ঘাঁটু গান: বিকৃত লালসার স্বীকার হয়ে ধর্ষিত এক লোকগীতি

আমার যমুনার জল দেখতে কালো

সান করিতে লাগে ভালো

যৌবন বসিয়া গেল জলে।।

ঘাঁটু গান বাংলাদেশের হাওড় অঞ্চলের একটি বিলুপ্তপ্রায় লোকগীতি। এটিকে কেউ কেউ বৈষ্ণব গানের সাথে গুলিয়ে ফেলেন কিন্তু আসলে তা ঠিক নয়। ঘাঁটু গান ভাটি  অঞ্চলের একটি সম্পুর্ণ সতন্ত্র ধারার গান। এই গানের উৎপত্তিকাল আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দির প্রথম দিকে। ঘাঁটু গানে নিম্নবিত্ত শ্রেণির ১৪-১৮ বছর বয়সি বালকরা মেয়েদের বেশে নাচ গান করে দর্শকদের আনন্দ দান করতো। ঘাঁটু গানের দলের কেন্দ্র বিন্দু এই বালককে ঘাঁটু বলা হতো। চলুন জেনে নেয়া যাক ঘাঁটু গানের সাতকাহন।

ঘাঁটু গানকে অনেকে লোকনাট্যের স্বীকৃতিও দিয়েছেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় ডক্টর শরবিন্দুর বক্তব্যে:

“—-কেবল গীতিকাই লোকনাট্য নয়; জারি, বারমাসী, ঘাঁটু গান, গাজন গান, প্রভৃতিও বর্তমানে লোকনাট্য হিসেবে স্বীকৃত।“

-[ফোকলোর ও লোকসংস্কৃতি, রোদেলা প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠাঃ ৫৬]

শুধুমাত্র ‘ঘাঁটু‘ বা ‘ঘেঁটু‘ নয়, অঞ্চলভেদে ‘ঘাঁটু‘ শব্দটির উচ্চারণগত আরো কিছু ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়; এই শব্দটিকে ‘ঘাঁটু‘ ‘ঘেঁটু্‌ , ‘গেন্‌টু‘ , ‘গাড়ু , ‘গাঁটু‘ , ‘গাঁডু‘ প্রভৃতি বলা হয়।

একসময় নেত্রকোনায় ঘাঁটু গানের বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল। এখানে এটি ‘ঘাঁটু গান‘ এবং ‘গাডু গান‘  নামেই বহুল প্রচলিত। একটু শিক্ষিত শ্রেণীর লোকেরা একে ‘ঘাঁটু গান‘ বলেন,অন্যরা বলেন ‘গাডু গান‘। এছাড়াও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বলে ‘ঘাঁডু গান‘। কারন, এই অঞ্চলে ‘ট‘ এর পরিবর্তে ‘ড‘ উচ্চারণের আধিক্য রয়েছে। যেমন, মাটি>মাডি ,হাট>হাড, তেমনি ‘ঘাঁটু‘ থেকে এসেছে ‘গাডু‘ বা ‘ঘাঁডু‘। উল্লেখ্য যে, উক্ত অঞ্চল ছাড়াও বৃহত্তর ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চল, বৃহত্তর কুমিল্লার  উত্তরাঞ্চল ও সিলেট বিভাগের হাওর অঞ্চল জুড়ে ছিল এই গানের বিস্তৃতি।

ঘেটু পুত্র কমলা ছবিতে ঘাঁটু গান

ঘেটু পুত্র কমলা ছবিতে ঘাঁটু গান

ঘাঁটু গানের উৎপত্তি সম্পর্কে একাধিক মত পাওয়া যায়। যেমন, ঘাঁটু গানের উৎপত্তি সম্পর্কে ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকীর বক্তব্য,

“শোনা যায়, ষোড়শ শতকের প্রথম ভাগে শ্রী হট্টের (বর্তমান সিলেট) আজমিরিগঞ্জ নিবাসী জনৈক আচার্য রাধাভাবের নানা লীলা খেলার মধ্যে তন্ময় হয়ে থাকতেন। ক্রমে তার শিষ্য সংখ্যা বাড়তে লাগল, নিম্ন শ্রেণীর বহু বালক তার শিষ্যত্ত্ব গ্রহণ করলো। এই ছেলেদের রাধিকা ভাব সম্পন্না উক্ত আচার্যের সখি সাজান হতো এবং তারা নীরবে নেচে রাধার বিরহের বিভিন্ন ভাব প্রকাশ করতো। পরবর্তীকালে বিভিন্ন বিরহ সঙ্গীতের সমবায়ে গড়ে ওঠে গাঁডু গান।“

[লোকসাহিত্য, ২য় খ-, ১০০ পৃষ্ঠা, মালিক ব্রাদার্স, ঢাকা]

অন্যদিকে তিতাশ চৌধুরী সম্পূর্ণ আলাদা কথা বলেন,

“কুমিল্লা জেলার ‘গুনিয়াউক‘ গ্রামেই এই ‘ঘাটুগানের‘ প্রধান ও আদি উৎস। ব্যারিস্টার আব্দুর রসুলের পিতা গোলাম রসুলই ছিলেন এই গানের প্রবর্তক। তাঁর উৎসাহ ও উদ্দিপনায় ‘ঘাটুগান‘ বিভিন্ন জেলার সর্বত্র বিস্তার লাভ করে। এই গান গুলো উর্দু-বাংলা, পার্সী ও হিন্দী সংমিশ্রণে বিরোচিত।“

-[লোকসাহিত্যের নানাদিক, দ্বিতীয় সংস্করণ, শোভা প্রকাশ,পৃষ্ঠাঃ ১৬৬]

এছাড়াও, এই বিষয়ে আরো অনেক মত রয়েছে। তবে অধিকাংশ গবেষক ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকীর দেয়া তথ্যের সাথে একমত হতে পেরেছেন। সুতরাং বলা যায় যে, ঘাঁটু গানের উৎপত্তিস্থল হচ্ছে সিলেটের আজমিরিগঞ্জ এবং এর উৎপত্তিকাল ষোড়শ শতকের প্রথমভাগ।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সাধন পন্থা হিসেবে এই গানের যাত্রা শুরু হয়। তবে উদয় আচার্যের মৃত্যুর পর তা সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে লোকসাহিত্যে পরিণত হয়। রাঁধা কৃষ্ণের প্রণয়লীলা ছিল ঘাঁটু গানের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। তবে এক পর্যায়ে সেই সীমারেখা অতিক্রম করে ঘাঁটু গান হয়ে ওঠে বৈচিত্রপূর্ণ। কারণ, এই গানের দর্শক শ্রেণীতেও ছিল নানা সম্প্রদায় ও নানা শ্রেণীর মানুষ। তবে উল্লেখ্য যে, এক সময় নিম্ন শ্রেণীর হিন্দু সমাজের লোকজন এই গানের বিকাশে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: বিশ্বের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ

‘ঘাঁটু গান‘ এর নামকরণের ইতিহাস নিয়ে অনেক রকমের ধারণা রয়েছে। সাধারণের ধারণা, ঘাটে ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে গাওয়া হতো বলে এর নাম হয়েছে ঘাঁটু গান। আবার অনেকের ধারনা- কৃষ্ণের বাঁশির ঘাট শব্দ থেকে ঘাঁটু শব্দের উৎপত্তি। কারণ ঘাঁটু ছোকরাকে নাচে-গানে নিয়ন্ত্রণ করে বাঁশি।

আগেই বলা হয়েছে যে, ঘাঁটু গানের মূল চরিত্রটিকে ঘাঁটু বলা হয়। অনেকে আবার ঘাঁটুকে ‘ঘাঁটু ছোকড়া‘ বলতেন। ঘাঁটুকে কেন্দ্র করেই গানের দল পরিচালিত হতো। এই চরিত্রের জন্য অল্পবয়সি ছেলেদেরকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হতো। তারা মেয়ে সাজে নেচে-গেয়ে দর্শককে বিনোদন দিতো। ঘাঁটু ছোকড়াদের লম্বা চুল রাখা বাধ্যতামূলক ছিলো। তাদের বেশভূষা ছিল মেয়েদের মতো। তারা চুলে খোপা ও বেণী বাঁধতো। পোশাক হিসেবে পরতো ধুতি ও গেঞ্জি। তবে মাঝে মাঝে ব্লাউজ ও শাড়ি পরতো এবং তার সাথে অলঙ্কারও পরতো। আর স্টেজে উঠতো পায়ে ঘুঙুর বেঁধে। তাদের চালচলন সবসময় থাকত মেয়েদের মতো। কারণ, ‘ঘাঁটু গানে‘ ঘাঁটু ছোকড়া মূলত রাঁধার ভূমিকায় থাকতেন।

ঘেটু পুত্র কমলা

ঘেটু পুত্র কমলা

ঘাঁটু গানের দলের পরিচালককে বলা হতো ‘সরকার‘ বা ‘মরাদার‘ (মহড়াদার>মরাদার)। সরকাররা ঘাঁটুকে নাচ, গান, ও তত্ত্বকথায় পারদর্শী করে গড়ে তুলতেন। এছাড়া যারা ঘাঁটু দলের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করতেন তাদের বলা হতো সমঝদার। ঘাঁটু গানের দলে আরো যারা থাকতেন তারা হলেন দোহার বা পাইলদার। এদের কাজ ছিলো বাদ্যযন্ত্র বাজানো এবং ঘাঁটুর গানের দোহার (পাইল) ধরা। দোহার বা পাইলরা যখন ঘাঁটুর সমস্বরে গান গেয়ে যেতেন ঘাঁটু তখন নাচ-গানে দর্শক মাতিয়ে তুলতো। ঘাঁটু গানে ব্যাবহৃত বাদ্যযন্ত্রগুলি হলো, ঢোল, খোল, বেহালা, বাঁশি, মন্দিরা, করতাল, হারমোনিয়াম, দোতারা ইত্যাদি। তবে বাঁশির ব্যবহার বাধ্যতামূলক ছিল।

ঘাঁটু গানের দুটি ধারা ছিল। একটি প্রতিযোগিতামূলক অন্যটি ‘ছম গান‘। প্রতিযোগিতামূলক গানের বিচারক হিসেবে উপস্থিত থাকত তত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন সমঝদাররা। প্রতিযোগিতা শেষে তারা রায় দিতেন। প্রতিযোগিতামূলক গানও ছিলো দুই ধরনের। যেমন, ‘প্রকাশ্য ঘাঁটু গান‘ ও ‘চাপা ঘাঁটু গান‘। প্রকাশ্য ঘাঁটু গান সহজবোধ্য হওয়ার কারণে, এতে দর্শক মেতে উঠত বেশি। অন্যদিকে চাপা গান বোঝা কঠিন ছিল। চাপা গানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ন্যায় শুধু সুর বা রাগিণী গাওয়া হতো। এই সুর বা রাগিণী তত্ত্বজ্ঞানহীন সাধারণ দর্শক বুঝতো না।

আরো পড়ুন:  টপ ৫: বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর হিন্দু মন্দির

ঘাঁটু গানের ব্যপক জনপ্রিয়তার কারণে, একসময় বিভিন্ন গ্রামে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এই গানের আয়োজন করা হতো। প্রতিযোগিতামূলক গানে দুটি দল গঠন করা হতো। একদল কৃষ্ণের ভূমিকায় এবং অন্যদল রাঁধার ভূমিকায় থাকতো। দুটি দল গীত গানের মাধ্যমে একে অপরকে প্রশ্ন করতো এবং তার উত্তর দিতো। অথবা একদলের গাওয়া গান অপর দলকে ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হতো। এসময় গানের ভিতরে ঘাঁটুরা তাদের কাহিনী বিন্যাসের জন্য তাৎক্ষণিক অঙ্গভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে সখা-সখীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতো।

একটি প্রতিযোগিতামূলক ঘাঁটু গান:

রাঁধার প্রেরিত সখা  এসে  সুবলকে জানাচ্ছে-

দূঃখে কষ্টে আছেরে শ্যাম তোমার বিধূমুখী

দশম দশায় পরিয়াছে মরণ কেবল বাকি

আমারে পাঠায়া দিল, যাবে কি না যাবে বল

উন্মাদিনী হইয়া গেল সত্য যুগের লক্ষী

এরপর ঘাঁটু কৃষ্ণরুপে উত্তর দেয়-

আমি যাইতেও পারি না,মনেও তো মানে না

যাবনা সুবল আমি রাঁধার খবরে

দেখ সুবল তুমি চিন্তা করে

আমি তার প্রেমে পোড়া,পুড়লাম জনম ভরা।

‘ঘাঁটু ছম গান‘ এর ধারাটি ছিলো সবচেয়ে জনপ্রিয়। উক্ত ছম জাতীয় গানও আবার বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। যেমন, ‘জলভরা‘, ‘বিচ্ছেদ‘, ‘রঙ বাউলা‘, ‘মূরলী‘ ইত্যাদ। এছাড়াও দর্শক-স্রতাদের আনন্দ দানের জন্য ঘাঁটু গানে ব্যাঙ্গাত্মক কিছু গানও পরিবেশন করা হতো। একটি ছম গান হলো,

বাজিলরে মোহন বাছরি, ছখি গইন কাননে।

ছুনি বাছরি বর জিও না মানে জিও না মানে।

জিও না মানে, জিও না মানে, জিও না মানে।।

রইতে না পারি গরে, উদাসী করিল মোরে , ঘন ফুকারে।

মনে লয় নিকলিয়া যায় গ ছখি, বিপিনবনে, মধুরছুতানে।।

ঘাঁটু গানে ব্যবহৃত তালের কোন ধরা বাঁধা নিয়ম ছিল না। কারণ, এই গানের সুর কারো একার সৃষ্টি নয়। এগুলি বাংলার মাঠ-ঘাঁট, গ্রাম-গঞ্জ থেকে উঠে আসা এক লোকাতিত সুর। এক কথায় বাংলার মাটির গান, মায়ের গান।

এই গানের শুরু হতো বন্দনা দিয়ে। এরপর প্রেমতত্ত্ব, অভিমান, বিচ্ছেদ, মিলন প্রভৃতি বিষয় উঠে আসত তার গীতধারায়। বাংলার চিরায়ত বিরহের রুপ বর্ণিত হতো এই গানে।

আমার বন্ধু বিনোদিয়ারে, শ্যাম বিনোদিয়া

মাতা ছাড়লাম পিতারে ছাড়লাম

ছাড়লাম সোনার পুরী।

তোমার লাইগা পাগল হইয়া দেশ-বিদেশে ঘুরি।

আমার বন্ধু বিনোদিয়ারে, শ্যাম বিনোদিয়া।

আগে যদি জানতামরে বন্ধু যাইবারে ছাড়িয়া

দুই চরণ বান্দিয়া রাখতাম মাথার কেশ দিয়া।

আমার বন্ধু বিনোদিয়ারে, শ্যাম বিনোদিয়া।

ঘাঁটু গান বর্ষাকালে একটু বেশি হলেও প্রায় সারাবছরই কোথাও না কোথাও হতে থাকতো। বর্ষাকালে পানিতে টুইটুম্বুর হাওরাঞ্চলের মানুষকে অনেকটা কর্মহীন অবস্থাতেই সময় কাটাতে হতো। তখন এই অঞ্চলে আনন্দ-উৎসব বা চিত্ত বিনোদনের আর কোন  মাধ্যমও তৈরি হয়নি। তাই একমাত্র ঘাঁটু গানই মানুষকে একটু প্রশান্তি দিত। এসব কারণে সকল শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায় বেশ ঘটা করে আয়োজন করা হতো ঘাঁটু গানের আসর। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই গান পরিবেশন করা হতো ঘাঁটে ঘাঁটে নৌকা ভিড়িয়ে; অন্যসময় চর্চা হত ডাঙ্গায়।

ঘাঁটু গান হাওরের সংস্কৃতিকে বৈচিত্রময় করেছিল ঠিকই কিন্তু একসময় ক্রমে এর কিছু অন্ধকার দিকেরও উদ্ভব হয়। যা বিশ শতকে এসে বিকট রুপ ধারন করে। এখানে উল্লেখ্য যে, আগে থেকেই ‘ঘাঁটু‘কেনা বেচার একটি প্রচলন গড়ে উঠেছিলো। আর যে ব্যাক্তি এই ঘাঁটু কিনতেন অথবা এক বছর বা একাধিক বছরের জন্য চুক্তিতে নিতেন তাকে বলা হতো ‘সৌখিনদার‘ বা ‘খলিফা‘। সৌখিনদাররা ঘাঁটুকে ইচ্ছার দাস বানিয়ে রাখতেন। ঘাঁটু বালক সৌখিনদারদের ‘মামা‘ বলে ডাকতেন।

ঘাঁটু গান - বিকৃত লালসার স্বীকার হয়ে ধর্ষিত এক লোকগীতি

ঘাঁটু গান – বিকৃত লালসার স্বীকার হয়ে ধর্ষিত এক লোকগীতি

একসময় এসে সৌখিনদররা নিজের স্ত্রী-সন্তানের চেয়েও ঘাঁটুদের অধিক কদর করতে থাকে। এবং নানা সুযোগ সুবিধা দিতে থাকে। এই প্রসঙ্গে একটি কিংবদন্তিও রয়েছে যে, “বউ পালা আর ঘাঁটু পালা একই কথা”। এই সময় ঘাঁটু লালন পালন করা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। তাই ঘাঁটু কেনা বেচা নিয়ে ঝগড়া-মারামারির ঘটনা ঘটতে থাকে। অর্থবিত্ত সৌখিনদারদের বিকৃত লালসার স্বীকারও হতে থাকে পেটের তাড়নায় হয়ে ওঠা পেশাদার ঘাঁটুরা। ঘাঁটু ছোকড়া ও সৌখিনদারদের মধ্যে গড়ে ওঠে বিকৃত যৌন জীবন। আস্তে আস্তে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে ঘাঁটু ও সৌখিনদারদের কুকীর্তির কথা। এবং ক্রমে এই অস্বাভাবিক পন্থাটি সামাজিক স্বীকৃতিও পেয়ে যায়। সমাজে ঘটতে থাকে নানা রকম অসামাজিক ও কুরুচিপূর্ণ কার্যকলাপ। বিকৃত চাহিদা সম্পন্ন মানুষের জন্য রচিত হতে থাকে অশ্লীল গান। গান শেষে ঘাঁটুদেরকে রাত কাটাতে নিয়ে যাওয়া হতো সৌখিনদারদের বাড়িতে। আর সৌখিনদারদের বউরা সারা রাত কেঁদে কেঁদে কাটাত। ঘাঁটু ছোকড়াকে যে তারা সতিন হিসেবে দেখত তার আভাস পাওয়া যায় এই গানের মাধ্যমে:

আইছে সতিন ঘেঁটুপুলা

তোরা আমারে বাইন্ধা ফেল

পূব হাওরে নিয়া।।

উল্লিখিত অন্ধকার দিকের উপর ভিত্তি করে বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন আহমেদ ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা‘ নামক একটি চলচ্চিত্রও নির্মান করেছিলেন। এই চলচ্চিত্রটি ২০১২ সালে মুক্তি পায়।

জানা যায়, ঘাঁটু বালকের নেশায় উন্মত্ত হয়ে কেউ কেউ জমি-জমা বিক্রি করে পথের ফকির হয়েছে। আবার কেউ কেউ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে ঘাঁটুকে নিয়ে জীবন কাটিয়েছে। এভাবে ঘাঁটুকে কেন্দ্র করে সমাজে শুরু হয় বিকৃত জীবন ধারা, নেমে আসে নৈতিক অবক্ষয়।

এভাবেই চলতে থাকে কিছুকাল আর অন্যদিকে সমাজে ঢুকতে থাকে শিক্ষার আলো। মানুষ হতে থাকে সচেতন, সেই সাথে গড়ে ওঠে সামাজিক বিবেক। দর্শক ও পৃষ্ঠপোষকরা একে একে ঘাঁটু গান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে । ঘাঁটু গান বিবেচিত হতে থাকে ‘অপসংস্কৃতি‘ হিসেবে। আর অবশেষে ‘ঘাঁটু‘ শব্দটি পরিণত হয় একটি লৌকিক গালিতে।

বর্তমানে অনেকে ঘাঁটু গান সম্পর্কে একটি বিরুপ ধারণা পোষণ করেন। তারা হয়ত এই গানের উদ্ভবকালের দিকে আলোকপাত করেননি। শুধুমাত্র ঘাঁটু গানের স্বকীয়তা হারানো বিকৃত রূপটিকে বিচার করেই ক্ষান্ত হয়েছেন। একসময় ঘাঁটু গানকে ঘিরে হাওড় অঞ্চলের মানুষের যে আবেগ জড়িয়ে ছিলো তা ভূলে যাবার নয়। আজকের যুগে ঘাঁটু গানকে যদি তার স্বকীয় রূপ ফিরিয়ে দেওয়া যায় তবে বাংলার মানুষ তার অন্তরের কথা শুনতে পাবে।

লেখক: অচিন্ত্য আসিফ

data-matched-content-rows-num="2" data-matched-content-columns-num="2"

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *