লা তোমাতিনা: স্পেনের বিখ্যাত টমেটো উৎসব

সংস্কৃতি আর উৎসব আমাদের সাথে জড়িয়ে আছে সেই আদি কাল থেকেই। আমরা নিজেরাই উৎসব তৈরি করি আমাদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার জন্য। বানিয়েছি অনেক নিয়ম অনেক আচার আবার সেইসব এর মধ্যেও নিজেরা অনেক নিয়ম কানুন জুড়ে দিয়েছি নিজেদের স্বার্থেই। এক এক দেশের সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য অন্যদেশ বা সভ্যতা থেকে আলাদা হয়ে থাকে সব সময় ই। বাংলাদেশের কোন সংস্কৃতির সাথে স্পেনের গুলো মিলবে না। তবে হ্যাঁ, আমরা তাদের টা দেখে দেখে সেইসব পালন করতে পারি। এই ব্যপারে কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই। আর লা তোমাতিনা উৎসব এরকম ই একটি উৎসব। যদিও আমরা আমাদের দেশে তা পালন করি না, কিন্তু স্পেনে খুব জনপ্রিয় এই উৎসবটি।

লা তোমাতিনা উৎসবের শুরু

লা তোমাতিনা উৎসবে টমেটো বহনকারী ট্রাক
লা তোমাতিনা উৎসবে টমেটো বহনকারী ট্রাক

ধারনা করা হয়ে থাকে, ১৯৪৪ বা ১৯৪৫ সাল থেকে স্পেনের বুনিয়ল শহরের ঐতিহ্য হিসেবে লা তোমাতিনা উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে। তবে এই উৎসবের প্রেক্ষাপট হিসেবে কারো কাছেই কোন নির্দিষ্ট ধারনা বা তথ্য নেই। কেওই জানেনা কিভাবে এই উৎসবের শুরু, পেছনের কোন ঘটনা। তবে একটি জনপ্রিয় মতবাদ আছে। একবার বুনিয়ল শহরে কোন এক উৎসব চলার সময়ে শহরের জনগণ কোন এক কারনে ক্ষিপ্ত হয়ে কাউন্সিল ব্যক্তিকে টমেটো নিয়ে আক্রমণ করে। আর তারপর ই এইটা এমনি জনপ্রিয় হয়ে উঠে, আর বছরের পর বছর শহরের লোকেরা মজা করার জন্য টমেটো যুদ্ধের আয়োজন করে। যা আজো চলে আসছে। তবে ১৯৫৭ সালের পর অনুষ্ঠান এর আয়োজকরা নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু নিয়ম কানুন জুড়ে দেয়। পরবর্তিতে এই নিয়মকানুন আরো সংশোধন করা হয়।

১৯৭৫ সাল থেকে বিনিয়ল শহরের প্যাট্রন লস ক্লাভেরিয়স দে স্যন লুইস বারত্রাম পুরো উৎসবের আয়োজন করে এবং সকল টমেটো সরবরাহ করেন। এর আগে স্থানীয়রাই এই টমেটোর যোগান দিতো। ১৯৮০ সাল থেকে শহরের কাউন্সিল এই উৎসবের দায়িত্ব নেয় এবং আরো কিছু নিয়ম জুরে দেয়। সাধারণত ঘণ্টা ব্যাপী এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। পুরো শহর জুড়েই থাকে টমেটো। স্থানীয়রা পানির সরবরাহ করে যাতে শহর পরিষ্কার করে ফেলা যায় তারাতারি। অনুষ্ঠান শেষে সংক্রামণ যেনো না হয় তাই খুব দ্রুত শহর পরিষ্কার করে দেয়া হয়।

লা তোমাতিনা উৎসব
লা তোমাতিনা উৎসব

আমাদের দেশে বলতে গেলে এরকম খেলা হয়ে থাকে। যেমন রাঙ্গামাটিতে বর্ষবরণের বৈসাবি অনুষ্ঠানে পানি ছোঁড়াছুঁড়ির সাথে লা তোমাতিনার মিল আছে। স্পেনে ছোঁড়া হয় টমেটো আর আমাদের এখানে পানি। তাছাড়া হিন্দুদের দোল বা হলির সাথেও কিছুটা মিল আছে এই খেলার। যদিও পার্থক্য আছে, কিন্তু মিলও আছে অনেকটাই।

২০১৩ সাল থেকে লা তোমাতিনা প্রতিযোগীতার টিকেট বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা এই লা তোমাতিনা উৎসবে যোগ দেয়। তবে নিরাপত্তার জন্য আয়োজকরা এই অনুষ্ঠানের মানুষ সংখ্যা সীমিত করে দিয়েছে। উৎসবের নিয়ম:

  • টমেটো ছোড়ার আগে ভালো করে চটকে নিতে হবে।
  • টমেটো ছাড়া অন্য কিছু ছোঁড়া যাবে না।
  • যানবাহন চলাচলের জন্য যায়গা রাখতে হবে।
  • সময় শেষ হওয়ার পর আর কোন টমেটো ছোড়া যাবে না।

মজার ব্যপার হলো, স্পেনের এই জনপ্রিয় খেলাটি এখন আর শুধু স্পেনে সীমাবদ্ধ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, কলম্বিয়া, চিলিসহ বেশ কয়েকটি দেশের এই খেলা স্থানীয়রা প্রতিবছর আয়োজন করে। চিলির কুইলন শহরে বেশ ঘটা করেই এই টমেটোর যুদ্ধ চলে। গতবছর টমেটোর এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছে প্রায় সাত হাজার মানুষ। সেখানে প্রায় ৪০ টনের উপর টমেটো খরচ হয়েছে। ঐদিন সব তরুণ তরুণীরা রাস্তায় এসে হাজির। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার টন টমেটো ছোঁড়াছোঁড়ি চলে পুরোদমে।

জিন্দেগী না মিলেগি দোবারা মুভি
জিন্দেগী না মিলেগি দোবারা মুভি

চিলিতে প্রথম উৎসব আয়োজন করে মিশুয়েল পেড্রেরস ও তার কয়েক বন্ধু। কিন্তু তারপর ই জনপ্রিয় হয়ে উঠে এই খেলাটি। তবে বর্তমানে প্রশাসনের হাতেই সব দায়িত্ব। তারাই নিয়ন্ত্রণ করে এটি। এ ছাড়াও “জিন্দেগী না মিলেগি দোবারা”, “উই নিড টু টক এবাউট কেভিন”, “স্প্যানিশ মাসালা” মুভিগুলোতে এই লা তোমাতিনা উৎসবের দৃশ্য রয়েছে।

পৃথিবীতে নানান দেশ, নানান আচার ব্যবহার। তবে কোন উৎসব বা খেলায় অংশ নিতেই হউক বা দেখতে যাওয়াই হউক, কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। আপনি ইচ্ছা করলেই চলে যেতে পারেন স্পেন, আর দেখতে বা অংশগ্রহন করতে পারেন তাদের সাথে এই রোমাঞ্চপূর্ণ উৎসব “লা তোমাতিনা” তে।

লেখক: Pritom Pallav

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 Shares
Share via
Copy link