পিসার হেলানো টাওয়ার: গ্যালিলিওর সেই বিখ্যাত বাঁকানো টাওয়ার

কোনও ভবনকে কি ধাক্কা মেরে ভেঙে ফেলা বা বাঁকা করে ফেলা সম্ভব? মোটেও না। তা হয়তো কল্পনায় বা কোনও প্রাক্তন মন্ত্রীর কথায় সম্ভব হতে পারে। বেশ কিছুদিন আগে পত্রিকায় আমি একটা বাঁকা বাসা দেখে আঁতকে উঠেছিলাম। বাসাটার লোকেশন ঠিক মনে পড়ছে না। সম্ভবত গুলিস্তানেই হবে। কিছুক্ষণ পত্রিকার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে ভাবছিলাম, পিসার হেলানো টাওয়ারের স্যাম্পল কি এখন গুলিস্তানেও পাওয়া যাচ্ছে নাকি? বাহ! বাঙালি কোনও দিক থেকেই পিছিয়ে নেই – ভেবে মনে এক অকৃত্রিম বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে, এই বাসাটা ভূমিকম্পে বাঁকা হয়ে গেছে। তার উপর মানুষ খুব ভয় ভয় চোখে দালানটাকে দেখছে এবং সেখান থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বও বজায় রাখছে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি। অথচ পিসার বাঁকা টাওয়ারটা দেখতে চোখেমুখে মুগ্ধতা নিয়ে মানুষ কত দূর দূরান্ত থেকে ছুটে যায়। কিছুটা হতাশ লাগল। প্রকৃতি আমাদের কম দিচ্ছে না।হয়তো কোনও একদিন আমরাও আশ্চর্যজনক কিছু বানিয়েও ফেলতে পারি। অসম্ভব হবে কেন?

পিসার হেলানো টাওয়ার

পিসার হেলানো টাওয়ার
পিসার হেলানো টাওয়ার

আমাদের কি হাইস্কুলের বিজ্ঞান বইটার কথা মনে আছে? সেখানে গ্যালিলিওর দোলন সংক্রান্ত কিছু সূত্র ছিল। ‘বায়ুশূন্য অবস্থান থেকে ভিন্ন ভিন্ন ভরের পড়ন্ত বস্তুর গতিবেগ সমান’। মনে পড়েছে?  ধারণা করা হয় যে, বিখ্যাত ইতালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও তার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা পর্যবেক্ষণের জন্য হেলানো টাওয়ারটি ব্যবহার করেছিলেন। টাওয়ারের মাঝের ছাদ থেকে ঝুলে থাকা এক ঝাড়বাতি দেখে গ্যালিলিও তার বিখ্যাত দোলন সূত্রগুলোর কথা প্রথম চিন্তা করেন বলেও জানা যায়। বলা হয়ে থাকে, গ্যালিলিও তার এক বিখ্যাত সূত্র ‘বায়ুশূন্য পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন ভরের পড়ন্ত বস্তুর গতিবেগ সমান‘ প্রমাণের জন্য এই টাওয়ারটি বেছে নিয়েছিলেন।

গ্যালিলিওর সেই বিখ্যাত টাওয়ার
গ্যালিলিওর সেই বিখ্যাত টাওয়ার

গিনি ও পালকের পরীক্ষার একটি অংশ তিনি দুটি ভিন্ন ভিন্ন ভরের কামানের গোলার সাহায্যে হাতে কলমে পরীক্ষা করেছিলেন পিসার টাওয়ার থেকেই। কিন্তু এর কোনও বিশ্বস্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মূলত এই কাহিনীটি সূচনা করেছিলেন গ্যালিলিওর এক ছাত্র ও তার সহকারী ভিনসেনজিও ভিভিয়ানি। এই ভিভিয়ানী তার গুরু গ্যালিলিওর আত্মজীবনী লিখেছিলেন। তিনি গ্যালিলিওর শেষ জীবনে গুরুর সাথে থাকতেন এবং তাকে পড়ে শোনাতেন।

সুক্ষ্ম কারুকার্যময় টাওয়ারের সারি সারি কলাম আর একের পর এক খিলান উঠে গেছে চক্রাকারে। ২৯৪টি সিঁড়ি রয়েছে টাওয়ারটিতে। দর্শকরা সেই খিলানের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে ভাবতেই পারেন – “এই সেই স্থাপত্য, যেটা একদা বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর চরণস্পর্শ পেয়েছিল!” অথচ ব্যাপারটা সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে ইতিহাসেই।

পিসার হেলানো টাওয়ারের নামকরণ

এবার এর নামকরণ নিয়ে কিছু বলা যাক। পিসা টাওয়ার বা পিসার হেলানো টাওয়ার যাকে ইতালীয় ভাষায় বলা হয় Torre di Pisa অথবা Torre pendente di Pisa। ইতালির পিসা প্রদেশের অবস্থিত তাই হয়ত এই নামকরন।

ভূমি থেকে আটতলা বিশিষ্ট এ টাওয়ারের উচ্চতা প্রায় ৫৬ মিটার। এর সর্বমোট ওজন প্রায় ১৪,৫০০ টন। বর্তমানে এটি প্রায় ৩.৯৯ ডিগ্রী কোণে হেলে রয়েছে। এর ২৯৪টি সিঁড়ি আছে।

পিসার হেলানো টাওয়ারটি হেলে পড়ার কারন

১১৭৮ সালে তৃতীয় তলা নির্মাণের পর টাওয়ারটি হেলতে শুরু করে। নরম মাটিতে এটি মাত্র তিন মিটার গভীরতায় এর ভিত্তি গড়ে তোলাই এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ভুলটি একটা ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। ভুল থেকে যে সপ্ত আশ্চর্য সৃষ্টি করা যায়, তাই বলেই হয়তো বেঁচে থাকাটা আনন্দের। এছাড়াও টাওয়ারের নকশাও এর জন্যে দায়ী। তিন তলা পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর বিশেষজ্ঞরা দ্যাখতে পান, টাওয়ারটির নির্মাণ কৌশলে ভুল ছিল। টাওয়ারের নীচের নরম মাটি ও অগভীর ভিত এই অস্বাভাবিক হেলে পড়ার জন্যে দায়ী বলেও ধারণা করা হয়। অদ্ভুত উপায়ে সেই হেলানো অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে রইল টাওয়ারটি, ভেঙেও পড়লো না। স্থপতিরাও হাল ছেড়ে না দিয়ে হেলে যাওয়ার মধ্যেই গড়তে থাকেন একের পর এক তলা।

পিসার হেলানো টাওয়ারটি হেলে পড়ার কারন
পিসার হেলানো টাওয়ারটি হেলে পড়ার কারন

বিজ্ঞানীদের নানা চিন্তা-ভাবনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণার মধ্যে চেষ্টা চলতে লাগলো কীভাবে আশ্চর্য এই স্থাপত্যকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, ফিরিয়ে দেওয়া যায় তার প্রারম্ভিক অবস্থান। অবশেষে ১৯৯৮ সালে এসে একটি উপায় খুঁজে পেলেন প্রকৌশলীরা। ২০০১ সালে প্রকৌশলীরা এক বিশেষ কাঠামোর মধ্য দিয়ে এই স্থাপনার নিচের আলগা মাটি সরিয়ে নেন। পাশাপাশি বিশাল পরিমাণ ওজনদার বস্তু হেলে পড়ার উল্টো দিকে চাপিয়ে দেয়া হয়। এতে রক্ষা পায় টাওয়ারটি।

বর্তমানে টাওয়ারটির হেলে পড়া বন্ধ হয়েছে এবং ৪০ সেন্টিমিটারেরও বেশি হেলানো অবস্থা থেকে সোজা অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে কয়েকশ বছর ধরে হেলে পড়তে পড়তে এখনও প্রায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ৯৯ ডিগ্রি কোণে হেলে আছে টাওয়ারটি। আর এটাই নাকি হেলানো টাওয়ারের স্বাভাবিক অবস্থা!

ঐতিহ্যবাহী সেন্ট রানিয়েরিস ইলুমিনেশনস উৎসব উপলক্ষে প্রতি বছরই পিসা টাওয়ারকে সাজানো হয় চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দিত আলোকসজ্জায়। পিসা টাওয়ারটিকে ঘিরে এত ব্যাপকভাবে উৎসব-আনন্দ হলেও গবেষকরা মনে করছেন, তৎপরতার সঙ্গে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আগামী ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পিসা টাওয়ারটি অবশ্যই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

অবাক হবার মতো বিষয় হলো, দর্শনার্থী গণ ছবি উঠাবার সময় বিশেষ একটি স্থান বেছে নেন, যাতে ছবি উঠাবার পরে দেখে মনে হয়, কাঁত হয়ে পড়া টাওয়ারটি হাত দিয়ে ধরে, পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করছেন । সেখানে উপস্থিত দর্শকরা এই বিশেষ স্টাইলে ছবি উঠাবার জন্য যেন পাগল হয়ে উঠেন । যুবক বৃদ্ধ নারী পুরুষ সবাই টাওয়ার থেকে শত ফুট দুরে দাঁড়িয়ে দু’হাত উঁচিয়ে আছেন, সে এক অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি! বাদ নেই বিখ্যাতরাও। গতবছর সপরিবারে পিসার টাওয়ার দর্শনে যান বলিউড সুপারস্টার আমির খান।

লেখক: Imran Hossain Emu



error: