শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ: বিশ্বের অন্যতম সুন্দর মসজিদ

সংযুক্ত আরব আমিরাত বললেই চোখে ভেসে উঠে দৃষ্টিনন্দন মসজিদের প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি মসজিদ যেন নয়নাভিরাম অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা। আধুনিক নির্মাণশৈলী আর প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিটি মসজিদ যেন এক একটি সৌন্দর্যের উৎস। তাই দেশটির আবুধাবি, আল আইন, দুবাই, শারজাহ, আজমান, ফুজিরা, রাস আল খাইমাসহ প্রতিটি প্রদেশের মনোমুগ্ধকর সুন্দর মসজিদগুলো দেখার জন্য দেশ বিদেশের পর্যটকরাও ভিড় জমান।

শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ

শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ
শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ

অপরূপ সৌন্দর্যের আবুধাবির শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ (Sheikh Zayed Grand Mosque) আরব আমিরাতের সর্ববৃহৎ এবং পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম এবং সুন্দরতম মসজিদ। ১০৭ মিটার উঁচু চার মিনার বিশিষ্ট মসজিদটি আমিরাতের জনক শেখ জায়েদ বিন আল নাহিয়ানের নাম অনুসারে নামকরণ করা হয়। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কার্পেট (৫৬২৭ বর্গমিটার) এবং সর্ববৃহৎ ঝাড়বাতি (১০ মিটার ব্যাস এবং ১৫ মিটার উচু) বিশিষ্ট মসজিদটির আঙিনা ১৭ হাজার বর্গমিটারের মার্বেল মোজাইকও পৃথিবীর সর্ববৃহৎ চওড়া মার্বেল মোজাইক বলে স্বীকৃত।

মসজিদটির ভেতরে বাইরে চোখ ধাঁধানো মোজাইকে গড়া কারুকাজ দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি সুন্দর এ মসজিদের অত্যাধুনিক ফিটিংসের শৌচাগার ও ওজুখানাগুলো। মূল মসজিদ থেকে অল্প দূরে সুদৃশ্য ওজুখানায় রয়েছে গরম ও ঠাণ্ডা পানির বিশেষ ব্যবস্থাও। মসজিদের চতুর্দিকে যেমন রয়েছে মনোরম পরিবেশের সবুজের সমারোহে ঘেরা গাড়ির পার্কিং, তেমনি মসজিদের চতুরদিকের বেজমেন্টেও সুদৃশ্য ও সুবিন্যস্ত আধুনিক গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা।

ছোট বড় সাত আকারের ৮২টি গম্বুজ বিশিষ্ট শ্বেত মার্বেলে নির্মিত মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন পৃথিবীর নানা দেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে আসেন। রমজানে তারাবির নামাজসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য যেমন ধর্মপ্রাণ নারী পুরুষ মুসল্লিরা এ মসজিদে আসেন, তেমনি এ মসজিদের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে বাংলাদেশি প্রবাসীসহ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার পর্যটকও প্রতিদিন এখানে আসেন। মসজিদটি দেখতে আমিরাতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকেও আসেন স্থানীয় আরব ও প্রবাসীরা।

শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ এর সৌন্দর্য
শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ এর সৌন্দর্য

জুম্মা আর ঈদের নামাজে মানুষের উপচে পড়া ভিড় আর রমজানের গণ-ইফতার পার্টির জমায়েত না দেখলে বোঝাই যায় না কত মানুষ এখানে নামাজ পড়তে, ইফতার করতে ও দেখতে আসেন। নারীদের জন্য রয়েছে নামাজের আলাদা ব্যবস্থা। মসজিদ আঙিনায় অন্য ধর্মাবলম্বী নারীদের প্রবেশে বাধা থাকলেও বোরকা পরে মসজিদের আঙিনাসহ ভেতরে মসজিদের অপরূপ কারুকাজ ও সৌন্দর্য দেখতে যাওয়াতে আপত্তি নেই তাদের। মসজিদটির পাশেই আমিরাতের জনক শেখ জায়েদ বিন আল নাহিয়ানের মাজার। যা দেখতেও পর্যটকরা ভিড় করেন। প্রতিদিন শত শত প্রবাসী বাংলাদেশিসহ হাজার হাজার পর্যটক তাঁর মাজার জেয়ারত করেন।

প্রতিবছর রমজান মাসে এ মসজিদ প্রাঙ্গণে ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়। পহেলা রমজান থেকে ৩০ রমজান পর্যন্ত মাসব্যাপী এখানে গণ-ইফতারের আয়োজন সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। পবিত্র মাহে রমজানের গণ-ইফতার পার্টিতে যোগ দিতে ও তারাবির নামাজ আদায় করতে আমিরাতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ছুটে আসেন এ মসজিদে। ইফতার পার্টিতে প্রতিদিন হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশিসহ নানা দেশের ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজারের বেশি প্রবাসী শরিক হন। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ইফতারের সুবিধার জন্য বিশাল আকারের শীতাতাপনিয়ন্ত্রিত প্যান্ডেল নির্মাণ করা হয়। এ বছরও ১০টি প্যান্ডেল বা তাঁবু নির্মাণ করা হয়েছে।

এখানে মূলত জুমার নামাজ ও দুই ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। একসঙ্গে ৪০ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করার কথা থাকলেও দুই ঈদে এক থেকে দেড় লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজারের অধিক বাংলাদেশি। মসজিদের তিনটি প্রার্থনাকক্ষ রয়েছে। প্রধান প্রার্থনাকক্ষ ছাড়া বাকি দুটি ছোট কক্ষ। এর একটি কক্ষ নারীদের জন্য।

প্রতি বছরই পর্যটকদের ভিড়ে থাকে মুখরিত। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ এটি। অন্য পর্যটকদের সঙ্গে এখানে সমাবেত হয় বাংলাদেশি দর্শনার্থীরাও। সপ্তাহের ছয় দিন কর্মব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেলেও এই মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য শুক্রবারের অপেক্ষা সবার। সকাল আটটা থেকে সমবেত হতে থাকে মুসল্লি­রা। কেউ কেউ এর আগেও এসে হাজির হন। কারণ, মসজিদের ভেতর নামাজ আদায়ের জায়গা পূর্ণ হয়ে যায় অনেক আগে। এতে বেশির ভাগ আমিরাতে শেখ ও নাগরিক। দেরিতে পৌঁছালে মাঠেও জায়গা পাওয়া দুষ্কর। তাই সকাল থেকে মুসল্লিদের ঢল নামে এখানে। শুক্রবার জুমার নামাজ আদায়ের জন্য এখানে সমবেত হয় ন্যূনতম ১০ হাজার বাংলাদেশি। এ যেন পরবাসে বাংলার মিলনমেলা।

উপর থেকে শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ
উপর থেকে শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ

সকল ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষের জন্য খোলা এই মসজিদটি ২০০৭ সালে উদ্বোধন করা হয়। বার্তাসংস্থা বিবিসির এক সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবছর নানা ধর্মের ১০ লাখেরও বেশি দর্শনার্থী আসেন এ মসজিদে। মসজিদের প্রদর্শক লায়লা আহমেদ জানান, ‘ইহুদি-খ্রিস্টান বা যে কেউ হন না কেন, এখানে সবাইকে স্বাগত জানানো হয়। এ মজিদের এটাই বিশেষত্ব।’

ছোট-বড় সব মিলিয়ে মোট ৭ আকারের ৮২টি গম্বুজ বিশিষ্ট শ্বেত মার্বেলে নির্মিত এই মসজিদটিতে রমজানে তারাবির নামাজসহ পাচঁ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য যেমন ধর্মপ্রাণ নারী পুরুষ মুসল্লীদের আগমন ঘটে, তেমনি মসজিদের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে জন্য বাংলাদেশের শত শত প্রবাসীসহ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে প্রতিদিন।

বিশাল উঠান এবং জলাধারকে ঘিরে রাখা সব থাম আর খিলানের মনোহর এই চত্বর এতই বড় যে, একত্রে ৩০ হাজার মানুষ সমবেত হতে পারবে এখানে। মসজিদের কেন্দ্রীয় চত্বরের নকশা তৈরী করা হয় মরক্কোর বাদশাহ দ্বিতীয় হাসান মসজিদ এবং পাকিস্তানের বাদশাহি মসজিদের শৈলী দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে। চত্বরের চার কোণায় রয়েছে ১০৭ মিটার উচ্চতার চারটি মিনার। যেগুলোর নিচের ভাগ মিসরীয় মামলুক ধারার চৌকো আকৃতির, মধ্যভাগ উত্তর আফ্রিকার ফাতিমি আমলের ষড়ভুজ আকৃতির এবং ওপরের ভাগ তুরস্কের উসমানীয় আমলের গোলাকৃতির।

মসজিদে প্রতিদিন লাখো মুসল্লিকে নামাজ পড়ান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতে আসা হাফেজ-ইমামগণ। প্রতিটি মসজিদে আবার ইমামের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন একজন করে মুয়াজ্জিন।

শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ
শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদ

মজার এবং গৌরবের ব্যাপার হচ্ছে, এই ইমামদের তালিকায় বাংলাদেশিদের অবস্থান কম হলেও মুয়াজ্জিন হিসেবে আমিরাতের প্রায় ৭০ ভাগ মসজিদে দায়িত্ব পালন করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। মুয়াজ্জিন হলেও তারা পান ইমামের মর্যাদা। এমনকি ইমাম পেশা রেখেই ভিসা ইস্যু করা হয় তাদের। এমনটাই জানান স্থানীয় বিভিন্ন মসজিদে দায়িত্বরত বাংলাদেশি ইমাম-মুয়াজ্জিনরা।

লেখক: Imran Hossain Emu

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

22 Shares
Share via
Copy link