইজেরিয়া বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ঘুরে দারিয়েছে। ২০১৯ সালে দেশটির অর্থনীতি গত ৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্প্রসারিত হয়েছে। তেল উৎপাদন বৃদ্ধি ও ঋণ প্রবৃদ্ধি জোরদারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া পদক্ষেপগুলো এ সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করেছে। নাইজেরিয়ার অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ অব্যাহত থাকবে বলে পূর্বাভাস করেছেন বিশ্লেষকরা। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সিটি গ্রুপের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, নাইজেরিয়া ২০১০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে সর্বোচ্চ গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে।

নাইজেরিয়ার মানুষ ও সংস্কৃতি

নাইজেরিয়ার মানুষ
নাইজেরিয়ার মানুষ

বর্তমানে নাইজেরিয়ার জনসংখা প্রায় ২০ কোটি ৬০ লক্ষ। নাইজেরিয়া আফ্রিকার সর্বাধিক জনবহুল ও বিশ্বের ৭ম সর্বোচ্চ জনবহুল রাষ্ট্র। আফ্রিকা মহাদেশের প্রতি ৬ জনের ১ জনই নাইজেরীয়। নাইজেরিয়ায় ইসলাম ও খ্রিস্টান সবচেয়ে বহুল প্রচারিত ধর্ম। দেশটিতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩.৫%ই মুসলিম, এরপরে আছে খ্রিস্টানরা, যারা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫.৯%। বাকিরা আফ্রিকার প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মে এবং অন্যান্য ধর্মে বিশ্বাসী। তবে নাইজেরিয়ার অর্থনীতি আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও দেশটির বেশিরভাগ লোক দরিদ্র। দেশের ৭১ শতাংশ লোক দিন পার করে ১ ডলারেরও কম খরচে। আর ৯২ শতাংশের দৈনিক ব্যয় ২ ডলারেরও কম।

দেশিটির মানুষ চলচ্চিত্র দেখতে পছন্দ করে। একারনেই হয়তো দেশটি চলচ্চিত্র নির্মাণে ‍বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে [Bangla Insider]। এর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে নলিউড নামে ডাকা হয়। এটি আফ্রিকার মধ্যে সর্ববৃহৎ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নামে পরিচিত। অফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে নাইজেরিয়াতেই ফুটবল খেলা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। দেশটির জাতীয় ফুটবল দলকে সুপার ঈগল নামে ডাকা হয়। ইতিমধ্যে নাইজেরিয়া ফুটবল বিশ্বকাপে ছয় বার অংশগ্রহণের সম্মান অর্জন করেছে – ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০১০, ২০১০ এবং ২০১৮ সালে। তারা ১৯৮০, ১৯৯৪ এবং২০১৩ সালে আফ্রিকার কাপ অফ নেশন্স জিতেছিল। এছাড়া ১৯৯৬ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে ফুটবলে স্বর্ণপদক জিতেছিল নাইজেরিয়া।

নাইজেরিয়ার দর্শনীয় স্থান

নাইজেরিয়ার দর্শনীয় স্থান - ইবেনো সমুদ্র সৈকত
নাইজেরিয়ার দর্শনীয় স্থান – ইবেনো সমুদ্র সৈকত

নাইজেরিয়াতে প্রচুর পরিমাণে নৃগোষ্ঠীর কারণে নাইজেরিয়ার পর্যটন মূলত বিভিন্ন ইভেন্টগুলোকে কেন্দ্র করেই তবে রেইনফরেস্ট, সাভানা, জলপ্রপাত এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক স্থানও নাইজেরিয়ার পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। নাইজেরিয়ার দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে অন্যতম হল ইবেনো সমুদ্র সৈকত, ওবুদু মাউন্টেন রিসর্ট, নওউ পাইন ফরেস্ট, আওহুম জলপ্রপাত, গাশাকি-গুম্পতি ন্যাশনাল পার্ক, গুরারা জলপ্রপাত, ইদান্রে পর্বত ইত্যাদি।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 Shares
Share via
Copy link