ল্যুভর মিউজিয়াম: প্যারিসের বিখ্যাত এবং শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক ল্যুভর মিউজিয়াম

বাংলায় ‌‌‘জাদুঘর’ কথাটি আরবি আজায়বর বা আজায়বানা শব্দটির সঙ্গে তুলনীয়। বাংলায় এই জাদুঘর কথাটির অর্থ হলো, ‘যে গৃহে অদ্ভুত অদ্ভুত পদার্থসমূহের সংগ্রহ আছে, এবং যা দ্যাখে মন্ত্রমুগ্ধ হতে হয়।’ এর আরেক অর্থ ‘যে ঘরে নানা অত্যাশ্চর্য জিনিস বা প্রাচীন জিনিস সংরক্ষিত থাকে।’ ইংরেজি ‘Museum’ (মিউজিয়াম) শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ থেকে। ইংরেজি বহুবচনে এই শব্দের রূপটি হল ‘Museums’ (বা অপ্রচলিত শব্দ ‘Musea’)। শব্দটির মূল উৎস গ্রিক শব্দ (Mouseion); যার অর্থ গ্রিক পুরাণের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক মিউজদের মন্দির। এই তো গেল জাদুঘরের ব্যাপার। আজ আপনাদেরকে অসাধারণ সুন্দর এবং বিশ্বসেরা জাদুঘরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিব।

ল্যুভর মিউজিয়াম

ল্যুভর মিউজিয়াম

ল্যুভর মিউজিয়াম

প্যারিসকে বলা হয় ‘অর্ধেক নগরী তুমি অর্ধেক কল্পনা’। এই কল্পনার রাজ্যেই রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য জাদুঘর ল্যুভর। ল্যুভর ছাড়াও অবশ্য আরও কিছু বিখ্যাত জাদুঘর ফ্রান্সে রয়েছে। পৃথিবীর বিখ্যাত জাদুঘরগুলোর মধ্যে প্রথমে নাম বলতে গেলে বলতেই হয় ল্যুভরের কথা। এটি এক সময় দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এক সময় ল্যুভর ফ্রান্সের রাজ প্রাসাদ হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বর্তমানে এই জাদুঘরটির সামনে কাঁচের তৈরি পিরামিড বসিয়ে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। তবে এর ইতিহাস কিন্তু এতে একটুও বদলে যায়নি। এই জাদুঘরে প্রাচীন সভ্যতার শুরু থেকে আধুনিক সভ্যতার অনেক কিছুই রাখা আছে। এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসটি কিন্তু বেশ দীর্ঘ। বিভিন্ন রাজা-রাজরার শাসন কাল পেরিয়ে ষোড়শ লুই একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুসারে ১৭৯৩ সালে তিনি এই জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন।

আরো পড়ুন:  নুশোয়ানসেই দুর্গ: সত্যিকারের "স্লিপিং বিউটি" রাজপ্রাসাদ

প্যারিসের সিন নদীর তীরে অবস্থিত এ বিশাল স্থাপনা আজকের সমকালে এক মহাকালের ধারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। প্যারিস শহরটা গড়ে উঠেছে সিন নদীর তীর ঘেঁষে। অনেকটা উত্তর-দক্ষিণে আড়াআড়িভাবে অবস্থিত এ নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে ল্যুভর। ১২০০ সালে নির্মিত যে ভবনকে ঘিরে এটি প্রথমে গড়ে ওঠে তা ছিল ফরাসি সম্রাট দ্বিতীয় ফিলিপের রাজকীয় দুর্গ ও প্রাসাদ। শিল্প সংগ্রহশালা হিসেবে ল্যুভরের সার্বিক নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হতে সময় লাগে মোট ২০০ বছর। ল্যুভর হচ্ছে নানা ভবনের এক বিশাল সমাহার। ১৫৪৬ সালে এর পশ্চিম দিকের ভবনের কাজ শুরু হয় সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিসের নির্দেশে। শুরুতে এতে কেবল বিভিন্ন রাজকীয় দ্রব্যসামগ্রী প্রদর্শনের জন্য রাখা হতো।

১৯ শতকের পূর্বের ৩৫,০০০ দর্শনীয় বস্তু নিয়ে গঠিত ল্যুভর মিউজিয়াম ৬,৫২,৩০০ বর্গফুট জায়গা নিয়ে অবস্থিত। ১২ শতকে জাদুঘর স্থানে ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ একটি দূর্গ নির্মাণ করেন। যা পরবর্তীতে ল্যুভর প্রাসাদ হিসেবে রুপান্তরিত করে জাদুঘর তৈরী করা হয়। তবে পূর্বের দূর্গটির কিছু অংশ এখনও দৃশ্যমান। ল্যুভর প্রাসাদটি বিভিন্ন সময়ে বর্ধিত করা হয়েছে। ১৬৮২ সালে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইস তাঁর বাসস্থান ল্যুভর হতে ভার্সাইলস প্রাসাদে স্থানান্তর করেন। এরপর হতে ল্যুভর  প্রাসাদকে প্রাথমিকভাবে রাজকীয় সংগ্রহশালা দর্শনালয় হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৬৯২ সালে এখানে একটি প্রাচীন ভাস্কর্য সংগ্রহ করে আনা হয়। ঐ বছর দালানটি সংরক্ষণের দায়িত্ব কাব্যশাস্ত্র ও লিপি শিক্ষালয় এবং রাজকীয় অঙ্কন ও ভাস্কর্য শিক্ষালয়ের যৌথ পরিষদের উপর ন্যস্ত হয়। ১৬৯৯ সালে জাদুঘরটিতে যৌথ পরিষদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যৌথ পরিষদটি ১০০ বছর বিদ্যমান ছিল।

বুর্জ খলিফা: বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য
#FactsBD #Burj #Khalifa #বুর্জ #খলিফা

Posted by FactsBD on Friday, February 16, 2018

ফরাসি বিপ্লবের সময় ফরাসি জাতীয় পরিষদ, জাতীয় সেরা শিল্প কর্মগুলো প্রদর্শনের জন্য লুভর প্রাসাদকে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহারের জন্য ফরমান জারি করে। ১০ আগষ্ট ১৭৯৩ সালে ৫৩৭ টি শিল্পকর্ম প্রদর্শনের মাধ্যমে ল্যুভর জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়। তখন শিল্পকর্মগুলোর অধিকাংশ ছিল রাজকীয় এবং চার্চের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি। গঠনপ্রণালীতে সমস্যা থাকায় ১৭৯৬ হতে ১৮০১ সাল পর্যন্ত জাদুঘরটি বন্ধ থাকে। ফ্রান্সের সম্রাট প্রথম নেপোলিয়ন জাদুঘরটির পরিবর্তিন নাম দেন “নোপোলিয়ন জাদুঘর“। সেইসাথে জাদুঘরটির সংগ্রহশালা বৃদ্ধি করেন। ওয়াটারলু যুদ্ধে নেপোলিয়ন পরাজিত হতে তাঁর সৈন্যগণ জাদুঘরটির অনেক শিল্পকর্ম দখল করে সেগুলো মূল মালিকের কাছে ফেরত প্রদান করে। রাজা অষ্টাদশ লুইস ও রাজা দশম চার্লদসের শাসনকালে জাদুঘরটির সংগ্রহ আবার বৃদ্ধি করা হয়। পরবর্তীকালে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ব্যতিত বিভিন্ন সময়ে দান অথবা উপহারের মাধ্যমে সংগ্রহ আস্তে আস্তে বৃদ্ধি করা হয়। জাদুঘরটির সংগ্রহশালা আটটি ভাগে বিভক্ত – মিশরীয় পুরাতত্ত্ব; নিকট প্রাচ্য পুরাতত্ত্ব; গ্রিক, এট্রাস্কান ও রোমান পুরাতত্ত্ব; ইসলামিক শিল্পকলা; ভাস্কর্য; সজ্জা সংক্রান্ত শিল্প; অঙ্কনশিল্প এবং ছাপা শিল্প। এখানেই রয়েছে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি’র অংকিত সেই পৃথিবীখ্যাত চিত্র “মোনালিসা”।

ল্যুভর মিউজিয়ামে দর্শনার্থী

ল্যুভর মিউজিয়ামে দর্শনার্থী

ল্যুভর এর পুরো বিল্ডিংটাকে মিউজিয়াম বানাতে প্রায় ২০০ বছর লেগে গিয়েছিলো। ইতালি, মিশর ও পরবর্তীতে নেপোলিয়নের প্রচারাভিযানের সময় জাদুঘরের অনেক কাজ লুট করা হয়েছিল আমেরিকান স্থপতি আই.এম. পেইয়ের গ্লাস পিরামি আজ ল্যুভরের প্রতীক হিসাবে দ্যাখা যায়, কিন্তু এটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে, তখন কিছু সমালোচক এই ঐতিহাসিক প্রাসাদের স্থাপত্য নিরস্ত্রীকরণের সাথে তাল মিলিয়েছিলেন। মোনালিসা ছবিটা যেই ঘরে রাখা আছে, সেই ঘরেই ল্যুভর এর সবচেয়ে বড় ছবিটা রয়েছে, কিন্তু অনেকেই সেটা খেয়াল করেন না। বিল্ডিং ডিজাইনে তেমন কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি।

ল্যুভরের সেই রহস্যময়ী নারীর অজানা কিছু কথা বলব আজ। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা আজও আমাদের কাছে রহস্যময়।

১। আপনি কী জানেন মোনালিসা নামটি আসলে ভুল থেকে হয়েছে? ছবিটির আসলে নাম “মোন্না লিসা”। মোনা হলো ইটালিয়ান নাম ম্যাডোনা এর সংক্ষিপ্ত রুপ। মোন্না লিসার অর্থ হল “মাই লেডি”।

ল্যুভর মিউজিয়ামে মোনালিসার চিত্র

ল্যুভর মিউজিয়ামে মোনালিসার চিত্র

২। মেয়েটির পরিচয় নিয়ে বির্তকের শেষ নেই। কেউ কেউ মনে করেন এই ছবিটি লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি নিজেকে ভেবে এঁকেছিলেন। অর্থাৎ এটি লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির মহিলারুপ। আবার কেউ কেউ মনে করেন ছবির আসল মহিলা হলেন ২৪ বছর বয়সি লিসা ডিল জিওকোনডো যার দুটি ছেলে আছে।

৩। ছবিটি নিখুঁত নয়। ১৯৫৬ সালে ইগো আনগেজ নামক এক ব্যক্তি কোনও এক অজানা কারণে ছবিটিতে একটি পাথর ছুঁড়ে মারেন। যার কারণে মোনা লিসার শরীরের অল্প কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যায়। ভালো করে লক্ষ্য করলে দ্যাখা যাবে যে, ছবির মেয়েটির কুনইয়ের নিচের দিকের রংয়ে কিছুটা তালি লাগানো আছে।

৪। এই চিত্রকর্মটি অমূল্য তাই চুরি হওয়ার ভয় থাকলেও এর কোনো বীমা করা হয়নি!

৫। মোনালিসা চিত্রকর্মের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তার কোনো ভ্রু নেই। এই ভ্রু না থাকা নিয়ে প্রচলিত একটি  কারণ হলো, মোনালিসা শুরুতে ভ্রু আঁকা ছিল, কিন্তু ছবিটি সংরক্ষণ করার সময় জাদুঘরের কর্তৃপক্ষের অসাবধানতার কারণে ছবি থেকে ভ্রু মুছে গেছে! এই বিষয়ে আরো একটি ব্যাখ্যা হচ্ছে- মনে করা হয় লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি ইচ্ছাকৃতভাবে এই ছবিটি অসম্পূর্ণ রেখেছেন।

৬। ল্যুভর মিউজিয়ামের বিশেষ একটি ঘরে এই চিত্রকর্মটি রাখা হয়েছে। একটি বুলেট প্রুফ গ্লাসের আড়ালে এই চিত্রকর্মটি রাখা আছে। শুধু তাই নয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ দ্বারা এই চিত্রকর্মটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আর এরজন্য মিউজিয়ামে খরচ হয়েছে প্রায় ৭ মিলিয়ন ডলার!

৮। বিভিন্ন গবেষণায় দ্যাখা গেছে মূল ছবিটি আঁকার আগে আরো তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ছবি শিল্পী এঁকেছিলেন। আর প্রতিবারই ছবিটির ধরণ ছিল আলাদা আলাদা।

৯। ছবিতে মোনালিসাকে গর্ভবতী মনে করা হয়। তিনি একটি চেয়ারে বসে হাত দিয়ে পেট ঢাকার চেষ্টা করছেন। আর এই থেকে ধারণা করা হয় মোনালিসা গর্ভবতী। মজার বিষয় হলো লিসা ডিল জিওকোনডো গর্ভবতী ছিলেন যখন এই ছবিটি আঁকা হয়!

লেখক: Imran Hossain Emu

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *