কেটু (কে২): পৃথিবীর ২য় সর্বোচ্চ এবং অন্যতম ভয়ংকর পর্বতশৃঙ্গ

আমরা অনেকেই কেটু বা কে২ পর্বতের নাম শুনেছি। পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণী স্থানের মধ্যে একটি। কেনো আকর্ষণী? সেটার উত্তর জানতে হলে আপনাকে ধৈর্য ধরে নিচের লিখা গুলো চোখ বুজে পড়ে ফেলতে হবে (তবে চোখ বুজে না পড়লেও চলবে)।

পৃথিবীর ২য় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেটু (কে২)

পৃথিবীর ২য় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেটু (কে২)

পৃথিবীর ২য় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেটু (কে২)

কেটু বা ইংরেজিতে K2  হচ্ছে মাউন্ট এভারেস্টের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ এবং এভারেস্ট এর মতই ভয়ংকর বা তার থেকেও বেশী। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় আট হাজার ৬১১ মিটার বা প্রায় ২৮,২৫১ ফুট। হিমালয় পর্বতমালার কারাকোরাম ( চেঙ্গিস খানদের জন্য বিখ্যাত) পর্বত রেঞ্জের অন্তর্গত এই পর্বতশৃঙ্গটি পাকিস্তানের গিলগিত বালতিস্তান ও চীনের জিংজিয়ানের তাক্সকোরগান সীমান্তে অবস্থিত (Northern Pakistan Places, Photos, 750+ Placemarks! – Google Earth Community). প্রথমবারের মতো শীতকালে এভারেস্ট সফলভাবে আরোহন সম্ভব হয় ১৯৮০ সালের দিকে।

কেটু (কে২) এর অবস্থান

কেটু (কে২) এর অবস্থান

এভারেস্টে ১৯৮০ এর সাফল্য পোলিশদের ক্ষুধা যেনো আরো বাড়িয়ে দেয়। তাই তাদের পরবর্তী দৃষ্টি গিয়ে পরে এই দ্বিতীয় বৃহৎ পর্বত কে-২ এর দিকে। কে-২ অনেক উত্তরে হওয়ায় এবং ঐদিক থেকে সবচেয়ে উঁচু প্রথম পর্বত হওয়ায় উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ধেয়ে আসা সাইবেরিয়ান তুষার ঝড় প্রথম এবং জোরালোভাবে এই পর্বতে আঘাত হানায় শীতে এই ভয়ঙ্কর পর্বত হয়ে উঠে আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। মাউন্ট এভারেস্টের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ এবং এর সর্বোচ্চ উচ্চতা ২৮,২৫১ ফুট। পর্বতারোহীদের এর চূড়ায় উঠা অসম্ভব কষ্টসাধ্য হওয়ার জন্য এই কে২ কে বলা হয় বন্য পর্বত। কারাকোরাম রেঞ্জের একটি অংশ হলো এই কে২। কারাকোরাম একটি বিশাল পর্বত সীমা যা কিনা পাকিস্তান,ভারত ও চীন সীমান্ত জুড়ে বিস্তৃত হয়ে আছে। যারা কে২ এর চুড়ায় উঠতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে প্রতি ৪ জনে এক জনই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছেন। দূর্ঘটনায় মৃত্যুর সম্ভাবনা সবচাইতে বেশী এভারেষ্টের। অন্য  শৃঙ্গগুলোতে শীতের সময় যাওয়া গেলেও কে২ তে শীতে যাবার কথা চিন্তাও করা যায় না।

অভিযানের জন্য প্রয়োজন বিশাল অংকের অর্থায়নের। প্রথম দদিকে কে-২ অভিযানের খরচ ছিল ওই সময় পোলিশ অভিযাত্রীদের নাগালের বাইরে। কিন্তু ইচ্ছাশক্তি যখন দূর্দমণীয় হয় আর্থিক টানাপোড়েন কাউকে বেঁধে রাখতে পারে না এবং তাই আন্দ্রেই যাওয়াদা অর্থায়নের জন্য বিভিন্ন দিকে যোগাযোগ করা শুরু করেন। তখনকার সময়ে যেকোন পোলিশ অভিযানের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন এই যাওয়াদা। তিনিই প্রথম শীতকালে ৭০০০ মিটার উর্ধ্ব পর্বত নোশাক সামিট করেন, তিনি প্রথম শীতকালে ৮০০০ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করেন (১৯৭৪ সালে লোৎসেতে ৮২৫০ মিটার পর্যন্ত আরোহন করেন)। অর্থায়নের ব্যবস্থা হবার পর অভিযানের খুঁটিনাটি পরিকল্পনার চূড়ান্ত করতে ১৯৮৩ সালে যাওয়াদা কানাডার জ্যাক ওলেককে নিয়ে হাজির হয়ে যান পাকিস্তানে।

আরো পড়ুন:  মাউন্ট এভারেস্ট: বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ

পাকিস্তানে যাবার পর তাঁরা হতবম্ভ হয়ে যান। কারণ পাকিস্তান সরকার বিভিন্ন কারনে অনুমতি দিতে চায়না (এই পাকিস্তান সরকার বরাবরি এমন)। তারপর আবার ছিলো যোগাযোগ ব্যবস্থার অত্যন্ত জটিলতা এবং সবচেয়ে ভয়ানক ছিল খরচ এর ব্যাপারটা যোগাযোগ ব্যয় ছিলছিল অনেক বেশি। কিন্তু যাওয়াদা  মোটেও হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি দলে কয়েকজন ব্রিটিশ অভিযাত্রীকে অন্তর্ভূক্ত করার সিদ্বান্ত নেন যাতে ধনী ব্রিটিশরা অর্থ দিয়ে সাহায্য করে এবং  পৃষ্ঠপোষকতা  যোগাড়ে সুবিধা হয়। অবশেষে যাওয়াদা এবং তাঁর সঙ্গীর দীর্ঘ ৪ বছরে অনেক ত্যাগের এবং সাধনার মধুরতম ফল হিসেবেই পরিচালিত হয় এবং  ১৯৮৭-৮৮ সালের প্রথম শীতকালীন কে-২ অভিযান শুরু হয়। সেবার অভিযান হয়েছিল দক্ষিণ দিকের আবরুজ্জী রিজ নামক স্থান ধরে। পরে দেখা গেলো  মালামাল বহনের খরচ পূর্বানুমানের চেয়ে অনেক বেড়ে গিয়েছে। তাই তিনি শীতের আগেই বেসক্যাম্পে মালামাল পৌঁছে দিতে বলেন। দলটি ডিসেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানে উড়াল দেয় এবং বড়দিনে বেসক্যাম্পে পৌঁছে যায়। সেখানে তাঁদের বড়দিনের শুভেচ্ছা জানাতে উপস্থিত ছিল তীব্র তুষারপাত এবং প্রবল বাতাস। অভিযান শেষে দলের সদস্যরা জানান যে তাঁরা ৮০ দিন বেসক্যাম্পে অবস্থানকালে মাত্র দশটি পরিষ্কার দিন পেয়েছিলেন!আবহাওয়া খুবই নাজুক ছিলো। এমনতেই ছিলো আর্থিক সমস্যা,নূতন তারপর আবার চড়ম প্রতিকূল আবহাওয়া।

পৃথিবীর ২য় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেটু (কে২)

পৃথিবীর ২য় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেটু (কে২)

তারা ৬৭০০ মিটার- এ  ক্যাম্প-২ স্থাপন করে ফেলেন। এরপরই দূর্ভাগ্য তাঁদের পিছ ছাড়েনি। এর পর শুরু হয় এক দীর্ঘসময়ের প্রতিকূল আবহাওয়া। অবস্থা এমনই খারাপ ছিল যে তাঁরা ৭৩০০ মিটার উচ্চতায় তিন নম্বর ক্যাম্প  স্থাপন করতে সময় লেগে যায় মার্চের ২ তারিখ । উইলিকি এবং চিছে প্রথম পৌঁছেন এবং ৬ তারিখে তাঁদের আর তাদের পথ অনুসরণ করে রজার মেয়ার, ইয়ান ফ্রাঙ্কস গেগ্নন যান। কিন্তু সেই রাতেই প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য  শুরু হয়ে যায় তীব্র তর্জন-গর্জন করা এক হ্যারিকেন। তাঁরা দু’জনেই মারাত্মকভাবে ফ্রস্টবাইট আক্রান্ত হন,ফ্রস্টবাইট হল ফরফের ফোস্কা। অতিরিক্ত ঠান্ডায় খালি হাতে না শরীরের অন্য কোন স্থানে বরফ লাগলে সেখানে ফোস্কা পরে। এমন কি মাঝে মাঝে  সেই স্থান কেটেও ফেলা লাগে । তাঁদের অবস্থা এতোটাই খারাপ ছিল যে তাঁদের নামিয়ে আনতে অভিযান  চালাতে হয়েছিল। এরপরই ওই অভিযান আর প্রলম্বিত না করার সিদ্বান্ত নেওয়া হয়।

Sources: https://forhanzaman.wordpress.com/ & Wikipedia

লেখক: রকিব হাসান

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *