এরিয়া ৫১: বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় স্থান

১৯৫০ সালের পরে, চারিদিকে এক ধরণের শোরগোল পরে যায় মহাজাগতিক প্রাণী এলিয়েনদের নিয়ে। যেহেতু, সেসময়টা আজকের মত অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির মানে গুগলফেসবুকের দিন ছিল না, তাই এলিয়েনদের নিয়ে নানা সন্দেহের গল্প দিনদিন জমজমাট হয়ে উঠে। সৃষ্টির অপার রহস্যের সাথে সাথে মানব সৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ডও অনেক রহস্যহের জন্ম দেয়। তেমনি এক রহস্যে নাম আমেরিকার “এরিয়া ৫১” ঘাটিকে ঘিরে।

বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় স্থান এরিয়া ৫১

এরিয়া ৫১ এর অবস্থান
এরিয়া ৫১ এর অবস্থান

এরিয়া ৫১ রহস্যের জন্ম আমেরিকার নেভাডায়, গ্রুম হ্রদের দক্ষিণের এক বিশাল – প্রায় ২৬ হাজার বর্গকিমির এক সামরিক ঘাঁটিকে ঘিরে। আমেরিকান সরকার গোপনে তাদের বিভিন্ন সামরিক বিমানের পরীক্ষামুলক উড্ডয়ন, বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের গবেষণা আর তার পরীক্ষা চালাবার জন্য এই ঘাঁটি তৈরি করেছিল। কোন বেসামরিক মানুষের সেখানে প্রবেশ নিষেধ, কেউ চেষ্টা করলে গুলি করা হবে – ঘাঁটির প্রতিটি প্রবেশপথে এমনটিই লেখা ছিল। প্রথমদিকে আমেরিকান সরকার পরিষ্কারভাবে কিছু জানাচ্ছিলোও না। ব্যস কিভাবে জানি কানেকানে রটে গেল- আমেরিকা পৃথিবীতে কোনভাবে চলে আসা এলিয়েনদের ধরে সেখানে বেধে রেখেছে! ২০১৩ সালে সিআইএ প্রথমবারের মত এরিয়া ৫১ এর ‘অস্তিত্ব’ স্বীকার করে। এই বিশাল জায়গার আশপাশ দিয়ে যেমন বিমান চলাচল নিষেধ, কোন মানচিত্রেও এর উল্লেখ ছিল না।

১৯৮৮ সালে রাশিয়ার ‘ইকন্স’ স্যাটেলাইটের  এক ছবির মাধ্যমে পৃথিবী প্রথমবারের মত এরিয়া ৫১ এর স্যাটেলাইট ছবি দেখতে পায়।এখন অবশ্য গুগল ম্যাপে সহজেই এর ছবি দেখতে পাওয়া যায়, তাও খুব বেশী না। মার্কিন উপগ্রহ ‘করোনা’ আর ‘টেরা’ ও ছবি তুলেছিল – সবই সরকার মুছে ফেলে। সিআইএ’র নথি থেকে জানা যায়, সেখানে যেসব দালান আছে সেসবে কোন জানালা নেই, যাতে এক গবেষক দল অন্য দলের কাজ সম্পর্কে জানতে না পারেন ! এমনকি যখন পরীক্ষামুলক কোন বিমান প্রথম উড়ানো হয়, তখন কর্মীরা দালানের ভেতরেই থাকে। এতসব গোপনীয়তা জন্ম দিয়েছে নানা গল্পের।

এরিয়া ৫১
এরিয়া ৫১

১৯৪৭ সালে নিউ মেক্সিকোর কাছে বিধ্বস্ত হওয়া রসয়াল বিমানকে অনেকে ভেবেছে এলিয়ানদের উভোযানের ক্র্যাশ হিসেবে। আবার অনেকে ভাবেন, চন্দ্রজয় একেবারেই ভুয়া একটি কথা। রাশিয়ার সাথে পাল্লা দিতে এই এরিয়া-৫১’র ভিতরেই নাটক সাজিয়ে ছিল তারা! মানুষের মনের এই সন্দেহের দানাকে উসকে দেয় হলিউডের ইন্ডিপেন্ডেন্স মুভিটি। সেখানে তারা পৃথিবী আক্রমনের অংশ হিসেবে এরিয়া ৫১ এ হামলা করে। পরিচালক১৯৪৭ সালের রসয়ালের বিধস্ত বিমানকে এলিয়ানদের হারিয়ে যাওয়া উভোযান হিসেবে দারুণ গল্প ফেঁদেছিলেন, সেটা কি বলতে হবে? প্রায় একই কাহিনি নিয়ে তৈরি হয়ে সেভেন ডে টিভি সিরিয়াল, এরিয়া ৫১ নামের কম্পিউটার গেমস।

রহস্যের ডালপালা যত জন্মায়, আমেরিকান সরকার ততই মুখে কুলুপ এটেছিল। বাজারের এতসব গল্পের ভিড়ে নতুনভাবে শিঙ্গায় ফু দেন  এখানে একসময় কর্মরত পদার্থবিজ্ঞানী বব লেজার। এক টিভি সাক্ষাৎকারে বব বলেন, ‘এরিয়া ৫১ এ রেটিকুলাম ৪ নামের একগ্রহ থেকে আসা এলিয়েন ও এক ফ্লাইং সসার আছে। তিনি জব্দ করা এলিয়েনটির একটা বর্ণনাও দেন।  এছাড়া বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে এখান থেকে ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ হয়েছে বলে দাবি করেন এখানে বিভিন্ন সময়ে কাজ করা অনেক কর্মকর্তা।

কল্পিত এলিয়েন ও এক ফ্লাইং সসার
কল্পিত এলিয়েন ও এক ফ্লাইং সসার

সাধারণ বিমানের উড্ডয়ন নিষিদ্ধ ছিল বলে, বৈমানিকরা এর নাম দিয়েছিলেন ‘দি বক্স’। কেউ কেউ ‘দি কন্টেনার’ নামেও ডাকতেন। এখনো মার্কিন কোন ম্যাপে, খুব বেশী উল্লেখ নেই এরিয়া-৫১ সম্পর্কে। আমেরিকাতে এই নামটি সাধারণত সিআইএ ব্যবহার করে। ড্রিম ল্যান্ড, প্যারাডাইস রেঞ্চ, হোম বেস, ওয়াটার টাউন স্ট্রিপ, গ্রুম লেক,হোমিও এয়ারপোর্ট সহ কত নামেই না একে ডাকা হয়! মার্কিন বিরোধীরা তো এক নামেই একে ‘এরিয়া অফ কন্সপায়রেসি’ নামে ডাকে।

স্যাটেলাইটের ছবি থেকে দেখা যায়, এরিয়া ৫১ এ সাতটি রানওয়ে আছে। তারমধ্য একটি ব্যবহার করা হয় না বা বন্ধ। আরও আছে হ্যালিপ্যাড। ধারণা করা হয় ইউ-২, এক্স-১৫, এ-১২ সহ নানা আধুনিক মার্কিন সামরিক বিমান এখানেই তৈরি হয়েছে। ভেতরে লকহেড মার্টিনের একটি গবেষণাগার আছে বলে শোনা যায়।

গবেষণার সুরুক্ষা দিতে মার্কিন সরকার এরিয়া ৫১ ঘিরে যত নিরাপত্তার আয়োজন করেছে, প্রাকৃতিকভাবে বেশ নিরাপদ জায়গা গ্রুপ লেকের তীরে এই গোপন সামরিক স্থাপনা –মানুষের আনাগোনা বা শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে। যদিও সিআইএ কিছু তথ্য জানিয়েছে, তবুও খোদ মার্কিন জনগণ আজও সেই পুরাতন নানা গল্পকেই এরিয়া-৫১ এর ভেতরের কাহিনী হিসেবে মানে।

কথায় তো আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু – তর্কে বহুদূর!

লেখক: Abid Reza



error: