বাঙালির উৎসব: চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব

উৎসব মানেই আনন্দ। আনন্দকে পরস্পরভাবে ভাগ করে নেয়ার জন্য ই উৎসব। বিভিন্ন মতের মানুষ, বিভিন্ন প্রকার জিনিস বিশ্বাস করে এবং অনেক কিছুর উপাসনা করে। সেই অনেক পুরনো রীতি-নীতি গুলোকে বিশ্বাস করেই গড়ে উঠছে আমাদের আজকের পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থা, আর সেখানকার নিয়ম আর উৎসব গুলো। চৈত্র সংক্রান্তি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উৎসব। চৈত্র মাসের শেষ দিনে মানে ১৩ই এপ্রিল এই পূজা করা হয়। এটি সাধারণত একটি লোকউৎসব। এখানে শিবের গাজন, চড়ক পূজা সব ই হয়।

বাঙালির চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব

লিঙ্গপুরাণ, বৃহদ্ধর্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে চৈত্র মাসে শিবারাধনা প্রসঙ্গে নৃত্যগীতাদি উৎসবের উল্লেখ থাকলেও চড়ক পূজার উল্লেখ নেই। পূর্ণ পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত গোবিন্দানন্দের বর্ষক্রিয়াকৌমুদী ও রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্বেও এ পূজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে পাশুপত সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাচীনকালে এ উৎসব প্রচলিত ছিল। উচ্চ স্তরের লোকদের মধ্যে এ অনুষ্ঠানের প্রচলন খুব প্রাচীন নয়। জনশ্রতি রয়েছে, ১৪৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের এক রাজা এই পূজা প্রথম শুরু করেন।

বাঙালির চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব

বাঙালির চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব

এ পূজার অপর নাম নীল পূজা। গম্ভীরাপূজা বা শিবের গাজন এই চড়কপূজারই রকমফের। চড়ক পূজা চৈত্রসংক্রান্তিতে অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিবসে পালিত হয়। আগের দিন চড়ক গাছটিকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। এতে জলভরা একটি পাত্রে শিবের প্রতীক শিবলিঙ্গ রাখা হয়, যা পূজারিদের কাছে “বুড়োশিব” নামে পরিচিত। পতিত ব্রাহ্মণ এ পূজার পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন। পূজার বিশেষ বিশেষ অঙ্গ হলো কুমিরের পূজা, জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর হাঁটা, কাঁটা আর ছুঁড়ির ওপর লাফানো, বাণফোঁড়া, শিবের বিয়ে, অগ্নিনৃত্য, চড়কগাছে দোলা এবং দানো-বারানো বা হাজরা পূজা করা।

এই সব পূজার মূলে রয়েছে ভূতপ্রেত ও পুনর্জন্মবাদের ওপর বিশ্বাস। এর বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রাচীন কৌমসমাজে প্রচলিত নরবলির অনুরূপ। পূজার উৎসবে বহু প্রকারের দৈহিক যন্ত্রণা ধর্মের অঙ্গ বলে বিবেচিত হয়। চড়কগাছে ভক্ত বা সন্ন্যাসীকে লোহার হুড়কা দিয়ে চাকার সঙ্গে বেঁধে দ্রুতবেগে ঘোরানো হয়। তার পিঠে, হাতে, পায়ে, জিহ্বায় এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে বাণ শলাকা বিদ্ধ করা হয়। কখনো কখনো জ্বলন্ত লোহার শলাকা তার গায়ে ফুঁড়ে দেয়া হয়। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে এ নিয়ম বন্ধ করলেও গ্রামের সাধারণ লোকের মধ্যে এখনো তা প্রচলিত আছে।

পূজার উদ্যোক্তারা কয়েকজনের একটি দল নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ায়। দলে থাকে একজন শিব ও দু’জন সখী। একজনকে সাজানো হয় লম্বা লেজ দিয়ে, তার মাথায় থাকে উজ্জ্বল লাল রঙের ফুল। সখীদের পায়ে থাকে ঘুঙুর। তাদের সঙ্গে থাকে ঢোল-কাঁসরসহ বাদকদল। সখীরা গান ও বাজনার তালে তালে নাচে। এদেরকে দেল বা নীল পাগলের দল’ও বলা হয়। এরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গাজনের গান গায় এবং নাচ-গান পরিবেশন করে। বিনিময়ে দান হিসেবে যা কিছু পাওয়া যায় তা দিয়ে হয় পূজা।

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চৈত্র সংক্রান্তির আজকের এ দিনটিকে অত্যন্ত পুণ্যের দিন বলে মনে করেন। আচার অনুযায়ী এ দিনে বিদায় উৎসব পালন করে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে বছরের যত সব জঞ্জাল, অশুচিতাকে দূর করা হয়।

পরদিনই খোলা হবে ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন খাতা- যার লোকায়ত নাম ‘হালখাতা’। ধূপ ধুনোর সুগন্ধিতে ভারি করে রাখা হবে ঘরের পরিবেশ। তাছাড়া অভ্যাগত এলেই গোলাপ পানি ছিটিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হবে।

বাঙালির চৈত্র সংক্রান্তি পালন

বাঙালির চৈত্র সংক্রান্তি পালন

বাঙালি যেখানে পালন করে চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ সেখানে পিছিয়ে নেই নৃগোষ্ঠীরাও। তারা পালন করে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান- বৈসাবি। মারমাদের সাংগ্রাই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণীয় একটি অংশ হলো জলোৎসব। জলের দু’দিকে অবস্থান নেয়া তরুণ-তরুণীরা একে অপরের দিকে পানি ছিটিয়ে এই উৎসব পালন করে সনাতনী পঞ্জিকানুসারে এই দিনটিকে বলা হয় মহাবিষুব সংক্রান্তি। তবে এর মূল উৎস সনাতনী ধর্মমতের সাথে সম্পর্কিত হলেও কালের ফেরে এটি রূপ নিয়েছে বাঙালির জাতীয় উৎসবের একটিতে। পুরাতন ও জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে নতুনত্বের বরণ এবং নতুন আশা, আকাঙ্খা, হাসি ও রঙের মণিকোঠায় পরিণত হয়েছে চৈত্র সংক্রান্তি ও বর্ষবরণের সম্মিলিত উৎসব।

আমাদের লোকজ সংস্কৃতির যা কিছু সত্য, সুন্দর, শুভ তা টিকে থাকুক অনন্তকাল-এই হোক চৈত্র সংক্রান্তির প্রার্থনা।

আরো পড়ুন:  লা তোমাতিনা: স্পেনের বিখ্যাত টমেটো উৎসব

লেখক: Pritom Pallav

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 Shares
Share via
Copy link
Powered by Social Snap