মেগালোডন পরিচিতি: মেগালোডন সম্পর্কে জানা অজানা বিভিন্ন তথ্য

বর্তমানে যদি অাপনাকে প্রশ্ন করা হয় সবথেকে বড় প্রাণী কোনটি? আপনি হয়তো বিনা দ্বিধায় উত্তর দিবেন, তিমি। কিন্তু জেনে অাবাক হবেন যে, এই তিমিও এককালে এক সামুদ্রিক দানবের জল খাবার ছিলো। প্রাণীটি অার কেউ নন, ইনি হলেন ডাইনোসর বিলুপ্তির পর পৃথিবীর সমুদ্র-জগৎ শাসন করা একমাত্র ডন মেগালোডন। আজ থেকে প্রায় ২৩ মিলিয়ন বছর আগে সাগরের অতলে বাস করা এই মেগালোডনের বৈজ্ঞানিক নাম কারচারোকলস মেগালোডন (Carcharocles megalodon), আর যার ডাকনাম ‘দ্য মেগ‘।

মেগালোডনদের আকার ও আকৃতি

মেগালোডন এবং হোয়াইট শার্কের দাঁতের তুলনা

মেগালোডন এবং হোয়াইট শার্কের দাঁতের তুলনা

মেগালোডন কত বড় ছিল তার উত্তর পাওয়া যায় তার দাঁত দেখেই। এদের সবচেয়ে বড় যে দাঁতটি পাওয়া গেছে সেটি লম্বায় সাত ইঞ্চি আর চওড়াও কম নয়। যেখানে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক হোয়াইট শার্কের দাঁতও তিন ইঞ্চি হয় কদাচিৎ। তবে দাঁত এবং কশেরুকা ছাড়া মেগালোডনের আর কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি। তাই এদের নিকটতম আত্মীয় হোয়াইট শার্কের সাথে তুলনা করে এবং ফসিল পুনঃবিন্যাস করে বিজ্ঞানীরা এদের ব্যাপারে আমাদের মোটামুটি একটি ধারণা দিয়েছেন। একটি হিসাব মতে, মেগালোডন লম্বায় গড়ে প্রায় ১০ মিটার থেকে শুরু হয়ে ১৮ মিটারের কাছাকাছি (Natural History Museum)। আবার অনেকের মতে, মেগালোডন লম্বায় পঁচিশ মিটারের কাছাকাছি (Encyclopedia Britannica)।

মেগালোডনদের আকার ও আকৃতি

মেগালোডনদের আকার ও আকৃতি

ওজনের ব্যাপারে মেগালোডনদের লিঙ্গভেদে অনেক পার্থক্য ছিল। স্ত্রী মেগালোডনের ওজন যেখানে ২৭.৪ থেকে ৫৯.৪ মেট্রিক টন, সেখানে পুরুষদের ওজন মাত্র ১২.৬ থেকে ৩৩.৯ মেট্রিক টন। ধারণা করা হয়, উপযুক্ত পরিবেশ এবং পরজাপ্ত খাবার পাবার কারনেই এরা এমন বিপুল আকৃতির হতো। আর অতিকায় গ্রীবার কারনে তাদের কামড়ে জোড়ের পরিমাণও ছিল খুব বেশি। হোয়াইট শার্কের যেখানে ১৮,০০০ নিউটন বল প্রয়োগ করে, সেখানে মেগালোডনদের কামড়ে থাকে ১১০,০০০ থেকে ১৮০,০০০ নিউটন।

আরো পড়ুন:  পিগমি মারমোসেট পরিচিতি: আঙ্গুল সাইজের সবচেয়ে ছোট বানর

মেগালোডনদের আবাস্থল

মেগালোডনদের বিচরণ ছিল প্রায় পুরো পৃথিবী জুড়েই। ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে এর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। এমনকি মারিয়ানা ট্রেঞ্চ থেকেও তাদের দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে। আবার ভারতীয় উপমহাদেশও বঞ্চিত হয়নি মেগালোডনের খপ্পর থেকে। উপকূল থেকে গভীর সমুদ্র – সব জায়গাতেই নিজেদের মানিয়ে নিয়েছিলো তারা। যদিও শিশু মেগালোডনরা মূলত উপকূলবর্তী এলাকাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো।

মেগালোডনদের খাদ্যাভ্যাস

মেগালোডনদের খাদ্যাভ্যাস

মেগালোডনদের খাদ্যাভ্যাস

শিকারীদের মধ্যে সবার উপরের নামটিই ছিল মেগালোডনদের। বিশাল দাঁত দিয়ে সাগরে একচ্ছত্র রাজত্ব করে গেছে তারা। ছোট মাছ থেকে শুরু করে সীল, সামুদ্রিক কচ্ছপ দিয়ে হরহামেশাই উদরপূর্তি করতো। তালিকা থেকে বাদ যেত না ডলফিন বা স্বগোত্রীয় অন্য ছোট হাঙ্গরেরাও। এমনকি তিমিরা তাদের প্রকাণ্ড শরীর নিয়েও মাফ পায়নি এই দানবদের থেকে। তাদের শিকারের কৌশল ছিল খুবই জটিল। শিকারের সাইজ অনুযায়ী এরা তাদের কৌশল নির্ধারণ করতো। অধিকাংশ সময় এরা শিকারের হৃৎপিন্ড এবং ফুসফুস লক্ষ্য করেই অ্যাটাক করতো। আর বড় শিকার করার সময় অনেকটা বর্তমান হোয়াইট শার্কের অনুকরণেই শিকার করতো।

মেগালোডনদের প্রজনন

সমসাময়িক অন্যান্য হাঙ্গরদের মত মেগালোডনরাও তাদের বাচ্চা প্রসবের জন্য নার্সারি ব্যবহার করতো যেখানে ছিল বিপুল সংখ্যক খাবার এবং শিকারিদের কাছ থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা। প্রাপ্ত ফসিলের ভিত্তিতে এসব নার্সারি এলাকাগুলো হতো উষ্ণ পানির সমুদ্র উপকূল। কারন এখানে খাবার এবং সুরক্ষার নিশ্চয়তা উভয়ই ছিল। মেগালোডন এসব নার্সারি এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে পানামার গুটান ফরমেশন, ম্যারিল্যান্ড এর কালভার্ট ফরমেশন, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের বাঙ্কো দি কন্সেপশন এবং ফ্লোরিডার বোন ভ্যালি ফরমেশন।

মেগালোডনদের নার্সারি এলাকাগুলো

মেগালোডনদের নার্সারি এলাকাগুলো

মেগালোডনদের বাচ্চা লম্বায় প্রায় ৩.৫ মিটার বা ১১ ফুট। বাচ্চাকালে এরা হ্যামার হেড শার্ক এবং নাগেলটুথ শার্ক এর সহজ শিকার। আর এইজন্যই এরা নার্সারি এলাকাগুলো যতটা সম্ভব সুরক্ষিত স্থানে রাখে। বাচ্চা মেগালোডনদের খাবারের তালিকায় থাকে ছোট মাছ ,সীল, সামুদ্রিক কচ্ছপ ইত্যাদি।

আরো পড়ুন:  প্রাণী পরিচিতি: আফ্রিকান হাতি: স্থলভাগের সবচেয়ে বড় প্রাণী

মেগালোডন এর বিলুপ্তি

বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনই মেগালোডনদের বিলুপ্তির প্রধান কারন। এরা ছিল উষ্ণ রক্তের প্রাণী। আর এটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো তাদের জন্য। আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ মিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবীর তাপমাত্রা হঠাৎ ঠান্ডা হওয়া শুরু করে। ফলে মেগালোডনরা যেসব খাদ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল তারাও খাদ্যের অভাবের কমে যেতে থাকে এবং বরফ যুগ শুরু হওয়ার সাথে সাথে অনেক প্রাণী মেরু অঞ্চলেও চলে যায়। কিন্তু মেগালোডনের পক্ষে তাদের পিছু নেওয়া সম্ভব ছিল না। কারন তাদের শরীরকে উষ্ণ রাখার জন্য তারা উষ্ণ জলের উপর নির্ভরশীল ছিল।

মেগালোডন এর বিলুপ্তি

মেগালোডন এর বিলুপ্তি

তাছাড়া বরফ যুগের আগমনের সাথে সাথে সমুদ্রতলের উচ্চতা কমে যাওয়ায় তাদের চারণক্ষেত্রও কমে যেতে থাকে। এছাড়া এ সময় খবারের জন্য খুনে তিমি সহ আরো কিছু শিকারী প্রাণীও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসে। খাবার কমে যাওয়ায় এদের লড়াই করতে হতো অন্যান্য মেগালোডনদের সাথে। আর শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্যই নয়, সাগরের তাপমাত্রার সাথে নিজের শরীরের তাপমাত্রা মানানসই করে রাখার জন্যও তাদের বিপুল পরিমাণে খাবারের প্রয়োজন ছিল। আর এভাবেই আস্তে আস্তে বৃহদাকার মেগালোডন হারিয়ে যায় পৃথিবীর বুক থেকে।

স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয়েছে, মেগালোডনেরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে পৃথিবী থেকে। কিন্তু তাদের বিলুপ্তি নিয়েও কম জল ঘোলা হয়নি। অনেকেই বর্তমানে মেগালোডন দেখার দাবী করেছেন। ইউটিউবেও আপনি তাদের বর্তমান অস্তিত্ব সম্পর্কে অনেক ভিডিও পাবেন। তবে বিজ্ঞানীদের কাছে এসব ধোপে টেকেনি। তাদের মতে মেগালোডনদের বর্তমানে দেখার কোন সম্ভাবনাই নেই।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *