প্যানথিয়ন: ২০০০ বছর অক্ষত থাকা রহস্যময় মন্দির

প্যানথিয়ন বা মন্দির বা চার্চ যাই বলি না কেনো! এই প্যানথিয়নের সাথে একটি বিষয় আমাদের মনে চলে আসে, আর তাহলো প্রাচীন রোমান স্থাপত্যকলা। এর নির্মাতা, নির্মাণ কাল, বা অবস্থান বর্ণনার পূর্বে এটা বলা আবশ্যক যে এটা একটি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া শিল্প। কিভাবে একটি স্থাপত্য ২০০০ বছর অক্ষত থাকে! অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন যে মিশরের পিরামিড হাজার বছর ধরে অক্ষত আছে। কিংবা অনেকেই উল্লেখ করতে পারেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শনের কথা বা আমাদের দেশের বিভিন্ন মন্দির বা উপাসনালয়ের কথা বা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন স্থাপনার কথা যা এখনো কালের বিবর্তনে টিকে আছো কিন্তু ঐ সকল স্থাপনায় গম্বুজ নেই।

প্যানথিয়ন মন্দির (Pantheon)

প্যানথিয়নের বাহিরের দিক
প্যানথিয়নের বাহিরের দিক

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থাপনা আজ টিকে আছে কিন্তু তা ধ্বংসপ্রাপ্ত। যা শুধু নিজেদের ক্ষয়প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে আছে। মিশরের পিরামিডের কোনো ছাদ নেই। এটা একটি স্তুপ আকার কাঠামো। হয়ত পিরামিডের বিশালতা আছে কিন্তু প্যানথিয়নের মত নির্মাণশৈলীতা নেই। নেই কোনো কারুকার্য। এই প্রাচীন মন্দিরটি যদি ছাদের তৈরি হতো তবে হয়তো এর আকর্ষণ কিছুটা ম্রিয়মাণ হয়ে যেতো। কারন ফ্লাট ছাদ (আমরা যেমন আমাদের বাড়ি – ঘরে ব্যবহার করে থাকি) অনেকদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। কিন্তু প্যানথিয়নের ফ্লাট ছাদ নেই। আছে গম্বুজ যার ব্যাস আবার ৪৩.৩০ মিটার।

এটা একটি অকল্পনীয় ব্যাপার! কারণ ৪৩.৩০ ডায়ামিটার এর গম্বুজ তৈরির জন্য খুব মোটা এবং পুরু কাঠামো প্রয়োজন যা আবার কম ওজনের হবে।  মোটা-পুরু কাঠামো আবার অতিরিক্ত ভারি হবে যার জন্য গম্বুজ ভেঙ্গে পরবে। কিন্তু এই ররহস্যময় প্যানথীয়ন মন্দিরে একই সাথে ৪৩.৩০ মিটার ব্যাসের গম্বুজ ব্যাবহার করা হয়েছে,এবং তা আবার খুব পাতলা করে স্থাপন করা যাতে গ্রাভিটির টানে ভেঙ্গে না পরে এবং অনেক দিন টিকে থাকে। আর ২০০০ বছর পার হয়ে গেছে যা অক্ষত! এটা শুধু সেই সময়ের আর্কিটেকচারের জন্য চ্যালেঞ্জ না, বর্তমানের জন্যও বটে।

গম্বুজসহ প্যানথিয়ন মন্দির
গম্বুজসহ প্যানথিয়ন মন্দির

আবার প্রাচীন শিল্পকে আরো শৈল্পিক করতে তারা ছাদ থেকে মেঝের উচ্চতা করেছিলেন ৪৩.৩০ মিটার। এবং গম্বুজের মাঝে একটি ছিদ্র রাখেন যাতে উপর থেকে আলো আসে। যারা সামান্য আর্কিটেকচার বুঝে তারাই অনুধাবন করতে পারবে যে গম্বুজের উপর যদি আলো আসার জন্য ছিদ্র থাকে তবে তা  সূর্যের অবস্থানের  জন্য দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিকে আলো ফেলবে। যা একটি ইন্দ্রজাল তৈরিতে যথেষ্ট এবং প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পীগোষ্ঠী এটাই করেছিলেন।

আরো অবাক করা ব্যাপার হলো এই মন্দিরে কোন জানালা নেই, আছে শুধু কিছু ছোটো ছিদ্র যা আবার উপরের দিকে স্থাপন করা। যাতে আলো আসে উপর দিক থেকে এবং উপরের মূল গম্বুজের আলোর সাথে মিশে একটা রহস্যঘন পরিবেশ তৈরি করে। আবার এই মন্দিরের সম্মুখভাগের পিলার গুলোর কথা না বললেই নয়। এগুলো আজো ভার বহন করে টিকে আছে। যদিও গম্বুজটি পিলার বিহীন।

আবার অনেকেই মনে করেন বারবার দের হাত থেকে এটাকে স্বয়ং ঈশ্বর রক্ষা করেছে। বারবাররা এটার কিছুই করতে পারেনি। এটা প্রাথমিক ভাবে খ্রিষ্টীয় উপাসনালয় ছিলো না। ৬০৯ সালের দিকে এটাকে খ্রিষ্টীয় উপাসনালয় এর পরিণত করা হয়। এই মন্দির দুই বার নির্মাণ করা হয়েছিলো, কিন্তু দ্বিতীয় বার আগের কাঠামোতে তা নির্মাণ করা হয়েছিলো কিনা তা নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান। এমনকি এই প্যানথিয়ন মন্দিরের কাঠামো বর্তমান যুগের কাঠামোর সাথে অনেকাংশে মিলে যায়,যা আজো আমাদের অবাক করে। কি ভাবে ২০০০ বছর আগেকার মানুষ বর্তমান যুগের স্থাপত্যকলার ব্যবহার করতে পারে। এই মন্দিরই একমাত্র কাঠামো যা সেই যুগের সকল কাঠামোর মধ্যে সেরা এবং সেই সময়কার অন্যান্য কাঠামো সময়ের গর্ভে বিলীন হলে এটা সময় কে অবজ্ঞা করে নিজ মহিমাময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

লেখক: রকিব হাসান



error: