মাউন্ট রাশমোর ন্যাশনাল মেমোরিয়াল: মার্কিন রাষ্ট্রপতিদের মূর্তিযুক্ত পাহাড়

পৃথিবীর ইতিহাসে যত মনুষ্য নির্মিত স্থাপনা আছে তার মধ্যে মাউন্ট রাশমোর ন্যাশনাল মেমোরিয়াল অন্যতম। সংক্ষেপে মাউন্ট রাশমোর বলেই ডাকা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের কিস্টোনে অবস্থিত গ্রানাইট পাথরের পাহাড় কেটে কেটে এই মনুমেন্ট তৈরি করা হয়েছে। এই ভাস্কর্য কেনো এত বিখ্যাত তা জানতে হলে সবার আগে জানতে হবে এখানে যারা আছেন তাদের পরিচয়। এই চার জনের পরিচয় জানার পরই বুঝতে পারবেন এটা কেনো বিখ্যাত।

মাউন্ট রাশমোর ন্যাশনাল মেমোরিয়াল

চারজন বিখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রপতির আবক্ষমূর্তি
চারজন বিখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রপতির আবক্ষমূর্তি

এখানে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকৃত যে চারজন বিখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রপতির আবক্ষমূর্তি (শুধু মাত্র বুক পর্যন্ত) স্থান পেয়েছে তাঁরা হলেন প্রথমেই জর্জ ওয়াশিংটন (১৭৩২-১৭৯৯)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি। তিনি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে কন্টিনেন্টাল আর্জির সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনেন। তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রধান বলে উল্লেখ করা হয় এবং তিনি তার জীবদ্দশায় এবং এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতির জনক হিসেবে পরিচিত।

টমাস জেফারসন (১৭৪৩-১৮২৬) ছিলেন একাধারে এক জন মার্কিন রাজনীতিবিদ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি এবং একজন রাজনৈতিক দার্শনিক। তিনি সমর্থন করতেন ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের এবং মনে করতেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ হওয়া উচিৎ।

থিওডোর রুজভেল্ট (১৮৫৮-১৯১৯)। তিনি হলেন যুক্তরাষ্ট্রে ৩২তম রাষ্ট্রপতি। তিনি জাতিসংঘের প্রস্তাবক ছিলেন,যা এখনো নিজ দায়িত্ব পালন করে চলেছে (?) ফ্রাঙ্কলিন ডিলেনো রুজভেল্ট আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রিয় ও প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি অন্য পার্টির কাছেও প্রিয়ভাজন ছিলেন। তিনি তাঁর জাতিকে গভীর বিষাদ থেকে বের করে আশাবাদ এবং সংকল্পের দিকে ফিরিয়ে আনেন। তিনি ছিলেন একাধারে প্রকৃতিবিদ, উদ্ভাবক এবং রাজনিতীবিদ। যুক্তরাষ্ট্রের তিনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি তিন তিন বার প্রেসিডেন্সি দায়িত্ব পালন করেছেন।

আব্রাহাম লিংকন (১৮০৯-১৮৬৫)। আর আমরা আব্রাহাম লিংকনের ব্যপারেত অনেক কিছুই জানি। তিনি ছিলেন দাস প্রথার বিরোধী এবং আধুনিক গণতন্ত্রবাদী এক জন। তিনিই যুক্তরাষ্ট্র কে যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করে শান্তি আনেন।

মাউন্ট রাশমোর ন্যাশনাল মেমোরিয়াল
মাউন্ট রাশমোর ন্যাশনাল মেমোরিয়াল

আর এই ভাস্করটি নির্মাণ করেন গাটজন বর্গলাম। এটার উচ্চতা হলো ৬০-ফুট বা ১৮ মিটার। এই প্রেসিডেন্সিয়াল ভাস্কর্য দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ১৩০ বছরের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এবং এখানে স্থান পেয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এর ইতিহাসের লেজেন্ড। সম্পূর্ণ মেমোরিয়ালটির ক্ষেত্রফল প্রায় ১,২৭৮.৪৫ একর (প্রতি একর হলো তিন বিঘার সমান) এবং এটি  ১৭৪৫ মি. উঁচুতে অবস্থিত। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অফ দি ইন্টেরিয়রের আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। এই মনুমেন্ট এত তাই বিখ্যাত যে প্রতিবছর প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ এই মেমোরিয়াল পরিদর্শন করেতে আছেন।

বোর্গলাম বিভিন্ন কারণে মাউন্ট রাশমোরকে এই কাজের জন্য উপযুক্ত সাইট হিসেবে মনোনীত করেন। এবং কি কি কারণ ছিলো তা আমরা দেখার চেষ্টা করি। প্রথমেই বলতে। যে শিলা দ্বারা এই পর্বতটি গঠিত তা মসৃণ, ও মানসম্পন্ন গ্র্যানাইটের তৈরি আর গ্রানাইট ছাড়া এটা সম্ভব ছিলো না। গ্রানাইট লাইম স্টোনের মত ক্ষয়প্রাপ্ত হবার হার কম। প্রতি ১০,০০০ বছরে এটি মাত্র ১ ইঞ্চি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ভাবে সাম্রাজ্যবাদীই নীতি শুরু করেছে তাতে মনে হয় এটা আর ২ ইঞ্চি ক্ষয়ের সুযোগ পাবেনা)।

সে যাই হোক, এর ফলে এটি নিশ্চিত হয় যে, ভাস্কর্যটি কে ভালভাবেই ভিত্তিমূলে দৃঢ় করা হয়েছে। এছাড়া এটি ঐ এলাকার সবচেয়ে উচ্চতম পর্বত  যার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫৭২৫ ফুট। আর আরেকটি কৌশল এখানে ব্যবহার করা হয়েছে আর তাহলো,  পর্বতটি যেহেতু দক্ষিণপূর্ব দিকে মুখ করে আছে, তাই দিনে বেশিরভাগ সময় এটি সূর্যালোক পায়।

মাউন্ট রাশমোরের দর্শনার্থী
মাউন্ট রাশমোরের দর্শনার্থী

এই মাউন্ট রাশমোর আমেরিকার পর্যটন ক্ষাতে ব্যাপক অবদান রাখে। যেমন বেশী সূর্যালোক মানে বেশী পর্যটক আর বেশী পর্যটক মানে বেশী অর্থ। প্রতিদিন গড়ে এক ঘন্টায় ১০০ পর্যটক বেশী আসলে তা বছরে ৩৬৫০০ তে দাঁড়ায়। এটি পর্যটন সাউথ ডাকোটার দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্প এবং সবচেয়ে বেশি পর্যটকের আকর্ষণ। ২০০৪ সালে ২০ লক্ষেরও বেশি পর্যটক মাউন্ট রাশমোর প্রদর্শন করেছেন (Fite, Gilbert C. Mount Rushmore (May 2003)।

এই বিশালাকার  ভাস্কর্য তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯২৭ সালে এবং এটি শেষ হয় সুদীর্ঘ ১৪ বছর পর অর্থাৎ  ১৯৪১ সালে। যদিও এটি তৈরির সময় কিছু মানুষ দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির স্বীকার হয়েছিলো কিন্তু সৌভাগ্যবশত  কেউ মারা যায় নি।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 Shares
Share via
Copy link