স্ট্যাচু অব লিবার্টি: সাম্য, স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

উপহার হিসেবে একজন আরেকজনকে কি দিতে পারে? বই, শার্ট, শাড়ি, ট্যুরের টিকিট, মোবাইল, ক্যামেরা, গাড়ি, সবশেষে বাড়ি – এরচে’ও দামী আর কি হতে পারে? ফুটবল তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তাঁর এক বন্ধুর বিয়েতে উপহার হিসেবে আস্ত একটা দ্বীপই দিয়ে দিয়েছিলেন! এইতো গেল গতবছরের ঘটনা। কিন্তু আজ থেকে আরও ১৩২ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৮৬ সালে ফ্রান্স আমেরিকাকে আস্ত একটি সুউচ্চ ভাস্কর্য উপহার দিয়েছিল। যেনতেন ভাস্কর্য নয়, দামী, উঁচু এবং ঐতিহাসিক। যার উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটি বর্তমানে সাম্য, স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রতীক হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্টের নিউয়র্ক পোতাশ্রয়ের মুখে বেডলো দ্বীপে হাডসন নদীর মুখে, যেখানে নিউয়র্কের সকল জাহাজ নোঙর করে। আর বর্তমানে এই দ্বীপটির নাম রাখা হয়েছে ‘লিবার্টি’। যাকে আমরা ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি‘ নামেই চিনি।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

ঢিলেঢালা সবুজাভ রঙের উড়ন্ত গাউন পড়ে থাকা এক নারীর অবয়ব ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’। মাথায় সূচালো কাঁটাওয়ালা মুকুট; যা কিনা সাতটি মহাদেশ ও সাত সমুদ্রের প্রতীক। ভাস্কর্যটির বাম হাতে রয়েছে একটি বই (বইটি সম্ভবত আইনের বই), যাতে রোমান সংখ্যায় খোদাই করে লেখা রয়েছে, ‍‌আমেরিকার স্বাধীনতার দিনক্ষণ “৪ জুলাই, ১৭৭৬ সাল”। ডান হাতে উঁচিয়ে ধরা একটি মশাল। পায়ে পড়ে থাকা ছেঁড়া শেকল, মুক্তির কথা বলছে। এই ভাস্কর্যটি সাম্য, স্বাধীনতা এবং মুক্তির প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

ডান হাতে ধরে রাখা মশাল পর্যন্ত মূল ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি। তবে মাটি থেকে যদি মাপা হয় বেদিসহ ভাস্কর্যটির পুরো উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। আমেরিকার ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসেস এই ভাস্কর্যটির রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির পরিচিতি ছিল ‘লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে। পরে এটির নাম বদলে ফেলা হয়। রাখা হয়, ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’।

মারিনা বে’র বাইরের আবরণটা খুঁচিয়ে তুলে ফেলো। পেয়ে যাবে চীনা, মালয়, ভারতীয় আর পাশ্চাত্য রীতিনীতির এক অদ্ভুত মিশেল। আর…

Posted by FactsBD on Monday, March 12, 2018

আইফেল টাওয়ারের স্থপতি ইঞ্চিনিয়ার আলেকজান্ডার গুস্তাভ আইফেল তখন স্ট্যাচু অব লিবার্টির নকশা করেন। ফ্রেডরিক আগাস্টে বারথোল্ডির সাথে মিলে তিনি এই অসাধারণ ভাস্কর্যটি নির্মাণে কাজ করেন। নির্মাণ শেষ করতে প্রায় ২ বছর ফরাসি ও আমেরিকান ভাস্কররা কাজ করেছেন। পুরু পেটানো তামার পাত এবং লোহার ফ্রেমের উপর দাঁড় করানো ভাস্কর্যটিকে, ৩০০ খন্ডে তৈরি করা হয়। ১৮৮৪ সালে জুন মাসে কাজ শেষ হলে ফ্রান্সের প্যারিসে তা সংরক্ষণ করে রাখা হয়। পরে ১৮৮৫ সালে বিভিন্ন অংশ খুলে ২১৪টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় পাঠানো হয়। প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড ১৮৮৬ সালের ২৮শে অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন ভাস্কর্যটির।

নির্মানাধীন স্ট্যাচু অব লিবার্টি

নির্মানাধীন স্ট্যাচু অব লিবার্টি

ভাস্কর্যটির বেদি তৈরির অর্থ জোগাড়ে ভূমিকা রেখেছেন বিখ্যাত পত্রিকা প্রকাশক জোসেফ পুলিৎজার

স্ট্যাচু অব লিবার্টি নিয়ে কিছু অজানা তথ্য

  • ফ্রেঞ্চ ভাস্কর অগাস্টাস বার্থোলডি স্ট্যাচু অব লিবার্টির ডিজাইন করেন।
  • এটি বানাতে ফ্রান্সের খরচ হয় আড়াই লাখ ডলার।
  • মূর্তিটিকে যে স্থাপনার ওপর বসাতে হয়েছে, তা বানাতেও আমেরিকা খরচ করে ২ লাখ ৭৫ হাজার ডলার।
  • এই স্থাপনার অনেকটা অংশ বানানো হয় সাধারণ জনগণের পয়সায়।
  • এই মূর্তি সব সময় কিন্তু ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ নামে পরিচিত ছিল না। ১৯২৪ সাল পর্যন্ত একে ‘লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে ডাকা হতো।
  • এই মূর্তি বসানোর পর আশপাশের অন্যান্য শহরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
  • তামা ধাতু দিয়ে এর বাইরের অংশ তৈরি করা হয়। এর ঘনত্ব মাত্র ২.৫ মিলিমিটার।
  • এ মূর্তির রং সব সময় এমন ছিল না। আসলে এটি অনেকটা মরচে পড়া লোহার মতোই দ্যাখা যেত।
  • এর অভ্যন্তরীণ কাঠামো ডিজাইন করেন গুস্তাভ আইফেল।
  • প্রচণ্ড বাতাসে স্ট্যাচুটি কয়েক ইঞ্চি পর্যন্ত দুলতে থাকে।
  • এর ডানহাতে অর্থাৎ যে হাতটি মশাল ধরে রয়েছে তার ভেতরে ৪২ ফুট লম্বা মই রয়েছে। পরিচর্যার জন্যে এই মই বেয়ে উঠতে হয়।
  • পরিচর্যার জন্য প্রকৌশলীরা মূর্তিটির ডানপায়ের নিচ দিয়ে প্রবেশ করেন। ওটাই এর প্রবেশদ্বার।
আরো পড়ুন:  বুর্জ খলিফা: বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন সম্পর্কে জানা অজানা তথ্য

সবশেষে একটা মন খারাপ করা সংবাদ। এত ঐতিহ্যবাহী ভাস্কর্যটিও আশংকার পথে। ঝড়ঝঞ্ঝা আর বৃষ্টিতে তামার তৈরি স্ট্যাচু অব লিবার্টির উপরিভাগের ব্রোঞ্জের প্রলেপ শতবর্ষেই সবুজাভ হয়ে গেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে তামায় কার্বন জমা হয়। স্বাভাবিক বৃষ্টির পানিও তামার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে। এভাবে জল এবং ধাতুর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই সবুজাভ রঙের সৃষ্টি হয়েছে। আর বাতাস এই ক্ষয়ের গতিকে ত্বরান্বিত করে।

১৯৩৭ সালে প্রথমবারের মতো স্ট্যাচু অব লিবার্টির বড় ধরনের সংস্কারকাজ করা হয় আবহাওয়াজনিত ক্ষয় থেকে একে রক্ষা করার জন্য। এর ভেতরে পানি চুঁইয়ে পড়া এবং অন্যান্য ক্ষতি ঠেকানো হয়েছিল তখন। তবে কালের পরিক্রমায় এই ধাতব স্থাপত্যটি একদিন নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। যাতে এটি রক্ষার কোনো চেষ্টাই কাজে আসবে না।

১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল তিন বছর এবং ২০১১ থেকে ২০১২ সাল দুই বছর ধরে স্ট্যাচু অব লিবার্টির সংস্কার করা হয়। আর এই সংস্কার আরও কতোবার করা যাবে -সেটাই ভাবনার বিষয়।

লেখক: Imran Hossain Emu

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *