পেত্রা নগরী: একটি প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক পাথুরে নগরীর কাহিনী

পেত্রা নগরী: ঐতিহাসিক পাথুরে নগরী

পেত্রা নগরী: ঐতিহাসিক পাথুরে নগরী

আমাদের পৃথিবী কতটা প্রাচীন, সেইটা ঠিকভাবে বলা যায় না। পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যকার সভ্যতা তৈরি হয়েছে। কোন কিছুই রাতারাতি হয় নি। অনেক সভ্যতা যেমন গড়ে উঠেছে, ঠিক তেমনি অনেক সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে। অনেক কিছু ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু তাও কি মানুষ থেমে আছে? না, কেওই আমরা থেমে নেই। আমরা সৃষ্টি করছি, ধ্বংস ও করছি প্রয়োজনে। অনেক প্রাচীন নিদর্শন এখনো রয়ে গেছে, যা দেখলে আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই সব দিনের কথা, সেই সব সভ্যতার কথা, সেই সব মানুষদের কথা যারা এইসব তৈরি করেছিলো। আজকে আমরা কথা বলবো, এমনি একটি অতি প্রাচীন নগরী সম্পর্কে।

পেত্রা নগরী: ঐতিহাসিক পাথুরে নগরী

পেত্রা নগরী (Petra), একটি প্রাচীন আরব শহর। ধারনা করা হয় এটি প্রায় দুই হাজার বছর পুরনো। তখন আরবে অনেক জাতী ছিলো, তার মধ্যে একটি হলো নাবাতিয়ান। এই নাবাতিয়ান জাতির রাজধানী ছিলো পেত্রা শহর। এখান দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক রাস্তা গিয়েছিলো। শহরটি মূলত সেই বাণিজ্য পথকে কেন্দ্র করেই বানানো হয়েছিলো। পথের যাত্রীদের নির্ভর করে শহরটি হয়ে উঠেছিলো রমরমা।

পেত্রা নগরীতে ঢোকার রাস্তা

পেত্রা নগরীতে ঢোকার রাস্তা

পেত্রা নগরী ছিল সুরক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। পেত্রা নগরী মূলত একটি সুরক্ষিত দুর্গ ছিলো। এটি বিখ্যাত সাধারনত এর অসাধারন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভগুলোর জন্য। শহরটি তৈরি করা হয়েছিলো পাথর কেটে ডিজাইন করে। অনেক গুহা আছে এই নগরীর আনাচে কানাচে। আসলে এই গুহা গুলোই চলাচল করার রাস্তা। গুহার পাশেই রয়েছে কঠিন পাথরের দেয়ালের গায়ে গ্রথিত সেই প্রাচীন দালানগুলো। যার মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত হলো “খাজনেত ফিরাউন” নামক মন্দিরটি। মন্দিরটি ফারাওদের ধনভাণ্ডার নামেও পরিচিত। এখানে আরও একটি অর্ধ-গোলাকৃতির নাট্যশালা আছে, যা ৩০০০ দর্শক ধারন করতে পারে। তাছাড়া মরুভূমির উপর দিয়ে পারস্য উপসাগরে যাওয়ার প্রধান সব বাণিজ্যিক পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো এই পেত্রা নগর।

আরো পড়ুন:  ডেড সি বা মৃত সাগর: বিস্ময়কর যে সাগরে কেউ ডুবে না

রোমানরা শুধুমাত্র স্থল পথেই না সমুদ্র পথেও বাণিজ্য শুরু করেছিলো। যার ফলে পেত্রা ধ্বংস হওয়া শুরু হয়। তারপর রোমানরা পেত্রা দখন করে নেয় এবং তাদের “আরব পেত্রাইয়া” প্রদেশের অংশ করে নেয়। তারপর কিছুকাল পেত্রায় উন্নতি হয়। কিন্তু “পামিরা শহরের” লোকজন পেত্রার অধিকাংশ বাণিজ্য দখল করে নেয়। ফলে পেত্রায় গুরুত্ব কমতে শুরু করে। তার অনেক পরে মুসলমানেরা পেত্রা দখলে নিতে সক্ষম হয়। আর অবশেষে ক্রুসেডাররা এটিকে দখলে নিয়ে নিলে এটিকে একেবারে ধ্বংস করে ফেলে। তাছাড়া ৩৬৩ সালে এক ভূমিকম্পে ধ্বংস করে দেয় এর দালানগুলো, নষ্ট করে দেয় সব কিছু। শুধু পরে থাকে একটা ধ্বংস হয়ে যাওয়া নগরী, তার প্রায় সব কিছুই নষ্ট হয়েছে। ভেঙ্গে গেছে অনেক সুন্দর আর গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মাটিতে মিশে গেছে কত ধন দৌলত। যার হিসেব খুঁজে পাওয়া মনে হয় আজও সম্ভব না।

পেত্রা

পেত্রা নগরী

পেত্রা নগরী খুঁজে বের করেছিলো বারখাট। সুইচ পরিব্রাজক “জোহান লুডিগ বারখাট”। ১৮১২ সালে বারখাট পেত্রা নগরী খোঁজার জন্য বেড়িয়ে পরে। কিন্তু পেত্রা নগরী যে ঠিক কোন জায়গায় আছে তার সঠিক হুদিস তার কাছে ছিলো না। আর সব থেকে বড় কথা, যে জায়গায় অনুমান করা হয়েছিলো যে এখানে পেত্রা থাকতে পারে সেখানে যাওয়ার জন্য লোকাল গাইডের প্রয়োজন হতো। কিন্তু সে তো ঐ অঞ্চলের ছিলো না যে অনায়াসে যেতে পারবে। তাছাড়া ধরা পরলে গুপ্তচর বলে জেলেও পাঠাতে পারে। অনেক ভাবার পর বারখাট একটা অভিনব বুদ্ধি বের করলো। সে নিজের দাড়ি বড় করতে শুরু করলেন। যাতে তাকে দেখতে স্থানীয়দের মতন মনে হয়। তারপর সে অনায়াসে গাইড পেয়ে গেলেন, আর শুরু করলেন পেত্রা উদ্দেশ্যে যাত্রা।

দিনের পর দিন হেঁটে যেতে লাগলো তারা। তারপর একদিন তারা মরুভূমি থেকে দেখতো পেলো একটি গিরিখাত। সেই গিরিখাতের দুই পাশে উঁচু উঁচু সব পাহাড়, মাঝ দিয়ে রাস্তা। সেখান দিয়ে হাঁটতে এক সময় বারখাটের চোখে পরলো একটা পাথরের ভবন। তা দেখেই বারখাট বুঝে গেলো তারা এসে পরেছে পেত্রা, আর খুঁজে পেয়েছে সে ইতিহাসে বিলীন হয়ে যাওয়া সেই নগরটিকে। তিনি ফিরে এলেন আর ফিরে এসেই বিশ্ববাসীকে জানানেল তার আবিষ্কারের কথা। কিন্তু মরুভূমির ঠিক কোন জায়গায় সেই গিরিখাত, কোন জায়গায় সেই ভবন আর কোন জায়গায় ই বা সেই নগরী তার কোনটাই সঠিকভাবে বলতে পারলো না বারখাট।

পেত্রা নগরীর সাধুসংঘের আবাসস্থল

পেত্রা নগরীর সাধুসংঘের আবাসস্থল

কিন্তু বারখাট এর পর দুই ফরাসী “লিনো বেলফুঁ” এবং “লিউন দ্য ল্যাবঘদের” ১৮২৮ সালে তারা শহরটির অনেক স্কেচ তৈরি করেন। পরে সেগুলো একত্রে করে প্রকাশ করা হয়। তারপর থেকেই সকল মানুষ জানা শুরু করলো পেত্রা নগর সম্পর্কে। পৃথিবীর অসংখ্য পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এই পাথুরে নগরী পেত্রা। জন উইলিয়াম বার্গান তার “নিউডিগেট” পুরষ্কার বিজয়ী বিখ্যাত এক সনেটে এই পেত্রা নগরীকে বর্ণনা করে লিখেছেন, “A rose-red city half as old as time”. পেত্রা সংস্কৃতি, সম্পদ, ঐতিহ্যে আর ক্ষমতায় কতটা যে উন্নত ছিলো তার প্রমাণ পাওয়া যায় এর ধ্বংসাবশেষ দেখেই। ইউনেস্কো একে “ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট” ঘোষণা করেছে ১৯৮৫ সালে। ঘোষণায় পেত্রাকে বলা হয়, “One of the most precious cultural properties of man’s cultural heritage”.

বর্তমান জর্ডানের দক্ষিণ-পশ্চিমের গ্রাম ওয়াদি মুসা’র ঠিক পূর্বে হুর পাহাড়ের পাদদেশে এর অবস্থান। যদি সময় আর সুযোগ হাতে পান তাহলে ঘুরে আসতে পারেন এই পেত্রা নগরী থেকে। হয়তো আপনার জন্যই এখনো টিকে আছে এই হাজার বছরের পুরনো শহরটি।

লেখক: Pritom Pallav

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *