ডেথ ভ্যালি: বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান (৫৬.৭°সেলসিয়াস)

রহস্যপ্রেমী মানুষদের কাছে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালি (Death Valley) খুবই পরিচিত এক নাম। পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় এই স্থানটি একদিকে যেমন সুন্দর অন্যদিকে এটি সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান এই ধরায়। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিকেও হার মানায় ডেথ ভ্যালির তাপমাত্রা। লম্বায় প্রায় ২২৫ কিলোমিটার আর চওড়া আট থেকে চব্বিশ কিলোমিটার এই স্থানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৫৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে একজন মানুষ সব্বোচ ৪ ঘন্টা এই অঞ্চলে বেঁচে থাকতে পারে।

পশ্চিম গোলার্ধের সব থেকে শুকনো নিম্নভূমি এটি, দেখতে মানচিত্রে অনেকটা বাটির মতো মনে হয় । বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র পাঁচ সেন্টিমিটার। বুঝুন তবে কেমন এখানকার আবহাওয়া! জায়গাটির বিভিন্ন স্থানে যে সামান্য জলাশয় আছে সেটাও ভীষণ লবণাক্ত, পুরো উপত্যকাটি ধু-ধু বালুতে ভরা। পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধের সব থেকে শুকনো নিম্নভূমি এটি, বিজ্ঞানীরা বলেছেন একসময় এর অবস্থান সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২০০ ফুট নীচে ছিল। কিন্তু আর এখন এই মৃত উপত্যকার বালির স্তূপ তিনতলা দালানের সমান কোথাও কোথাও!

ডেথ ভ্যালি: বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান

ডেথ ভ্যালি: বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান
ডেথ ভ্যালি: বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান

এমন পরিবেশে খুব সামান্যই গাছ বাঁচতে পারে। এখানকার বেশির ভাগ গাছপালাই পাহাড়গুলোর নিচের অংশে এবং পাথরের গভীর খাদে জন্মায়। এ সব গাছ আবার বৃষ্টির পানিকে কাণ্ডমূলে অনেকদিন ধরে রাখতে পারে। এমনকি এরা পানির খোজে মাটির ৫০ ফুট গভীরে যেতেও বিস্তৃত হতে পারে।

এত গরমের মধ্যে দিনের বেলায় কোন প্রাণীর টিকিটাও দেখা যায় না এখানে, শুধু লিজার্ড নামক এক প্রকার গিরগিটি ছাড়া। এ ভয়াবহ রকম গরম প্রায় ১২৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা কোন প্রাণীর পক্ষে সহ্য করা সত্যিই কঠিন। কিন্তু অবলীলায় লিজার্ডরা ঘোরাফেরা করে। অন্যান্য প্রাণীরা নিজেদের এ সময় গর্তের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। সন্ধ্যা হওয়ার পরে ডেথ ভ্যালি অবশ্য বিশেষ কিছু প্রাণীর স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে। এখানকার প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে নেকড়ে, শিয়াল, ইদুর খরগোস জাতীয় প্রাণী শশক আর হাজারে হাজারে বাদুড়।

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ডেথ ভ্যালি
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ডেথ ভ্যালি

ডেথ ভ্যালিতে প্রকৃতির এক বিস্ময় স্লাইডিং স্টোন দেখা যায়। যে পাথরগুলো আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় নিজেরাই নিজেদের স্থান পরিবর্তন করে। পাথরগুলিকে অবশ্য চলমান অবস্থায় কেউ কখনো দেখেনি, তবুও পাতলা কাদার স্তরে রেখে যাওয়া ছাপ থেকে এদের স্থান পরিবর্তন নিশ্চিত হওয়া যায়। কিছু কিছু পাথরের কয়েকশ পাউন্ড পর্যন্ত ওজন হয়, এই ভারি ভারি পাথরগুলো কিভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়, সে রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি।

ক্যালিফোর্নিয়ার রেসট্র্যাক প্লায়া, ডেথ ভ্যালিতে এমন বিশ্বয়কর ঘটনাটি বিজ্ঞানীদের নজরে আসে ১৯৪৮ সালে। হঠাৎ তীব্র বাতাস, কাদামাটি, বরফ, তাপমাত্রার তারতম্যতা বিভিন্ন বিষয় পাথরের সরে যাওয়ার পেছনে কারণ বলে বিজ্ঞানীরা মনে করলেও পাথরের চলার পথের ভিন্নতার কারনে তা রহস্যই থেকে যায়। পাথর গুলোর এক একটি কয়েক বছর ধরে স্থান পরিবর্তন করে। কখনো সোজা পথে আবার কখনো বাঁকানো পথে।

এমনও হয় যে দুটি পাথর সমান্তরালে কিছুদূর পর ঠিক বিপরীত দিকে তাদের দিক পরিবর্তন করে আগের স্থানে ফিরে আসে। ১৯৫৫ সালে স্ট্যানলী প্রথমবারের মতো মত প্রকাশ করেন যে, রেসট্র্যাক প্লায়া, ডেথ ভ্যালিতে বন্যার পর সৃষ্ট বরফের কারণে পাথর স্থান পরিবর্তন করছে। বছরের কোনো কোনো সময় প্রায়া ভ্যালি ৭ সেমি পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়, এসময় সেখানে রাতের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে আসে।

স্লাইডিং স্টোন
স্লাইডিং স্টোন

১৯৭৬ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট শার্প এবং ডুইট ক্যারে, এই মতবাদে দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁরা পাথরের চলার পথের ধরন ও জ্যামিতিক বিশ্লেষণ করে একাধিক ট্র্যাকের মাঝে একটি সম্পর্ক দেখতে পান যা বরফ খণ্ডের দ্বারা ঘটা সম্ভব নয়। তাঁরা মত প্রকাশ করেন যে, বছরের নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট আবহাওয়ায় বাতাসের কারণে পাথরগুলো সরে যায় যেটি প্রতি বছর বা দুই বছর পরপর ঘটে থাকে।

আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকিংনির্ভর স্যাটেলাইট ইমেজ থেকে পাথরগুলোর স্থান পরিবর্তনের সময় গতি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা ধারণা পেলেও তাদের স্থান পরিবর্তনের রহস্য এখনো রয়েই গেছে। বিশেষ করে আপস্ট্রিমে পাথরের স্থান পরিবর্তনের সঠিক ব্যাখ্যা এখনো কেউ দিতে পারেনি। রহস্যেঘেরা ডেথ ভ্যালী দেখতে প্রতিবছর প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ সেখানে ভিড় করে, মাত্র ২ ঘন্টার জন্য!

লেখক: Pritom Pallav

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 Shares
Share via
Copy link