মাউন্ট ভিসুভিয়াস: ইতালি তথা বিশ্বের অন্যতম জীবন্ত আগ্নেয়গিরি

আগ্নেয়গিরি হলো এমন এক রকম পাহাড় যার ভেতর থেকে মাটির গভীরে থাকা উত্তপ্ত ও গলিত পাথর, ছাই এবং গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে যে কোন সময়। আর বেরিয়ে আসা এই সব গ্যাস বা ছাই বা গলিত পাথর ঠান্ডা হয়েই এই পাহাড় তৈরি করে। আর সেই গলিত আর গরম পদার্থের নির্গমনকে বলা হয় “অগ্ন্যুৎপাত” আর যেই পদার্থ গুলো বের হয় তাকে বলা হয় “লাভা”। যে সকল এলাকায় আগ্নেয়গিরি রয়েছে সেখানে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সব কিছু জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে এক নিমিষেই। আর এমনই একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি হল ইতালির মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি।

মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি

মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি
মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি

মাউন্ট ভিসুভিয়াস” ইতালির নেপলস উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি আগ্নেয়গিরি, নেপলস থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার পূর্বে সমূদ্র উপকুলের খুব কাছেই এর অবস্থান। এটি এমন এক আগ্নেয়গিরি যা বিগত কয়েক শতাব্দীতে কয়েকবার অগ্ন্যুৎপাত করেছে। তবে বর্তমানে এটি থেকে কোন অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে না। কিন্তু যে কোন সময় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ইতালিতে শুধু মাউন্ট ভিসুভিয়াস ছাড়াও এতনা ও স্ট্রমবোলি নামে আরো দুইটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৭৯ অব্দে রোমানে “পম্পেই” এবং “হারকিউলানিয়াম” নামে দুইটি শহর ছিলো। যা তৎকালীন লাভার নিচে চাপা পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। সেই থেকেই মাউন্ট ভিসুভিয়াস এর নাম সামনে আসে। কিন্তু যেই শহরগুলো চাপা পড়ে যায় লাভার কারনে তা আর পূর্নঃনির্মান করা হয়নি। ধারনা করা হয়, যেখানে সেই লাভার হাত থেকে কিছু মানুষ বেঁচে যায়। আর সেই শহরগুলোতে যাও অবশিষ্ট থাকার কথা তাও লুটেরারা সেখান থেকে প্রচুর জিনিসপত্র সংগ্রহ করেছিলো। কালের বিবর্তনে সেই শহরগুলোর কথা সকলেই ভুলে যায়।

মাউন্ট ভিসুভিয়াসের খ্রিষ্টপূর্ব ৭৯ অব্দের অগ্ন্যুৎপাত
মাউন্ট ভিসুভিয়াসের খ্রিষ্টপূর্ব ৭৯ অব্দের অগ্ন্যুৎপাত

ভিসুভিয়াসের একটা ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যিক ঐতিহ্য আছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৯ অব্দের অগ্ন্যুৎপাতের সময় এটিকে দৈত্যের মতন বিবেচনা করা হতো। পম্পেই শহরে টিকে যাওয়া অনেক গৃহ-মন্দিরের বা lararia ভেতরে ভিসুভিয়াস নামটি সাপ হিসেবে খোদাইকৃত অবস্থানে পাওয়া গেছে। ক্যাপুরা থেকে পাওয়া একটি শিলালিপি থেকে জানা গেছে যে, এটিকে আগে জুপিটারের একটি শক্তি হিসেবে উপাসনা করা হতো; মানে “জুপিটার ভিসুভিয়াস”।

ঐতিহাসিক ডিওডোরাস সিকিউলাস এর মতে হারকিউলিস তার দায়িত্বগুলো পালন করার জন্য সিসিলি যাবার পথে পাশের কিউমে দেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল এবং সেখানে একটি স্থানের সন্ধান পায় যার নাম “The Phlegraean Plain” বা “Plain of Fire”. এমন একটি পাহাড় যা প্রাচীনকালে আগুন উগড়ে দিতো। এখন আমরা তাকে মাউন্ট ভিসুভিয়াস নামে চিনি। পৌরাণিক কাহিনী মতে, এই জায়গাটিতে তখন দস্যুদের আস্তানা ছিলো। তারা ছিলো পৃথিবীর মানুষ ই কিন্তু দেখতে দৈত্যাকৃতির। দেবতাদের সহায়তায় হারকিউলিস এই এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

মাউন্ট ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাত
মাউন্ট ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাত

বর্তমানে এটিকে পৃথিবীর সব থেকে ভয়ংকর আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। কেননা এর আশেপাশের এলাকায় প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ বসবাস করছে। আর সব থেকে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এটির বিষ্ফোরনের মতন অগ্ন্যুৎপাতের প্রবণতা আছে। এটিকে তাই পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল আগ্ন্যুৎপাতপ্রবন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি আগ্নেয়গিরি কয়েকশ বছর ঘুমন্ত অবস্থায় থাকতে পারে। তারপর হটাৎ একদিন সক্রিয় হয়ে উঠে। তবে সক্রিয় হওয়ার কিছু লক্ষণ পূর্বেই দেখা যায়। ভিসুভিয়াসের সব শেষ অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিলো ১৯৪৪ সালে। এতে মারা গিয়েছিলো প্রায় ২৭ জন এবং গৃহহীন হয়েছিলো অনেক মানুষ।

অগ্ন্যুৎপাত আসলেই একটা রহস্য। এর অনেক রহস্য উদঘাটন হয়েছে আবার অনেকটাই বাকি আছে। তবে বিজ্ঞানীরা কবে নাগাদ অগ্ন্যুৎপাত সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে পারবে আমরা তা জানি না। কিন্তু যদি তারা সেই সকল সঠিক তথ্য দিতে পারে (অনুমান নির্ভর না) যে, কবে নাগাদ কোন আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে তাহলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমে যাবে।

লেখক: Pritom Pallav



error: