ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ বিবর: মহাবিশ্বের এক রহস্যময় অঞ্চল

মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য নিয়ে আমাদের আগ্রহের কোন কমতি নেই, বরং যতই সময় সামনে এগোচ্ছে; আমরা আমাদের সৃষ্টির গূঢ় রহস্য জানতে ততই উদগ্রীব হচ্ছি। যত জানছি, আমাদের কৌতূহল তত বাড়ছে। ব্ল্যাক হোল, যাকে বাংলায় আমরা কৃষ্ণ বিবর নামেও ডেকে থাকি – সম্ভবত আমাদের সে আগ্রহের সবচেয়ে কৌতূহল জাগানিয়া আবার একই সাথে বিতর্কিত এক বিষয়ের নাম।

ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ বিবর কি?

ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ বিবর

নাম ব্ল্যাক হোল (Black Hole) হলেও, আদতে নামের সাথে এর কোন মিল নেই। ব্ল্যাক হোল আমাদের মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও তার প্রকৃতি সম্পর্কিত একটি বহুল প্রচলিত ধারণা মাত্র। এই ধারণা অনুযায়ী ব্ল্যাক হোল মহাবিশ্বের এমন একটি বস্তু বা জায়গার নাম যা আয়তনে খুবই অল্প কিন্তু এর বা সে জায়গায় ভর এতি বেশি যে ব্ল্যাক হোলের নিজস্ব  মহাকর্ষীয় শক্তি কোন কিছুকেই তার ভিতর থেকে বাহিরে বের হতে দেয় না, এমনকি কোন তাড়িতচৌম্বক বিকিরণকেও যেমন: আলো কেও নয়। প্রকৃতপক্ষে এর বা এইস্থানের সাধারণ মহাকর্ষীয় বলের মান এত বেশি যে এটি মহাবিশ্বের অন্য সকল বলকে অতিক্রম করে। ফলে এ থেকে কোন কিছুই বের হয়ে আসতে পারে না, বলা যায় এক বিশাল অন্ধকার কুপে যেন সব হারিয়ে যায় নিমিষে।

বলে রাখা ভালো, এ মহাবিশ্বের যেকোন দুটি বস্তুর মধ্যে যে আকর্ষন, তাকেই আমরা মহাকর্ষীয় শক্তি নামে চিনি। প্রতিটি গ্যালাক্সির অসংখ্য জায়গায় কমবেশি ব্ল্যাকহোলের উপস্থিতির কথা বিজ্ঞানীরা আমাদের জানিয়েছেন, এবং সংখ্যায় সেটা প্রায় ১০০ মিলিয়ন হতে পারে বলে তাঁরা ইঙ্গিত দিয়েছেন! অবাক করবার বিষয় হল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি সেকেন্ডে একটি করে ব্ল্যাকহোল তৈরি হচ্ছে। সাধারণত বেশীরভাগ গ্যালাক্সিই তার মাঝখানের ব্ল্যাক হোলকে কেন্দ্র করে ঘুরছে বলে তারা মনে করেন।

ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণ

ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণ এতই বেশী যে এর বলয় থেকে থেকে কোন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ যেমনঃ আলো, এক্সরে, অবলোহিত রশ্মি কিছুই বের হয়ে আসতে পারে না। এজন্যই ব্ল্যাক হোলকে আমরা দেখি না। বিজ্ঞানীরা তাই ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণা করার সময় খেয়াল করেন কোন ব্ল্যাক হোল তার আশপাশকে কিভাবে প্রভাবিত করছে। যখন কোন ব্ল্যাক হোল কোন নক্ষত্রবলয়ের কাছে দিয়ে যায়, সে তার নিজের দিকে আশপাশের পরিবেশ বা বিষয়ে আকর্ষণ করে নিজের ভেতরে গুটিয়ে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করে। একে এক্রিশান বলে।

যখন কোন সাধারন নক্ষত্র ব্ল্যাক হোলের কাছে দিয়ে যায়, তখনও একই ব্যাপার ঘটে। এক্ষেত্রে ব্ল্যাক হোলের নিজের ভেতরকার আকর্ষণ শক্তি সে নক্ষত্রকে ভেতরে টেনে নিয়ে আসতে পারে। নক্ষত্র যতই ব্ল্যাক হোলের দিকে যেতে থাকে, সে ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠে, ক্রমাগত নিজের শক্তি বিকিরণ করে, যা মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আমাদের জানিয়েছেন, যখন এই শক্তিশালী গামারশ্মির বিকিরণ হয়, সেটা আশেপাশের কিছু নতুন তারার সৃষ্টিতেও প্রভাব ফেলে।

সূর্য থেকে কমপক্ষে দশগুণ বড় নক্ষত্র নিঃশেষ হয়ে একসময় অতি ক্ষুদ্র কালো বিন্দুতে পরিণত হয়। এধরণের ব্ল্যাক হোলকে নাম দেয়া হয়েছে স্টেলার মেস, বেশীরভাগ ব্ল্যাকহোলই স্টেলারমেস প্রকৃতির। কিন্তু নক্ষত্রের সঙ্কুচিত হয়ে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হলেও ব্ল্যাকহোলে সে নক্ষত্রের ভর আর অভিকর্ষ টান একই থাকে। আরেক ধরণের ব্ল্যাক হোল বলা হয় সুপারমেসিভ  ব্ল্যাক হোল। এরা এক বিলিয়ন তারার ভরের সমানও হতে পারে। সুপারমেসিভ জাতীয় ব্ল্যাক হোল কোন গ্যালাক্সির মিলিয়ন বা বিলিয়ন তারাকে একত্রে ধরে রাখে। আমাদের গ্যালাক্সিতেও বিজ্ঞানীরা একটি একটি সুপার মেসিভ ব্ল্যাক হোলের সন্ধান পেয়েছেন। এর নাম Sagittarius A*।

ব্ল্যাক হোল এলো কি করে?

ব্ল্যাক হোল এলো কি করে?

আচ্ছা ব্ল্যাক হোল এলো কি করে? বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, কোন তারা যখন নিঃশেষ হয়ে যায়, তখনই মূলত সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে নতুন একটি ব্ল্যাক হোলের জন্ম হয়।. সূর্য থেকে প্রায় ৩ গুন বেশী ভরের কোন তারা যখন খসে যায়, তাত্ত্বিকভাবে আমরা তখন বলতে পারি কোন মহাকর্ষীয় শক্তি আর তখন সে তারাকে ধরে রাখতে পারে না। যখন তারা ক্রমাগত নিঃশেষ হয়ে একটা কাল্পনিক মহাশূন্য তলের কাছে আসে(ইভেন্ট হোরাইজন), অনেক দূরে যে বিজ্ঞানীরা সে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন, তাদের থেকে সে তারার সময় ধীর হয়ে যায়। একসময় সে তারার সময় থমকে দাড়ায় আর তারাটি ব্ল্যাক হোলে একটি আবদ্ধ বস্তুতে পরিনত হয়।

ব্ল্যাক হোল কি পৃথিবীকে গ্রাস করবে?

একসময় আশংকা করা হত, সূর্য কি তবে একদিন নিজেই ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে –পৃথিবীকে গ্রাস করবে? নাসার বিজ্ঞানিরা এ আশংকা উড়িয়ে দিয়েছেন। কারন, সূর্য নিজে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়ে পৃথিবীকে গ্রাস করতে চাইলে ব্ল্যাক হোলের কক্ষপথকে সৌরজগতের অনেক কাছে আসতে হবে। যেটা আসলে অবাস্তব। কারন, যদি কোনভাবে কোন ব্ল্যাক হোল আর সূর্যের ভর সমান হয়ে যায়, সেক্ষেত্রেও সূর্যের আকর্ষণ বল সমান থাকবে। ফলে প্রিথইবিয়াপন গতিতেই এখানকার মত নিজের বলয়ে প্রদক্ষিঙ্করতে থাকবে, ব্ল্যাক হোলের ফাদে নিজেকে আটকে যেতে দিবে না।

Exposition Du Systeme Du Monde বই

বিপুল পরিমাণ ভর বিশিষ্ট কোন বস্তু বা স্থান, যার মহাকর্ষ আকর্ষণে কোন আলোকতরঙ্গ পর্যন্ত বের হতে পারে না – এমন ধারণা সর্বপ্রথম দিয়েছিলেন ভূতত্ত্ববিদ জন মিচেল। ১৭৮৩ সালে একটি চিঠিতে  তিনি বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেন্ডিসকে এ সম্পর্কে নিজের পর্যবেক্ষণ জানান। ১৭৯৬ সালে গণিতবিদ পিয়েরে ল্যাপলেসও তাঁর ‘Exposition Du Systeme Du Monde’ বইয়ে একই ধরনের ধারণা সম্পর্কে  লিখেন। তবে সেসময় বেশীরভাগ বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। আলোর মতো ভরহীন একটি তরঙ্গ কিভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে সেটা নিয়ে তাদের পরিস্কার ধারণা ছিল না।অনেকদিন ধরে চলা বিভিন্ন ধারণাগুলোকে এক জায়গায় এনে, পদার্থবিদ জন হুইলার ১৯৬৭ সালে প্রথম এই ধারণাকে ‘ব্ল্যাক হোল’ নামকরণ করেন।

২০১৬ সালের ১১ ফেব্রূয়ারী “লিগো” প্রথমবারের মত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্তের বিষয়ে নিজেদের আবিষ্কারের কথা জানান। ১৫জুন তারা পুনরায় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করেন। লিগোর এই বিজ্ঞানিদের দলে দুজন বাঙ্গালীও ছিলেন।

এখনো যেখানে বিজ্ঞানীরা এই রহস্যময় ব্ল্যাক হোল নিয়ে মাথার চুল ছিঁড়ে চলেছেন, সেখানে ব্ল্যাক হোল ধারণার অন্যতম প্রবর্তক স্টিফেন হকিং কিছুদিন আগেই ইভেন্ট হোরাইজন ধারণা অমূলক বলেছেন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুযায়ী, ইভেন্ট হোরাইজনের অস্তিত্ব সম্ভবও না। হকিং এপারেন্ট হোরাইজন নামে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন ইভেন্ট হোরাইজনের বিকল্প হিসেবে। তাঁর এই তত্ত কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও সাধারণ আপেক্ষিকতার মাঝে কোন বিরোধ করছে না। তবে কি ব্ল্যাক হোল বলে কিছুই নেই?

হয়তবা সেদিন খুব বেশী দূরে নয়, যেদিন অনুসন্ধানী মানুষের মন অপার রহস্যের আঁধার এই ব্ল্যাক হোল নিয়ে আমাদের সব কৌতূহলের অবসান ঘটাবে।

লেখক: Abid Reza

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *