বাংলাদেশের জেলা: কোন জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত (পর্ব ৩)

আমাদের ৮ টি বিভাগের মধ্যে মোট ৬৪ টি জেলা রয়েছে এবং প্রত্যেকটি জেলা কোন না কোন কারণে বিখ্যাত। অথচ আমরা অনেকেই জানিনা আমাদের পাশের জেলাটিই কি কারনে বিখ্যাত। তাই আমরা আজকে দেখবো আমাদের কোন জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত। আর এসব জানার মাধ্যমে আমরা ঐসব জেলার ইতিহাস – ঐতিহ্য নিয়েও কিছুটা ধারণা পাবো৷ ৷ তাই চলুন দেরি না করে শুরু করা যাক। আজকের এ পর্বে আমরা দেখবো ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, পিরোজপুর এবং লক্ষীপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত।

ময়মনসিংহ জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

ময়মনসিংহ জেলার বিখ্যাত মুক্তাগাছার মন্ডা
ময়মনসিংহ জেলার বিখ্যাত মুক্তাগাছার মন্ডা

ময়মনসিংহ জেলা বিখ্যাত মুক্তাগাছার মন্ডার জন্য। মুক্তাগাছার মণ্ডার নাম শোনেননি এমন ভোজনরসিক লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মুক্তাগাছার এই মণ্ডার মূল উপাদান দুধ ও চিনি। মণ্ডা তৈরির পর ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয় না। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় গরমের সময় ৩/৪ দিন ও শীতকালে ১০/১২ দিন ভালো থাকে। ময়মনসিংহ জেলার বিখ্যাত এই মুক্তাগাছার মন্ডার যাত্রা শুরু হয় গোপাল পালের হাত ধরে। আর আসল মন্ডার দোকান ‘গোপাল পালের প্রসিদ্ধ মণ্ডার দোকান’ হিসাবে পরিচিত, যার কোন শাখা নেই। উল্লেখ্য যে, ময়মনসিংহ শহরে ও মুক্তাগাছার বেশ কিছু দোকানে মণ্ডা বিক্রি হয়। যা আসল মন্ডা নয়।

নেত্রকোনা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

নেত্রকোনা জেলার বিখ্যাত বালিশ মিষ্টি
নেত্রকোনা জেলার বিখ্যাত বালিশ মিষ্টি

নেত্রকোনা জেলা বিখ্যাত সেখানকার শতবছরের পুরানো বালিশ মিষ্টির জন্য। এটি স্বাদ, গন্ধ, রং ও আকার-আকৃতিতে অনন্যসাধারণ। একবার মুখে নিলে এর স্বাদ ও গন্ধ মুখে লেগে থাকে, যা সারা জীবন মনে রাখার মতো। ‘গয়ানাথ’ নামক এক কারিগর শতাধিক বছর আগে থেকে এ বিশেষ ধরনের মিষ্টি তৈরি করে বিখ্যাত হয়েছিলেন। সে জন্য একে লোকে গয়ানাথের মিষ্টি বা গয়ানাথের চমচমও বলে থাকে। বালিশ মিষ্টি আকারভেদে একেকটির ওজন প্রায় দুই কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং দেখতে মানুষের শোয়ার বালিশের আকার ও আকৃতির হয় বিধায়ই একে বালিশ মিষ্টি বলা হয়। খাদক না হলে একটি মিষ্টি কখনো একজনে খেয়ে শেষ করতে পারবে না। তবে আগে থেকে অর্ডার দিলে সেটিকে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী ছোট-বড় করে তৈরি করে দিতে পারে।

দিনাজপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

দিনাজপুর জেলার বিখ্যাত লিচু
দিনাজপুর জেলার বিখ্যাত লিচু

দিনাজপুর জেলা বিখ্যাত লিচু এবং কাটারিভোগ চাল এর জন্য। বিশেষকরে লিচুর জন্যে দেশব্যাপী পরিচিত এই জেলাটি। এই জেলার ১৩টি উপজেলাতেই লিচু চাষ হয়। লিচু চাষ – উপষোগী মাটি ও আবহাওয়ার জন্য প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে লিচু চাষের জমির পরিমাণ। এখন সারা দেশে কম বেশি লিচু চাষ হলেও দিনাজপুরের লিচুর কদর আলাদা। দিনাজপুরের লিচুর মধ্যে চায়না-৩, বেদেনা, বোম্বাই ও মাদ্রাজি, কাঁঠালী উল্লেখয্যেগ্য। দিনাজপুর জেলায় ছোট-বড় নিয়ে ৩১২৮ টির বেশি লিচুর বাগান রয়েছে। এসব বাগানে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার গাছ রয়েছে।

দিনাজপুর জেলার এক বিশেষ সম্পদ “কাটারীভোগ চাল”। এ জেলার ঐতিহ্যবাহী “কাটারীভোগ চাল” বাংলাদেশের যে কোন ধানের চেয়ে গুণগত মানের দিক থেকে উন্নত। কাটারীভোগ চাল ছাড়াও এ জেলার আরো নানা জাতের সুগন্ধি ধান জন্মে। যারমধ্যে বিধান-৩৪, কালোজিরা, জিরা কাটারী (চিনিগুঁড়া), ফিলিপিন কাটারী, চল্লিশা জিরা, বেগুন বিচি, বাদশা ভোগ, জটা কাটারী, চিনি কাটারী ও ব্রিধান-৫০ উল্লেখযোগ্য।

পিরোজপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

পিরোজপুরের নেছারাবাদের আটঘর কুড়িয়ানার পেয়ারা
পিরোজপুরের নেছারাবাদের আটঘর কুড়িয়ানার পেয়ারা

পিরোজপুর জেলা বিখ্যাত পেয়ারা, নারিকেল, সুপারি, আমড়া এর জন্য। পিরোজপুরের নেছারাবাদের আটঘর কুড়িয়ানার পেয়ারার খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। বাংলার আপেলখ্যাত সুমিষ্ট পেয়ারা উৎপাদনের কারণে কুড়িয়ানা পরিচিতি পেয়েছে ‘পেয়ারার গ্রাম’ হিসেবে এবং এটি বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ পেয়ারার হাট নামে পরিচিত। এছাড়া পিরোজপুর জেলার জিন্দাকাঠি, ভীমরুলী, আদমকাঠি, ধলহার খালেও পেয়ারার মৌসুমে প্রতিদিন ভাসমান হাট বসে। পেয়ারা ছাড়াও পিরোজপুর জেলা নারিকেল, সুপারি, আমড়ার জন্যও বিখ্যাত।

জামালপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

জামালপুর জেলার বিখ্যাত ছানার পোলাও
জামালপুর জেলার বিখ্যাত ছানার পোলাও

জামালপুর জেলা বিখ্যাত ছানার পোলাও, ছানার পায়েস এবং বুড়ির দোকানের রসমালাই এর জন্য। ভাল রসমালাই এবং মিষ্টি কই পাওয়া যায় জিজ্ঞেস করলে সবাই এই বুড়ির দোকানের নামটাই বলবে, স্থানীয় লোকেরা এই নামেই সাদাসিধে দোকানটা চেনে। তবে দোকানের সাইনবোর্ডে অবশ্য লেখা “বুড়ি মা” দোকান। প্রায় ৭০ বছর পুরানো দোকান। মিষ্টির মান ভালো হবার কারনে সেই যে পরিচিতি পেল দোকানটা, যার নামডাক আর মান এখনো অক্ষুণ্ণ আছে। আর জামালপুরের চর এলাকায় সবুজ ঘাস খেয়ে গরু যে খাটি দুধ দেয় তা থেকে তৈরি হয় চমৎকার ছানা। আর সেই ছানা থেকে তৈরি এখানকার ছানার পোলাও এবং ছানার পায়েসও খুব বিখ্যাত।

লক্ষীপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

লক্ষীপুর জেলার সুপারি ও নারিকেল
লক্ষীপুর জেলার সুপারি ও নারিকেল

লক্ষীপুর জেলা বিখ্যাত সুপারি এর জন্য। উপকূলীয় এই জেলাটি সুপারির রাজধানী হিসেবে পরিচিত। এ জেলায় বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে সুপারি বাগান রয়েছে। এছাড়া লক্ষীপুর জেলা নারিকেলের জন্যও প্রসিদ্ধ।

শেরপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

শেরপুর জেলার বিখ্যাত ছানার পায়েস

শেরপুর জেলা বিখ্যাত ছানার পায়েস এবং ছানার চপ এর জন্য। উৎসব আয়োজনে বাঙালির খাদ্য তালিকায় পায়েস বহন করে খাবার ঐতিহ্য। বিয়ে, জন্মদিন, পূজা, অতিথি আপ্যায়ন সবখানেই পায়েসের মর্যাদা সবার ওপরে।। আর তা যদি হয় ছানার পায়েস তাহলে তো কথাই নেই। দুধ, চিনি আর ছানা দিয়ে তৈরি আদর্শ এ খাবার ছেলে-বুড়ো সবার পছন্দ। আর ব্যতিক্রমধর্মী ছানার চপও খুবই জনপ্রিয়। তাই মজাদার এই  ছানার পায়েস এবং ছানার চপ খাওয়ার জন্য শেরপুরে আপনাকে স্বাগতম।

নীলফামারী জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

নীলফামারী জেলা বিখ্যাত ডোমারের সন্দেশ এর জন্য। দুধের ছানা, চিনি আর খেজুর গুড়ের মিশ্রণে বিশেষভাবে তৈরি হয় এ সন্দেশ। পাওয়া যায় নীলফামারীর ডোমার উপজেলায়। নীলফামারী ছাড়িয়ে ডোমারের সন্দেশ এর খ্যাতি এখন সারা দেশে। আমেরিকা, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে ডোমারের সন্দেশ। ডোমার উপজেলা সদরের আদি দাদাভাই হোটেল অ্যান্ড মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং পলি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এই সন্দেশের জন্য খ্যাত। ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে এ দু’টি প্রতিষ্ঠান সন্দেশ তৈরি করছে।

প্রিয় পাঠক! আমাদের দেশের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে অনেক ধরনের পণ্য যা একেবারেই আমাদের নিজস্ব। যেমন বগুড়ার দই, কুমিল্লার রসমালাই, টাঙ্গাইলের চমচম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, রাজশাহীর রেশম, চাঁদপুরের ইলিশ ইত্যাদি। আশা করি এই পণ্যগুলোকে ব্র্যান্ডের মর্যাদা দিয়ে আমরা সকল জেলা তথা বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে তুলে ধরতে পারবো।

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

2 Responses

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *