টপ ৫: সান্দ্রো বত্তিচেল্লির সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্ম

প্রারম্ভিক রেনেসাঁর অন্যতম মহান চিত্রশিল্পী সান্দ্রো বত্তিচেল্লি (১৪৪৫-১৫১০)। তার পুরো নাম আলেসান্দ্রো ডি মারিয়ানো ডি ভান্নি ফিলিপেপি। ছন্নছাড়া প্রকৃত শিল্পীর মতোই জীবদ্দশায় বত্তিচেল্লি যেমন অভিজাত সমাজের সান্নিধ্য লাভ করে বিত্তশালী হয়েছিলেন, তেমনি মৃত্যুর সময় ছিলেন কপর্দকশূন্য! চিরকুমার বত্তিচেল্লি বিবাহপ্রথার কট্টর সমালোচনা করলেও নিজের চিত্রকর্মে পুরুষের তুলনায় নারীকেই বেশি প্রাধান্য দিতেন। জীবদ্দশায় অতুলনীয় সম্মান লাভ করলেও মৃত্যুর পর প্রায় ৪০০ বছর বিস্মৃতই রয়ে গিয়েছিলেন। তবে বিলম্ব হলেও ইউরোপ বত্তিচেল্লির অনন্য প্রতিভা বুঝতে পেরেছে। আর এই পর্বে আমরা দেখব মহান চিত্রশিল্পী সান্দ্রো বত্তিচেল্লির সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্ম।

সান্দ্রো বত্তিচেল্লির সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্ম

ম্যাডোনা অব দ্য ম্যাগনিফিক্যাট

ম্যাডোনা অব দ্য ম্যাগনিফিক্যাট
ম্যাডোনা অব দ্য ম্যাগনিফিক্যাট

সান্দ্রো বত্তিচেল্লির সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্মের লিস্টে ৫ম স্থানে আছে ম্যাডোনা অব দ্য ম্যাগনিফিক্যাট (Madonna of the Magnificat)। এই ছবিটিকে বত্তিচেল্লি এঁকেছিলেন টন্ডো বা গোলাকার আকৃতিতে। ছবিটিতে দেখা যায় কুমারী মেরীকে যেখানে দুইজন ফেরেশতা তাকে মুকুট পরিয়ে দিচ্ছেন। এখানে কুমারী মেরী তার ডান হাত দিয়ে একটি বইয়ের ডান পৃষ্ঠায় খ্রীষ্টীয় স্তব লিখছেন যার নাম ম্যাগনিফিক্যাট (Magnificat)। আর বাম পাশে আছে বেনেডিক্টাস নামক আরেকটি স্তব। কুমারী মেরীর বাম হাতে আছে একটি ডালিম।

ছবিটিতে অত্যাধিক পরিমাণ স্বর্ণ ব্যবহার কারনে এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দামী টন্ডো (রেনেসাঁ কালে গোলাকৃতি শিল্পকর্ম)। এটি বর্তমানে সংরক্ষিত আছে ইতালির ফ্লোরেন্সের উফিজি গ্যালারীতে।

অ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই

অ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই
অ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই

সান্দ্রো বত্তিচেল্লির সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্মের লিস্টে চতুর্থ স্থানে আছে অ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই (Adoration of the Magi)। এই ছবিটির নাম শুনলে আমাদের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই এর কথাই মনে পরতে পারে। তবে আমরা কথা বলছি সান্দ্রো বত্তিচেল্লির আঁকা অ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই নিয়ে। খুব সম্ভবত ১৪৭৫-৭৬ সালের মধ্যেই তিনি এই ছবিটি এঁকেছেন। ছবিটি বাইবেল এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যগুলির একটি প্রকাশ করে। ছবিতে দেখা যায় তিনজন জ্ঞানী ব্যাক্তি হাঁটু গেঁড়ে বসে, ফুল অরপন করে পবিত্র পরিবারের (যিশু খ্রীষ্ট, মাতা মেরী এবং জোসেফ) উপাসনা করছে।

ধর্মীয় দিক ছাড়াও ছবিটি অন্য দিক দিয়েও তাৎপর্যপুর্ণ। এখানে দেখা যায় তৎকালীন ফ্লোরেনটাইন সমাজের বেশ কিছু বিশিষ্ট লোকদের। যার মধ্যে আছে কসিমো ডি মেডিচি, পিয়েরো, জিওভান্নি মেডিচি (কসিমোর পুত্র), গুইলিয়ানো এবং লরেঞ্জো (কসিমোর নাতি)। একটু লক্ষ্য করলে দেখতে পারবেন, সেখানে ছবিটির ডানদিকে সান্দ্রো বত্তিচেল্লির আত্মপ্রতিকৃতিও রয়েছে – যেন চেয়ে আছে ছবিটি যে দেখছে তার দিকে। সান্দ্রো বত্তিচেল্লির আঁকা এই অ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই ছবিটি বর্তমানে ইতালির ফ্লোরেন্সের উফিজি গ্যালারীতে সংরক্ষিত আছে।

ম্যাপ অব হেল

ম্যাপ অব হেল
ম্যাপ অব হেল

সান্দ্রো বত্তিচেল্লির অন্যতম বিখ্যাত চিত্রকর্ম হল ম্যাপ অব হেল (Map of Hell)। এটি আমাদের লিস্টে ৩য় স্থানে আছে। তবে এই চিত্রকর্ম সৃষ্টি করতে তাকে অনুপ্রাণিত করেছে আরেকজন মহান শিল্পী। যার নাম দান্তে অলিঘিয়েরি। আর এই ম্যাপ অব হেল হল চৌদ্দ শতকের দান্তে অলিঘিয়েরির অসাধারণ শিল্পকর্ম ডিভাইন কমেডি’র তিনটি বইয়ের প্রথম এবং সবচেয়ে আলোচিত বই ইনফার্নোতে উল্লেখিত নরকের ভিজুয়াল রিপ্রেজেন্টেশন।

দান্তের বিভীষিকাময় নরক যন্ত্রণাকে ভূগর্ভস্থ ফানেলের আকারে এঁকেছেন বত্তিচেল্লি – আগুন, সালফার, নরদমা, দানবে পরিপূর্ণ এক জায়গা যার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করছে শয়তান নিজে। নরকটি তৈরি করা হয়েছে ৯টি চক্রে। আর পাপীদের পাপ অনুসারে একেকজনকে একেক চক্রে ঠাই দিয়েছেন। ছবিটি বর্তমানে লন্ডনের রয়্যাল অ্যাকাডেমি অব আর্টস এ সংরক্ষিত আছে।

লা প্রিমাভেরা

লা প্রিমাভেরা
লা প্রিমাভেরা

সান্দ্রো বত্তিচেল্লির সবচেয়ে বিখ্যাত ৫টি চিত্রকর্মের লিস্টে ২য় স্থানে আছে লা প্রিমাভেরা (La Primavera)। এটি রেনেসাঁ কালের বিখ্যাত চিত্রকর্মের মধ্যে অন্যতম। প্রিমাভেরা শব্দের অর্থ ‘বসন্ত ঋতু বা’ ‘প্রতীকাশ্রয়ী বসন্ত’। ১৪৮২ খ্রিস্টাব্দে এই ছবিটি আঁকেন রেনেসাঁর অন্যতম বিখ্যাত শিল্পী সান্দ্রো বত্তিচেল্লি। বত্তিচেল্লির চিত্তাকর্ষক বিভিন্ন রঙের ব্যবহার এবং ছবিটির নানা রকমের ব্যাখ্যা একে রেনেসাঁ কালের অন্যতম বিখ্যাত চিত্রকর্মে পরিনত করেছে। ইউরোপে আজও এই ছবিটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অন্যতম বিতর্কিত একটি ছবি।

প্রিমাভেরা নিয়ে আজ অবধি অনেক লেখালেখি হয়েছে। সজীব এক বসন্তে চমৎকার এক উদ্যানে উপকথার চরিত্ররা যেন সমবেত হয়েছে। কিন্তু এর মানে কি? অনেক মতামত পাওয়া গেলেও একটা বিষয়ে সবাই একমত হয়েছে যে, ছবিটি পৌরাণিক দৃষ্টিকোণ থেকে নারীদের উর্বরতা বৃদ্ধির কোন এক রীতি।

দ্য বার্থ অব ভেনাস

দ্য বার্থ অব ভেনাস
দ্য বার্থ অব ভেনাস

সান্দ্রো বত্তিচেল্লির আঁকা সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম হল দ্য বার্থ অব ভেনাস (The Birth of Venus)। এটি পনের শতকের ইতালিয়ান আর্টের অন্যতম ল্যান্ডমার্ক। ছবিটির বিষয় বস্তু গ্রীক পুরাণের প্রেমের দেবী ভেনাস। অনেকে তাকে আফ্রোদিতি বলেও জানে। এখানে চিত্রিত হয়েছে গ্রীক পুরাণ মতের মিল রেখে কিভাবে দেবী ভেনাসের জন্ম হয়েছে – সামুদ্রিক ঝিনুকের মধ্য থেকে – সদ্য ফোটা একজন তরুণী হিসেবে।

ভেনাসের ডান দিকে দেখা যায় বায়ু দেবতা ‘জেফিরাস’ কে আর তার বক্ষলগ্ন হয়ে আছে মৃদুমন্দ হাওার প্রতীক ‘অরা’। আর বামে রয়েছেন ঋতুর দেবী ‘হেরা’। যিনি আসছেন প্রেমের দেবী ভেনাসকে ফুলাচ্ছাদিত বস্ত্র নিয়ে বরন করে নিতে। বর্তমানে এই ছবিটি সংরক্ষিত আছে ইতালির ফ্লোরেন্সের উফিজি গ্যালারীতে।

সান্দ্রো বত্তিচেল্লির আরো কিছু ছবি: আলেগরি অব ফর্টিটিউড, মার্স অ্যান্ড ভেনাস, দ্য ট্রায়ালস অব মোজেস, দ্য মিস্টিক্যাল ন্যাটিভিটি ইত্যাদি।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

23 Shares
Share via
Copy link