টপ ৫: লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অসাধারণ ৫টি উদ্ভাবন

আমরা অধিকাংশই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিকে একজন অসাধারণ চিত্রকর হিসেবেই চিনি। কিন্তু ইতালীর রেনেসাঁসের (চতুর্দশ-সপ্তদশ শতক) জন্ম নেয়া এ মানুষটি ছিলেন একজন পলিম্যাথ (জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহুবিধ শাখায় যার স্বচ্ছন্দ বিচরণ রয়েছে)। উদ্ভাবন, চারুকলা, ভাষ্কর্য, স্থাপত্যবিদ্যা, বিজ্ঞান, সঙ্গীত, গণিত, প্রকৌশলবিদ্যা, সাহিত্য, এনাটমি, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা, উদ্ভিদবিজ্ঞান, ইতিহাস চর্চা ও মানচিত্রাঙ্কন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সৃজনশীলতার বিশাল জগত জুড়ে হেসে-খেলেই বেড়িয়েছেন এ মানুষটি। আর তিনি যে প্রকৌশলবিদ্যা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে, চিত্রকলার মতই অসাধারণ ছিলেন তা তার অগণিত উদ্ভাবন দেখেই বুঝা যায়। যদিও এর মাঝে বেশকিছুই থেকে গিয়েছিলো তার নোটবুকেই, কেবলমাত্র স্কেচ হিসেবে। আর অসম্ভব প্রতিভাধর এই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অসাধারণ ৫টি উদ্ভাবনের গল্প শোনাতেই আজকের এই লেখা।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অসাধারণ ৫টি উদ্ভাবন

প্যারাসুট

প্যারাসুট
প্যারাসুট

বাস্তবিক অর্থে মডার্ন প্যারাসুট আবিষ্কারের ক্রেডিট দেওয়া হয় সেবাস্তিয়ান লেনর্ম্যান্ড কে। কারন তিনিই প্রথম ১৭৮৩ সালে প্যারাসুট প্রিন্সিপ্যাল ব্যাখ্যা করেন। তবে মানুষ যে প্যারাসুটের মাধ্যমে উড়তে পারবে এই বিষয়ে প্রথম ধারণা করেন এবং নকশা আঁকেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। তার প্যারাসুটটি পিরামিড সদৃশ এবং এর সাথে আছে কাঠের ফ্রেম। আর এই নকশা অঙ্কিত আছে ভিঞ্চির দ্য কোডেক্স আটলান্টিকাস এ। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির এই প্যারাসুটটি যে বাস্তবধর্মী, মানে এর মাধ্যমে যে উড়াও সম্ভব, তা ২০০০ সালে আদ্রিয়ান নিকোলাস নামে একজন ব্রিটিশ স্কাইডাইভার ভিঞ্চির নকশা করা প্যারাসুট নিয়ে উঁচু থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিরাপদে নিচে পৌঁছে প্রমান করেন।

অস্ত্রশস্ত্রযুক্ত ট্যাঙ্ক

অস্ত্রশস্ত্রযুক্ত ট্যাঙ্ক
অস্ত্রশস্ত্রযুক্ত ট্যাঙ্ক

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সর্বপ্রথম ট্যাঙ্ক ব্যবহার করা হলেও ৫০০ বছর পূর্বেই এর কনসেপ্ট (অনেকের মতে ট্যাঙ্কের প্রোটোটাইপ) তৈরি করেছিলেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। তিনি অস্ত্রশস্ত্রযুক্ত ট্যাঙ্কের (সাঁজোয়া ট্যাঙ্ক) এই ডিজাইনটি তৈরি করেছিলেন মিলানের ডিউক লুডোভিকো স্ফোরজার জন্য কাজ করার সময়। ট্যাঙ্কটি চালাতে শক্তির যোগান আসতো আটজন মানুষের সাহায্যে, যারা এর খোলকের ভেতরে থেকে কাজ করতেন। এর চারদিক দিয়ে মোট ৩৬টি বন্দুকের নল বের করে রাখার পরিকল্পনা ছিলো তার। ফলে ডিজাইন অনুযায়ী যদি এই ট্যাঙ্ক আসলেই বানানো হতো, তবে শত্রুপক্ষের যে একেবারে ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা হতো, তা বোধহয় না বললেও চলে।

তবে মজার ব্যাপার হলো, ভিঞ্চির এ ট্যাঙ্কের নকশায় বেশ বড় রকমের একটি ঘাপলা ছিলো যার কারনে ট্যাঙ্কটিকে চালানো সম্ভব হতো না। আসলে ভিঞ্চির ডিজাইনে এর গিয়ারগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিলো যেন সামনের চাকাগুলো পেছনের চাকাগুলোর উল্টোদিকে চলে। ফলে বাস্তবে বানানো হলে ট্যাঙ্কটি জায়গাতেই স্থির থাকতো। ভিঞ্চির মতো একজন দক্ষ ডিজাইনার এমন বোকার মতো ভুল করবেন – এটা ঠিক মেনে নিতে পারেন নি ইতিহাসবিদগণ। এজন্য ট্যাঙ্কের নকশার এ ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করতে তারা কিছু অনুমানের আশ্রয় নেন। তাদের মতে – হয় ভিঞ্চি চান নি যে ট্যাঙ্কটি কোনোদিন বানানো হোক, কিংবা শত্রুপক্ষের হাতে এর নকশা চলে যাবার ভয়ে তিনি ইচ্ছে করেই এমনটা করেছিলেন।

অর্নিথপ্টার

অর্নিথপ্টার
অর্নিথপ্টার

মানুষের উড়তে পারা নিয়ে বোধহয় ভিঞ্চি অনেক আশান্বিত ছিলেন। তিনি মনে প্রাণেই বিশ্বাস করতেন মানুষ একদিন উড়বে। আর এজন্যই বোধহয় তার উদ্ভাবনের অনেকটা অংশ জুড়েই ছিলো আকাশে ওড়ার যন্ত্র। আর এসব বিষয়ে হয়তো তিনি অনেকটাই অনুপ্রেরণা নিতেন পাখিদের থেকে। তাইতো তিনি উদ্ভাবন করেন এমন এক যন্ত্র যা দিয়ে ওড়া যাবে পাখিদের মত মানে ডানা ঝাপটে (নাম? অর্নিথপ্টার)।

পাখির মতো করে বানানো এ ডিজাইনে একটি ক্র্যাঙ্ক রাখা হয়েছিলো, ভিঞ্চি ভেবেছিলেন, এই ক্র্যাঙ্ক ঘুরিয়ে ঘুরিয়েই পাইলট আকাশে উড়বেন। অবশ্য আধুনিককালে তার সেই মডেল বাস্তবায়িত করে দেখা গেছে, অর্নিথপ্টার উড়তে পারবে ঠিকই, কেবলমাত্র যদি ইতোমধ্যেই তা বাতাসে ভেসে থাকে। আর তাছাড়া মনুষ্য-শক্তিই বা আর কতক্ষন সমান থাকবে? তাই পাখিদের মত ডানা ঝাপটে আকাশে ওড়ানোর স্বপ্নটা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিলো।

স্বয়ংক্রিয় গাড়ি

স্বয়ংক্রিয় গাড়ি
স্বয়ংক্রিয় গাড়ি

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অন্য সকল উদ্ভাবনের মত এটিও যুগের থেকে অনেক এগিয়ে। ১৯৯০ সালে প্রোফেসর কার্লো পেড্রেট্টির বুঝার আগে কেউই বুঝতে পারছিলো না গাড়িটি কিভাবে কাজ করবে। অবশ্য ভিঞ্চি তার নোটবুকে এ ডিজাইন পুরোটা এঁকে যান নি। যেটুকু বাকি ছিলো, তা এখনকার যুগের ইঞ্জিনিয়ারদের (প্রোফেসর কার্লো পেড্রেট্টি সহ আরো কয়েকজন) মাথা খাটিয়ে বের করতে হয়েছে।

ডিজাইন করা এ গাড়িটিকে বিশ্বের সর্বপ্রথম যান্ত্রিক গাড়ি বললেও বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। কারণ কোনো চালকের সাহায্য ছাড়া নিজে নিজেই চলতে পারতো এ গাড়িটি। এটি চলার জন্য যেসব ধারণা পাওয়া গেছে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ধারণাটি হলো- গাড়িটি চলতো সম্ভবত স্প্রিংয়ের সাহায্যে। আজকালকার দিনের বাচ্চাদের খেলনার মতো আরকি। যখন স্প্রিংয়ের প্যাঁচ খুলতে থাকতো, তখন সামনের দিকে এগোতে শুরু করতো গাড়িটি। আর স্টিয়ারিং ঠিক রাখার জন্য গিয়ারে ব্যবহার করা হয়েছিলো বিভিন্ন ব্লক। তবে গাড়িটির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি কেবল একদিকেই মোড় নিতে পারতো – শুধুমাত্র ডানদিকে।

এরিয়াল স্ক্রু

এরিয়াল স্ক্রু
এরিয়াল স্ক্রু

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আরেকটি মাস্টারপিস। আসলে ভিঞ্চির এই মডেল দেখে মনেই হয় না তিনি ছিলেন রেনেসাঁ যুগের, এটি যেন বিশ বা একুশ শতকের। আর গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে প্রথম হেলিকপ্টার আবিষ্কৃত হয়। তবে ভিঞ্চির নোটবুক থেকে প্রাপ্ত ডিজাইন পর্যালোচনা করে বিজ্ঞানীগণ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, সেখানে থাকা এরিয়াল স্ক্রু নামক যন্ত্রটিই আসলে আজকের দিনের হেলিকপ্টারের পূর্বপুরুষ। ভিঞ্চি বিশ্বাস করতেন যন্ত্রটি উড়বে। তবে আধুনিককালের বিজ্ঞানীগণ অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন। তাদের মতে, অতিরিক্ত ভরের কারণে এই এরিয়াল স্ক্রুর ভূমি ছেড়ে উপরে ওঠার সম্ভাবনা ছিলো প্রায় অসম্ভব। এরূপ সত্ত্বেও অনেকেই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিকে হেলিকপ্টার আবিষ্কারের কিছুটা কৃতিত্ব দিয়ে থাকে।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আরো কিছু উদ্ভাবন: রবোটিক নাইট, ট্রিপল ব্যারেল ক্যানন, কলোসাস, অ্যানিমোমিটার, ঘূর্ণায়মান ব্রিজ, ৩৩ ব্যারেলের অর্গান, বৃহদাকৃতির ধনুক, বেহালা সদৃশ বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

1 Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *