বাইসন পরিচিতি: বাইসন সম্পর্কে জানা অজানা বিভিন্ন তথ্য

প্রথম দেখায় বাইসনকে হয়ত মহিষ বলে ভুল হতে পারে। আর হবে নাই বা কেন? গায়ে গতরে দেখতে যে এটি একদম মহিষেরই জাতভাই। তবে বাইসন আর মোষের মাঝে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। আসলে মহিষ দেখতে অনেকটা বিশালাকার ষাঁড়ের মত, যেখানে বাইসন একটি বিশালাকার লোমশ মহিষের মত। বাইসন এবং মহিষ উভয়েই বোভিনি (বোভিডি গোত্রের উপপরিবার) গোত্রের প্রাণী হলেও তাদের গণ আলাদা। এই পরিবারে আরো আছে অ্যান্টিলোপ, গরু, ভেড়া ও ছাগল। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, বাইসন আমাদের চেনা পরিচিত গৃহপালিত পশুদেরই সহোদর। বিশালাকার এই বাইসনেরও রয়েছে দু’টি প্রজাতি- আমেরিকান বাইসন এবং ইউরোপিয়ান বাইসন। ২০১৬ সালের ৯ মে, বারাক ওবামার হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্তন্যপায়ীর মর্যাদা পায় আমেরিকান বাইসন।

বাইসনের আকার ও আকৃতি

পুরুষ বাইসন

পুরুষ বাইসন; Credit: Pixabay

আমেরিকান বাইসন উত্তর আমেরিকার সর্ববৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণী। মাথা থেকে পশ্চাৎদেশ পর্যন্ত এরা দৈর্ঘ্যে ৭ ফুট থেকে সাড়ে ১১ ফুট (২.১ থেকে ৩.৫ মিটার) পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং তার লেজ আরো অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৩.৫ ইঞ্চি যোগ করে।  আর এরা ওজনে হয় প্রায় ৯৩০ থেকে ২,২০০ পাউন্ড (৪২২ থেকে ৯৯৮ কেজি) পর্যন্ত।
অপরদিকে ইউরোপিয়ান বাইসনরা ইউরোপের সবচেয়ে বড় তৃণভোজী প্রাণী – Encyclopedia Britannica। এরা গড়ে লম্বায় প্রায় ৯.৫ ফুট (৩ মিটার) হয়। তবে লম্বায় আমেরিকান বাইসন এবং ইউরোপিয়ান বাইসন কাছাকাছি হলেও ইউরোপিয়ান বাইসনরাই গড়ে ওজনে বেশি হয়। এরা ওজনে প্রায় ১৭৬২ থেকে ২,২০৩ পাউন্ড (৮০০ থেকে ১,০০০ কেজি) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
আগেই বলা হয়েছে এদের দৈহিক আকৃতি অনেকটা মহিষের মতো। এদের ঘাড়ে বিশাল কুঁজ থাকে। সাথে রয়েছে দীর্ঘ লোমশ কেশর। বিশাল মাথা কিন্তু তুলনামূলক খাটো শিং। তবে নারী-পুরুষ উভয় বাইসনেরই শিং থাকে। এরা সাধারণত বাদামী বর্ণের হয়ে থাকে।

আরো পড়ুন:  জিরাফ পরিচিতি: জিরাফ সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য

বাইসনের আবাস্থল

আমেরিকান বাইসন মূলত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর সংরক্ষিত অঞ্চল বা খামারগুলোতেই দেখতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ইউরোপিয়ান বাইসন এক সময় সমগ্র ইউরোপ জুড়ে বিচরণ করলেও বর্তমানে শুধু পোল্যান্ড, বেলারুশ, লিথুয়ানিয়া, রাশিয়া, ইউক্রেন এবং স্লোভাকিয়াতেই দেখতে পাওয়া যায়।

বাইসনের স্বভাব

বাইসনের স্বভাব

বাইসনের স্বভাব; Credit: Pixabay

বাইসন সামাজিক জীব এবং এরা বড় বড় দল বেঁধে থাকে। এদের একেকটি দলকে বলা হয়ে থাকে “পাল” বা ‘হার্ডস (Herds)’। বাইসনদের মধ্যে পুরুষ ও নারীর পাল আলাদা থাকে। একটি হার্ডে সাধারণত দলের মেয়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে থাকে আর অন্য একটা পালে থাকে পুরুষরা। যে তাদের ছেড়ে থাকে, এটি মোটেই ভাববেন না। পুরুষ বাইসন তাদের দলের নারীদের নিয়ে খুব চিন্তা করে তাই তাদের স্থানটা হয়ে থাকে একটু আলাদা। তবে এরা কাছাকাছি দূরত্বেই অবস্থান করে। পুরুষরা সাধারণত অন্যান্য হিংস্র পশু থেকে মেয়েদের রক্ষা করে।
বাইসনরা মাইগ্রেটরি জন্তু, অর্থাৎ এরা খাবার ও সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পরিভ্রমণ করে থাকে। এরা শীতকালে দক্ষিণ দিকে যাত্রা করে আর বসন্ত কালে উত্তরের দিকে। বাইসন ওজনে খুব ভারী হলেও এরা দ্রুতগতির প্রাণী। এরা ঘণ্টায় প্রায় ৪০ মাইল গতিতে দৌড়াতে সক্ষম – Encyclopedia Britannica। যখন একটি বাইসনের লেজ সোজা হয়ে যায়, তখন এর থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকাই উত্তম। কারণ, এর মানে হচ্ছে বাইসন রেগে আছে।

আরো পড়ুন:  গণ্ডার পরিচিতি: গণ্ডার সম্পর্কে জানা অজানা বিভিন্ন তথ্য

বাইসনের খাদ্যাভ্যাস

আকারে বিশাল হলেও বাইসন বিশুদ্ধ তৃণভোজী প্রাণী। এরা সাধারণত ঘাস-লতা খেলেও ক্ষেত্রবিশেষে গাছের পাতা ও ডালপালাও খেতে দেখা যায়।

বাইসনের প্রজনন

বাইসনের প্রজনন

বাইসনের প্রজনন; Credit: Wikimedia

প্রতি বছর আগস্টের কাছাকাছি সময়ে এরা মিলিত হয়। পুরুষ বাইসনেরা পছন্দসই মেয়েদের জন্য অন্য পুরুষদের সাথে লড়াই করে। কিন্তু এক গবেষণায় দেখায গেছে যে,  যে স্ত্রী বাইসন রা হয়তো শান্ত পুরুষই বেশি পছন্দ করে। মার্চ থেকে মে মাসে বাইসন বাছুর জন্ম দেয়। এসময় স্ত্রী বাইসনরা দীর্ঘ ৯ মাসের গর্ভাবস্থায় থাকে। সাধারণত, এরা একবারে শুধুমাত্র একটি বাচ্চাই প্রসব করে, যদিও যমজ বাচ্চা প্রসব করারও রেকর্ড হয়েছে।
শিশু বাইসনকে বাছুর বলা হয়। এরা তুলনামূলক বড় হয়। জন্মের সময়ই একটি আমেরিকান বাইসন বাছুর ওজনে প্রায় ৩০ থেকে ৭০ পাউন্ড (১৪ থেকে ৩২ কেজি) হয়ে থাকে – U.S. Department of Interior। এই বাছুরদের শুধু মা বাইসনই নয় বরং সমগ্র বাইসন পাল মিলে নিরাপত্তা দিয়ে রাখে বড় না হওয়া পর্যন্ত। বাছুরগুলো ৭ থেকে ১৩ মাস পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করে এবং সাধারণত ২ থেকে ৩ বছর বয়সেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যায়। আর একটি প্রাপ্তবয়স্ক বাইসন ১৪ থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

বাইসনের সংরক্ষণ অবস্থা

U.S. Department of Interior এর মতে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে উত্তর আমেরিকাতে মিলিয়নেরও বেশি বাইসন ঘুরে বেড়াত। স্থানীয় অনেক আমেরিকান উপজাতি খাদ্য, বস্ত্র এবং আশ্রয়ের এসব বাইসনদের উপর নির্ভর করতো। কিন্তু ১৮ শতকের শেষের দিকে, আমেরিকাতে শুধুমাত্র কয়েকশো বাইসনই বেঁচে ছিল – যখন ইউরোপীয়রা বাসস্থানের জন্য পশ্চিমে যেতে শুরু করে এবং বাইসনদের বাসস্থান ধ্বংস করে। তারা বাইসনদের একেবারে বিলুপ্তির কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলো।

বাইসনের সংরক্ষণ অবস্থা

বাইসনের সংরক্ষণ অবস্থা

তবে বর্তমানে, এরা বিপন্ন না হলেও খুব একটা ভাল নেই। আমেরিকান বাইসন বর্তমানে IUCN এর রেড লিস্টে তালিকাভুক্ত। তাদের মতে বর্তমানে ৫৪ টি সংরক্ষিত পালে মোট ১৯,০০০ টির মত প্লেইন বাইসন এবং আরো ১১টি সংরক্ষিত পালে মোট ১১,০০০ উড বাইসন আছে।
অপরদিকে IUCN এর মতে, ইউরোপিয়ান বাইসন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। সংগঠনটি বিশ্বাস করে যে, বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক ইউরোপিয়ান বাইসনের সংখ্যা ১ কম! অবাধে পশু হত্যা ও চোরাকারবারির কারনে চমৎকার এই প্রাণীটি আজ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। তবে আশার কথা এই যে, বর্তমানে স্থানীয় রেঞ্জার ও স্বেচ্ছাসেবকরা বাইসনদের বাঁচানোর জন্য তাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *