ইস্টার আইল্যান্ড: রহস্যময় দানবাকৃতি মূর্তির দ্বীপ

১৭২২ খ্রিস্টাব্দের ৫ এপ্রিল ডাচ নৌ সেনাপতি জ্যাকব রজারভিন আবিষ্কার করেন জনবিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ। ওইদিন ছিল ইস্টার সানডে। যার কারণে দ্বীপটির নাম দেন তিনি, ইস্টার আইল্যান্ড। স্থানীয়রা দ্বীপটিকে বলে ‘টিপিটোওটি হিনুয়া’, যার মানে দাঁড়ায় পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল। দ্বীপটি ত্রিকোণ আকৃতির আগ্নেয় শিলা দিয়ে তৈরি। আয়তন লম্বায় ২৮.৬ কিলোমিটার, চওড়ায় ১২.৩ কিলোমিটার।

জ্যাকব রজারভিন দ্বীপটিতে নেমে অবাক হয়ে যান ছড়ানো-ছিটানো শত শত মূর্তি দেখে। তার ধারণা ছিল সামুদ্রিক ঝিনুকের খোলের চুর্ণের সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের কাদার প্রলেপ দিয়ে মূর্তিগুলো তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। সব মূর্তিগুলোই নিরেট কালো আর লালচে পাথরে খোদাই করে তৈরি করা। বিভিন্ন আকৃতির মূর্তিগুলোর উচ্চতা ৩ থেকে ৩০ ফুট। এক একটা মূর্তির ওজন কয়েক টন।

রহস্যময় মূর্তির ইস্টার আইল্যান্ড

রহস্যময় মূর্তির ইস্টার আইল্যান্ড
রহস্যময় মূর্তির ইস্টার আইল্যান্ড

গবেষণা থেকে জানা যায়, দ্বীপটিতে আদিবাসীদের বসবাস থাকলেও তাদের দ্বারা ওই মূর্তি বানানো সম্ভব ছিল না। আর ইস্টার আইল্যান্ডের মূর্তিগুলোর উপাদান এবং গঠন শিল্পের সঙ্গে মিসরের পিরামিডের মিল রয়েছে। প্রায় ৭ হাজার বছর আগের পিরামিডের সঙ্গে মূর্তিগুলোর মিল সত্যি অবাক করে। রহস্যময়েই থেকে যায় ব্যাপারটা। এমনকি আধুনিক সময়েও ইস্টার দ্বীপের অদ্ভুত ভাস্কর্যের রহস্য ভেদ করা সম্ভব হয়নি। প্রশান্ত মহাসাগরের নির্জন এ দ্বীপটিতে রয়েছে অনেকগুলো ভাস্কর্য।

ইস্টার আইল্যান্ডের মোয়াই মূর্তি
ইস্টার আইল্যান্ডের মোয়াই মূর্তি

জনবিরল এই দ্বীপে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য পাথরে তৈরি ভাস্কর্য। দ্বীপের চারদিকেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য দানবাকৃতির মূর্তি। কে তৈরি করল মূর্তিগুলো? কেউ জানে না। এই জনবিরল দ্বীপে কেনইবা এসব ভাস্কর্য তৈরি করা হলো, সেটাও অজানা। ইস্টার দ্বীপের মূর্তিগুলো সবই তৈরি হয়েছে বিশাল পাথর কেটে। কিন্তু গবেষকদের প্রশ্ন- এই দ্বীপবাসীরা সেই কৌশল শিখল কিভাবে? পাথরগুলোই তারা বয়ে আনল কিভাবে এবং কোথা থেকে? এসবের উত্তর এখনো খুঁজছে বিশ্লেষকরা।

দ্বীপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ- সাতটি বৃহদাকার ভাস্কর্য। যাদের আসলে ‘নেভল অব দ্য ওয়ার্ল্ড‘ বলা হয়। মানে পৃথিবীর নাভি। দ্বীপটিতে সব মিলিয়ে প্রায় হাজারখানেক ভাস্কর্য রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায় এই ভাস্কর্যগুলোকে বলা হয় মোয়াই। দ্বীপজুড়ে মোয়াই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। একেকটি ভাস্কর্য ১২ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট। কম করে হলেও এসব একেকটি ভাস্কর্যের ওজন ২০ টনেরও বেশি। দ্বীপের সবচেয়ে বড় ভাস্কর্যটির উচ্চতা ৩২ ফুট। ওজন প্রায় ৯০ টন।

আছে পাথরে তৈরি ৮০০টি মূর্তির মাথা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মাথাটির উচ্চতা ৩২ ফুট এবং ওজন ৯০টন। এ ছাড়া ইস্টার দ্বীপে আছে ‘আহু‘ বলে পরিচিত পাথরের বিশাল বিশাল প্ল্যাটফর্ম। আছে পাথরের তৈরি বিস্ময়কর দেয়াল, পাথরের ঘর ও গুহাচিত্র। পরস্পর সঙ্গতিহীন এসব সৃষ্টি বিস্ময়কে যেন আরও বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্ব থর হেয়ারডাল প্রচুর গবেষণা ও খনন কার্যের পর তথ্য দিলেন ৩৮০ খ্রিস্টাব্দে পেরু থেকে কিছু মানুষ এসে এই দ্বীপে বসবাস শুরু করেন। তারা তৈরি করেছিল রাস্তা, মন্দির, মানমন্দির ও সুরঙ্গ পথ। আবার অনেকে মনে করেন, দ্বীপটিতে বাইরের জগৎ থেকে অভিবাসীরা বাস করে গেছে।তবে এই মূর্তিগুলোকে দেবতা মনে করে দ্বীপবাসীরা নিয়মিত পুজো দেয়। ফলে দ্বীপে ছুড়িয়ে থাকা এই মূর্তিগুলো সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে পুরো ওলন্দাজ অভিযাত্রী দলের আরো কৌতুহল বেড়ে গেলো ।

ইস্টার আইল্যান্ডের রহস্যময় দানবাকৃতি মূর্তি
ইস্টার আইল্যান্ডের রহস্যময় দানবাকৃতি মূর্তি

ইস্টার আইল্যান্ডের মূর্তিগুলো সবই তৈরি হয়েছে বিশাল পাথর কুঁদে বা কেটে। কিন্তু গবেষকদের প্রশ্ন হল এই দ্বীপ বাসীরা সেই কৌশল শিখলো কি করে? আর পাথরগুলোই তারা বয়ে আনলো কিভাবে এবং কোথা থেকে?

এ ব্যাপারে দ্বীপবাসীদের কেউ কিছু জানেনা। অথচ যুগ যুগ ধরে এই মূর্তিগুলো ইস্টারদ্বীপেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ফলে এ বিষয়টি নিয়ে অভিযাত্রী দলের সকলেই অবাক হলেন। এরপর ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে এই রহস্যের কথা ছড়িয়ে পড়লো। ইস্টার আইল্যান্ড নিয়ে শুরু হল গবেষণা। কিছু কিছু গবেষক এ ব্যাপারে তথ্য দিয়েছেন ভিন্ন ভাবে। এরই মধ্যেই আবার এই একই দ্বীপের আবিষ্কৃত হল কিছু কাঠের বোর্ড, যার ওপর লেখা আছে আশ্চর্য সব লিপি যার পাঠোদ্ধার করতে দ্বীপের মানুষেরা তো বটেই, বড়ো বড়ো পন্ডিতরা পড়তে ও অক্ষম হলেন। এগুলোর নাম দেয়া হল রং গোরগো।

লেখক: ইমরান হোসাইন ইমু

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 Shares
Share via
Copy link
Powered by Social Snap