বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল: রহস্যময় বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের আদ্যোপান্ত

সেবা প্রকাশনীর নিয়মিত পাঠক হলে আপনি অবশ্যই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এর নাম শুনেছেন? অ্যাডভেঞ্চার আর রহস্যপ্রেমীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল। কিন্তু আদতে কি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের অস্তিত্ব আছে, নাকি সবই সুনিপুণ লেখনীতে মানব মনের কল্পনা? তবে যা রটে তা তো কিছুটা হলেও সত্য বটে। চলুন আজকে জেনে নেই রহস্যের চাদরে অনেককাল ঢেকে থাকা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের আদ্যোপান্ত।

রহস্যময় বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের আদ্যোপান্ত

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এর অবস্থান

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এর অবস্থান
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এর অবস্থান

ক্যারিবীয় সাগরের এক কল্পিত ত্রিভুজের মত দেখতে অঞ্চলকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নাম দেয়া হয়েছে। অঞ্চলটি আটলান্টিক মহাসাগরের তিনদিকে দিয়ে সীমাবদ্ধ। এর এক প্রান্তে আমেরিকার ফ্লোরিডা, একপ্রান্তে পুয়ের্তো রিকো আর অপ্রপাশে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বারমুডা দ্বীপের অবস্থান। পুরো অঞ্চলটির মোট আয়তন ১১৪ লাখ বর্গ কিলোমিটারের মত।

কেন রহস্যময় এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল?

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের নিয়ে রহস্যময়তার দিকটি হল, এই অঞ্চলে জাহাজ বা বিমান প্রবেশ করলে তা নিখোঁজ হয়ে যায়। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত একই ব্যাপার অনেকবারই ইতিহাসে ঘটেছে। কোনো জাহাজ বা বিমান এই ত্রিভুজ অঞ্চলে প্রবেশ করার পরপরই রেডিওতে সিগন্যাল প্রেরণে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং একসময় জাহাজ বা বিমানটি উপকূলের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। এক সময় তা দিক নির্ণয় করতে না পেরে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে হয়ে যায় চিরদিনের জন্য। আবার কয়েকমাস আগে হারিয়ে হয়ে যাওয়া জাহাজ কিংবা বিমানে ধ্বংসাবশেষ অলৌকিকভাবে ভাসতে দেখা যায় সাগরে।

কলম্বাসই প্রথম ১৪৯২ সালের ১১ অক্টোবর তার আমেরিকা যাত্রার লগবুকে এই ট্রায়াঙ্গল নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেন। তার জাহাজের নাবিকরা এ অঞ্চলের দিগন্তে আলোর নাচ আর আকাশে ধোঁয়ার মত কিছু দেখেছে। এ অঞ্চল পাড় হবার সময় তিনি জাহাজের কম্পাসের উল্টাপাল্টা দিক-নির্দেশনার কথাও লিখে গেছেন। মার্কিন ৫ টি প্রশিক্ষণ সামরিক বিমান এ অঞ্চলে হারিয়ে গিয়ে এই রহস্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। ১৯৫০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এপির সাংবাদিক ই ভি ডব্লিউ জোনসই প্রথম ত্রিভুজাকার এলাকাটি নিয়ে খবরের কাগজে প্রবন্ধ লিখেন।

দ্য বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল মিসট্রি: সলভড
দ্য বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল মিসট্রি: সলভড

কিন্তু, আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে ১৯৭৫ সালেই স্থানীয় অধিবাসীদের শয়তানের ত্রিভুজের রহস্য জানা গিয়েছে। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভারসিটির লাইব্রেরিয়ান ল্যারি কাসচি তার ‘দ্য বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল মিসট্রি : সলভড’ বইতে যুক্তিপ্রমাণ হাজির করে দেখান যে আসলে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের যে রহস্য তা গুটিকয়েক লেখকের লেখার কাটতি বাড়াবার কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়!

ত্রিভূজের মত দেখতে এ অঞ্চলের উপর দিয়ে মেক্সিকো উপসাগর থেকে উষ্ণ সমুদ্রস্রোত বয়ে গেছে। এই তীব্র গতির স্রোতই মূলত অধিকাংশ জাহাজের হারিয়ে কারণ। একই সাথে এখানকার আবহাওয়া এমনই যে হঠাৎহঠাৎ এখানে ঝড় ওঠে আবার থেমেও যায়, বিশেষ করে  গ্রীষ্মকালে আকাশ কালো হয়ে  ঘূর্ণিঝড় প্রায়ই  আঘাত হানে। বিংশ শতাব্দীতে টেলিযোগাযোগ, রাডার ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি মানুষের কাছে সহজলভ্য হবার আগে  এমন অঞ্চলে জাহাজডুবিকে খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা হিসেবে দেখেছেন কাসচি।

বর্তমানের বিজ্ঞানীরা কলম্বাসের মূল লগবুক পরীক্ষা করে জানিয়েছেন – নাবিকেরা যে আলো দেখেছেন তা আসলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নৌকায় রান্নার কাজে ব্যবহৃত আগুন, আর কম্পাসে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল মূলত নক্ষত্রের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে। কম্পাসে চুম্বক মেরুর দূরত্বের উপর ভিত্তি করে এর দিক নির্দেশনায় পরিবর্তন হয়। যেমন: যুক্তরাষ্ট্রে শুধুমাত্র উইসকনসিন থেকে মেক্সিকোর উপসাগর পর্যন্ত কম্পাস সরলরেখা বরাবর  ভৌগোলিক উত্তর মেরু নির্দেশ করে। এই সাধারণ তথ্য যে কোন দক্ষ নাবিকের জানবার কথা। কিন্তু সমস্যা হল সাধারণ মানুষ এইনিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানতো না বলে ঐ ত্রিভুজ এলাকায় কম্পাসের এমন আচরণ তাদের কাছে রহস্যময় মনে হত। সাথে তখনকার জল দস্যুতার কথা আর যুদ্ধে অপর পক্ষের জাহাজ সাগরে ডুবিয়ে দেবার কাহিনীও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল

২০১৪ সালে সাইবেরিয়ান টাইমসে রাশিয়ার গবেষক ভ্লাদিমির পোতাপভের বলেন, মিথেন গ্যাসের উদগীরণ সমুদ্রকে উত্তপ্ত করে। মিথেনযুক্ত পানির কারণে জাহাজ ডুবে যায়। এর আগে নরওয়ের গবেষকেরা উত্তর মেরুর ব্যারেন্টস সাগরের তলদেশে বেশ কিছু বড় গর্তের কথা জানিয়েছিলেন। আর্কটিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানান, এই গর্তের মত আগ্নেয়গিরির মুখগুলোর ব্যাস ৩২৮০ ফুট আর গভীরতা ১৩১ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। থ্রিডি সিসমিক ইমেজিং পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা এই গবেষণা করেন। তাদের মতে, সাগরের তলদেশের তেলের খনি থেকে সৃষ্ট উচ্চ চাপের মিথেন গ্যাসের উদগীরণে এ গর্ত সৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ র‌্যান্ডি কারভ্যানি তার গবেষণায় প্রমান করেন যে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে বিমান হারিয়ে যাবার রহস্যের পিছনে ‘হেক্সাগোনাল ক্লাউডের’ ভুমিকা রয়েছে। এই মেঘের কারনে বারমুডায় দ্বীপে ২০ থেকে ৫৫ মাইল জুড়ে ঘণ্টায় ১৭০ মাইল গতিবেগের তীব্রবায়ু তৈরি হয়। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এ বায়ুকে বলা হয় ‘এয়ার বোম্ব’, যা প্রায় ৪৫ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত ঝড় তৈরি করতে পারে। মেঘের আর ঝড়ের কারনে ঘন মেঘের কারনে বৈমানিকরা দিকনির্দেশনায় ভুল করতেন। কাসচি তার বইয়ে হিসাব কষে দেখিয়ে ছিলেন যে, এ অঞ্চলে যত জাহাজ আর বিমান দুর্ঘটনায় হারিয়েছে, পৃথিবীর অন্যকোন প্রান্তে এর কম কিছু ঘটেনি।

বারমুডার সব ‘উড়ো’ খবর নিয়ে গবেষণা হয়েছে বিস্তর, রহস্যের পক্ষে বিপক্ষে ডকুমেন্টারি বানানো হয়েছে, হলিউডে আজও মুভি বানানো চলছে। যদিও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সব রহস্যের অসারতা প্রমাণ হয়েছে অনেক আগে তবুও রহস্যপ্রিয় মানুষ একে বিশেষ আমলে নেয়নি। তারা এখনো বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে রহস্যের গন্ধে মুখ বুজে থাকতেই ভালোবাসে।

লেখক: Pritom Pallav



error: