ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক: বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ন্যাশনাল পার্ক

আমেরিকা খুব বৈচিত্র্যময় এক দেশ। বৈচিত্র্যময় এই দেশে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান। আর আমেরিকার দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে অন্যতম হল ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক (Yellowstone National Park)। এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ন্যাশনাল পার্ক। পার্কের ভিতরে রয়েছে পর্বতমালা, সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, উপ আ্যলপাইন অরণ্য, গিরিখাত, নদী ও হ্রদ। এটি ১৮৭২ সালের ১লা মার্চ রাষ্ট্রপতি ইউলিসিস এস. গ্র্যান্টের সাক্ষরানুক্রমে মার্কিন কংগ্রেস একটি আইন পাস করে স্থাপিত হয়েছিলো। পার্কটি মূলত ওয়াইওমিং রাজ্যে অবস্থিত হলেও মন্টানা ও আইডাহো রাজ্যেও এর কিছু অংশ রয়েছে৷ জীববৈচিত্র্য ও জিওথার্মাল বৈশিষ্ট্যের জন্য পার্কটি খুবই বিখ্যাত।

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক
ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক এর আয়তন ৮,৯৮০ বর্গ কিলোমিটার। ইয়েলোস্টোন হ্রদ উত্তর আমেরিকার বৃহত্তম হ্রদগুলির অন্যতম। এটি মহাদেশের বৃহত্তম মহাআগ্নেয়গিরি ইয়েলোস্টোন ক্যালডেরার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। ক্যালডেরাটিকে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি মনে করা হয়। বিগত দুই মিলিয়ন বছরে বহুবার এই আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্নুৎপাত হয়েছে। আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা এখানকার ভূতাপমাত্রাগত বৈশিষ্ট্যগুলির জন্য বহুলাংশে দায়ী। উদ্যানটির বেশ কিছু বিশিষ্ট উষ্ণ ফোয়ারার মধ্যে রয়েছে বিস্কুট অববাহিকা, গ্র্যান্ড প্রিজম ফোয়ারা, মিডওয়ে উষ্ণ ফোয়ারা, আপার উষ্ণ ফোয়ারা, নরিস উষ্ণ ফোয়ারা, ম্যামথ উষ্ণ ফোয়ারা, ওল্ড ফেথফুল. ওয়েষ্ট থাম্ব উষ্ণ ফোয়ারা, লোন স্টার উষ্ণ ফোয়ারা, ক্যাসেল উষ্ণ ফোয়ারা ইত্যাদি।

উদ্যানটি গ্রীষ্মকালে দিনেরবেলায় উষ্ণ ও রাত্রিতে শীতল সহ বেশ মনোরম থাকে, তবে যদিও এখানে ঘন-ঘন বৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বসন্তকাল ও শরৎকালে ব্যাপক মাত্রায় তাপমাত্রার তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। শীতকালের সময় উদ্যানটি প্রায় সময়ই তুষারে আবৃত থাকে, যা উদ্যানটিতে বরফাবৃত প্রস্তর, ক্রশ-কান্ট্রি স্কি বা স্নোমোবাইলের অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্যও অসাধারণ সময় হতে পারে। পার্কটিতে মাঝে মাঝে দাবানল দেখা যায়। ১৯৮৮ সালের দাবানলে উদ্যানের এক-তৃতীয়াংশ ভস্মীভূত হয়েছিল।

বন্যপ্রাণী প্রেমীদের জন্যও ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক একটি জনপ্রিয় স্থান। পার্কটিতে বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণীরও দেখা মিলে; যার মধ্যে রয়েছে ইয়েলোস্টোন পার্ক বাইসন। এরা দলবেধে থাকে এবং পার্কের চারপাশে অবাধে ভ্রমণ করে। পার্কের অন্যান্য বন্যপ্রাণীদের মধ্যে রয়েছে ঈক, কালো ভাল্লুক, বিশেষ ধরনের নেকড়ে, প্রোঙ্গহর্ন অ্যান্টিলোপ (এক ধরণের হরিণ), বড় শিংওয়ালা ভেড়া, উইন্তা মেঠো কাঠবিড়ালি, পালকহীন ঈগল, ব্যাজার, লাল শিয়াল, গলজাতীয় পক্ষী, ছাই বর্ণের ঘুঘু ইত্যাদি।

মর্নিং গ্লোরি পুল” এবং “আর্টিস্ট পয়েন্ট” হল উদ্যানের সবচেয়ে দৃষ্টিগোচরীয় অংশ। আর্টিস্ট পয়েন্ট হলো বর্ণময় মৃত্তিকার প্রেক্ষাপটে জলপ্রপাতের অসাধারণ দৃশ্য। ঠিক যেন একজন শিল্পীর চিত্রাঙ্কনের মত মনে হয়। আর মর্নিং গ্লোরি পুল হলো ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক এর একটি উষ্ণ ফোয়ারার নাম।

পার্কের প্রখ্যাত ‘মর্নিং গ্লোরি পুল’ উষ্ণ ফোয়ারা
পার্কের প্রখ্যাত ‘মর্নিং গ্লোরি পুল’ উষ্ণ ফোয়ারা

হাইকিং এর জন্যও ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক বেশ পরিচিত। হাইকিং স্পটের মধ্যে অন্যতম হলো গ্র্যান্ট ভিলেজ এবং ওয়েস্ট থাম্ব। গ্র্যান্ট ভিলেজ ও ওয়েস্ট থাম্ব দৃষ্টিনন্দন ভ্রমণযাত্রার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী দেখার জন্য আদর্শ। এছাড়া আরো হাইকিং স্পটের মধ্যে আছে ক্যানিয়ন এরিয়া, হাওয়ার্ড ইটোন ট্রেইল, অবজার্ভেশন পীক, ক্যাসকেড লেক, গ্রীব লেক, সেভেন মাইল হোল, মাউন্ট ওয়াশবার্ন এবং ওয়াশবার্ন স্পার ট্রেইল ইত্যাদি।

স্থানীয় আমেরিকানরা ইয়েলোস্টোন অঞ্চলে প্রায় ১১,০০০ বছর ধরে বসবাস করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে লুইস ও ক্লার্ক অভিযানের সময় এই অঞ্চলটি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত পর্বতচারীরা মাঝে মাঝে এখানে এলেও, সুসংহত অভিযান শুরু হয় ১৮৬০-এর দশকে। প্রতিষ্ঠার পর উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় মার্কিন সেনাবাহিনীকে। ১৯১৭ সালে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের হাতে উদ্যানের দায়িত্বভার তুলে দেওয়া হয়। এখানকার শতাধিক স্থাপনা পুরাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে সংরক্ষিত হচ্ছে। গবেষকগণ এক হাজারটিরও বেশি প্রত্নক্ষেত্র পরীক্ষা করে দেখেছেন।

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের উষ্ণ ফোয়ারা
ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের উষ্ণ ফোয়ারা

অন্য সব যায়গার মতই এখানে ঢুকতে গেলে আপনাকে অবশ্যই টিকেট কেটে ঢুকতে হবে। সেক্ষেত্রে, ১৬ বছর ও তার উর্দ্ধে ভ্রমণার্থীদের জন্য প্রবেশমূল্য হল মাথাপিছু $১২, ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য $২৫, মোটরসাইকেল জন্য $২০, ব্যবসায়িক যানবাহনের জন্য $২০ থেকে $৩০০ পর্যন্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের ৫৯টি ন্যাশনাল পার্কে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটে৷ যারমধ্যে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান এই ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের নামও আছে। ইয়েলোস্টোন জাতীয় উদ্যান ১৯৭৮ সালে ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে ঘোষিত হয়। যদি আপনার বন্য পরিবেশ ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই আপনার এখান থেকে ঘুরে আশা উচিত।

লেখক: Pritom Pallav



error: