সুন্দরবন: বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট

বাংলাদেশে হাজারো সুন্দর যায়গা আছে। কিছু কিছু যায়গা খুব আশ্চর্যের আবার কিছু কিছু অনেক রহস্যময়। কোথাও আছে জলরাশি আবার কোথাও আছে গহিন বন। কোথাও আছে চরাঞ্চল আবার অন্য কোন যায়গায় সবুজ আর সবুজ। বড় অদ্ভুত আমাদের এই দেশ। ঋতুর সাথে সাথে আশেপাশের পারিপার্শিক অনেক কিছুর ই পরিবর্তন হয়। তেমনি এক অদ্ভুত সুন্দর যায়গায় নাম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন, সুন্দরবন

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন

(Sundarbans: World’s Largest Coastal Mangrove Forest)

বাংলায় “সুন্দরবন”-এর আক্ষরিক অর্থ “সুন্দর জঙ্গল” বা “সুন্দর বনভূমি”। সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে, যা সেখানে প্রচুর জন্মায়। অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে যে, এর নামকরণ হয়তো হয়েছে  “সমুদ্র বন”(প্রাচীন আদিবাসী) থেকে। তবে সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় যে  সুন্দরী গাছ থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে।

সুন্দরবনের বিখ্যাত সুন্দরী গাছ
সুন্দরবনের বিখ্যাত সুন্দরী গাছ

মুঘল আমলে স্থানীয় এক রাজা পুরো সুন্দরবনের ইজারা নেন। ঐতিহাসিক আইনী পরিবর্তনগুলোয় কাঙ্ক্ষিত যেসব মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রথম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক তত্ত্বাবধানের অধীনে আসা।

১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর এর কাছ থেকে স্বত্বাধিকার পাওয়ার পরপরই সুন্দরবন এলাকার মানচিত্র তৈরি করা হয়। বনাঞ্চলটি সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভারতের তৎকালীন বাংলা প্রদেশে বন বিভাগ স্থাপনের পর থেকে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণ ছিল। বনের উপর মানুষের অধিক চাপ ক্রমান্বয়ে এর আয়তন সংকুচিত করেছে। ১৮২৮ সালে বৃটিশ সরকার সুন্দরবনের স্বত্ত্বাধীকার অর্জন করে। এল. টি হজেয ১৮২৯ সালে সুন্দরবনের প্রথম জরীপ কার্য পরিচালনা করেন। ১৮৭৮ সালে সমগ্র সুন্দরবন এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয় এবং ১৮৭৯ সালে সমগ্র সুন্দরবনের দায় দায়িত্ব বন বিভাগের উপর ন্যস্ত করা হয়। সুন্দরবনের প্রথম বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নাম এম. ইউ. গ্রীন। তিনি ১৮৮৪ সালে সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে পড়ে। যা বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ৪.২% এবং সমগ্র বনভূমির প্রায় ৪৪%।

সুন্দরবনের উপর প্রথম বন ব্যবস্থাপনা বিভাগের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে। ১৯৬৫ সালের বন আইন (ধারা ৮) মোতাবেক, সুন্দরবনের একটি বড় অংশকে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় ১৮৭৫-৭৬ সালে।

পরবর্তী বছরের মধ্যেই বাকি অংশও সংরক্ষিত বনভূমির স্বীকৃতি পায়। এর ফলে দূরবর্তী বেসামরিক জেলা প্রশাসনের কর্তৃত্ব থেকে তা চলে যায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। পরবর্তীতে ১৮৭৯ সালে বন ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনিক একক হিসেবে বন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সদর দপ্তর ছিল খুলনায়। সুন্দরবনের জন্য ১৮৯৩-৯৮ সময়কালে প্রথম বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণিত হয়। ১৯১১ সালে সুন্দরবনকে “ট্র্যাক্ট আফ ওয়াস্ট ল্যান্ড” হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়।

উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকা
উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকা

প্রকৃতপক্ষে সুন্দরবনের আয়তন হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১৬,৭০০ বর্গ কি.মি.। কমতে কমতে এর বর্তমান আয়তন হয়েছে পূর্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান। বর্তমানে মোট ভূমির আয়তন ৪,১৪৩ বর্গ কি.মি. (বালুতট ৪২ বর্গ কি.মি.-এর আয়তনসহ) এবং নদী, খাঁড়ি ও খালসহ বাকি জলধারার আয়তন ১,৮৭৪ বর্গ কি.মি.। সুন্দরবনের নদীগুলো নোনা পানি ও মিঠা পানি মিলন স্থান। সুতরাং গঙ্গা থেকে আসা নদীর মিঠা পানির, বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি হয়ে ওঠার মধ্যবর্তী স্থান হলো এ এলাকাটি। এটি সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী অঞ্চল জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে সুন্দরবন অবস্থিত।

ধারনা করা হয়, হিমালয়ের ভূমিক্ষয়জনিত পলি, বালি ও নুড়ি হাজার বছর ধরে বয়ে চলা পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র কর্তৃক উপকূলে চরের সৃষ্টি করেছে। অপরদিকে সমুদ্র তীরবর্তী হওয়ায় লবণাক্ত জলের ধারায় সিক্ত হয়েছে এ চর এবং জমা হয়েছে পলি। কালাতিক্রমে সেখানে জন্ম নিয়েছে বিচিত্র জাতের কিছু উদ্ভিদ এবং গড়ে উঠেছে “ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট” বা লবণাক্ত পানির বন। অনেকে মনে করেন সাগরের বন বা এখানকার আদিবাসী চন্দ্র-বান্ধে থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে। তবে সর্বাধিক স্বীকৃত ব্যাখ্যা হচ্ছে সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ ‘সুন্দরী’র নামানুসারে হয়েছে সুন্দরবনের নামকরণ। সুন্দরবনের প্রধান বনজ বৈচিত্রের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে সুন্দরী, গেওয়া, গরান এবং কেওড়া। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের হিসেব মতে সর্বমোট ২৪৫টি শ্রেণী এবং ৩৩৪টি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে সেখানে।

সুন্দরবনের বিখ্যাত গোলপাতা গাছ
সুন্দরবনের বিখ্যাত গোলপাতা গাছ

সুন্দরবন ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রাজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ সরীসৃপ এবং ৮টি উভচর প্রজাতির আবাসস্থল। পাখি বিষয়ক পর্যবেক্ষণ, পাঠ ও গবেষণার ক্ষেত্রে পাখিবিজ্ঞানীদের জন্য সুন্দরবন এক স্বর্গ। প্রায় ত্রিশ হাজার চিত্রা হরিন হয়েছে এই সুন্দরবনে।

সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার নামক বাঘ বিশ্ব-বিখ্যাত। ২০০৪ সালের হিসেব মতে, সুন্দরবন প্রায় ৫০০ রয়েল বেঙ্গল রয়েছে কিন্তু এই বাঘের সংখ্যা দিনকে-দিন কমে আসছে। ২০১১ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে সুন্দরবনে মোট বাঘের সংখ্যা প্রায় ৩০০। এসব বাঘ গড়ে প্রতি বছরে প্রায় ৩০ থেকে ১০০ জন মানুষ মেরে ফেলার কারণেও ব্যপকভাবে পরিচিত। তবে নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ায় ভারতীয় অংশের সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে একটিও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

সুন্দরবনের বাঘ বিশ্ব-বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার
সুন্দরবনের বাঘ বিশ্ব-বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার

স্থানীয় লোকজন ও সরকারীভাবে দ্বায়িত্বপ্রাপ্তরা বাঘের আক্রমণ ঠেকানোর  জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। স্থানীয় জেলেরা বনদেবী বা বনবিবির প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে যাত্রা শুরুর আগে। সুন্দরবনে নিরাপদ বিচরণের জন্য বাঘের দেবতার প্রার্থনা করাও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে জরুরি। বাঘ যেহেতু সবসময় পেছন থেকে আক্রমণ করে  সেহেতু জেলে এবং কাঠুরেরা মাথার পেছনে মুখোশ পরে। এ ব্যবস্থা স্বল্প সময়ের  জন্য কাজ করলেও পরে বাঘ এ কৌশল বুঝে ফেলে এবং আবারও আক্রমণ হতে থাকে।

সুন্দরবনে শিরদাঁড়াওয়ালা মাছ রয়েছে প্রায় ৩০০ প্রজাতির। সুন্দরবনে মৎস্যসম্পদকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। সব মাছ মিলিয়ে হয় সাদা মাছ, বাকিরা বাগদা, গলদা, কাঁকড়া। আশির দশকে চিংড়ির পোনা ধরা শুরু হওয়ার পর মাছের প্রাচুর্য হঠাৎ কমে যায়। একসময় স্থানীয় জনসাধারণের প্রাণিজ প্রোটিন ৮০ শতাংশ মেটাতো মাছ। সুন্দরবনে কালা হাঙর, ইলশা কামট, ঠুঁটি কামট, কানুয়া কামট পাওয়া যায় খালিশপুর এলাকা পর্যন্ত। অনেক কিছু সংখ্যায় অনেক কমে গেছে, বিশেষ করে কালা হাঙর প্রায় দেখাই যায় না।

ইদানিং অন্যান্যরা টিকে থাকার জন্য বাঘ ও শুশুককে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান মৌলিক প্রকৃতির এবং যা বন্য প্রাণীর বিশাল আবসস্থল। কচ্ছপ, গিরগিটি, অজগর এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনের স্থানীয় প্রজাতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ, মহিষ, গন্ডার এবং কুমিরের এর মত কিছু কিছু প্রজাতি সুন্দরবনে বিরল হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন

মানবসৃষ্ট হুমকির মুখে সুন্দরবনের প্রায় ২৯ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাঘরোল, চিতা বিড়াল, ভোঁদড়, গণ্ডার, ইরাবতী (ডলফিন), শুশুক, নীল গাই, নেকড়ে, সমুদ্র ঈগল, সাদা পেঁচা, দৈত্য বকসহ নাম না জানা নানান প্রজাতির প্রাণী।

স্থায়ী এবং অস্থায়ী মিলে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের বসবাস এই সুন্দরবনকে ঘিরে। আমাদের দেশের কাঠ এবং জ্বালানির প্রায় ৪৫% আসে সুন্দরবনের বুক থেকে। এছাড়াও বন থেকে প্রাপ্ত আয়ের প্রায় ৪১% আসে এই অরণ্যভূমি থেকেই। সুন্দরবনের মধ্যে কটকা, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর এবং টাইগার পয়েন্ট হচ্ছে পর্যটকদের জন্যে মূল আকর্ষণীয় স্থান। কখনো সময় আর সুযোগ করে ঘুরে আসতে পারেন এই ম্যানগ্রোভ বন থেকে।

সুন্দরবনের স্বীকৃতি

সুন্দরবন ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো “বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Sites)” হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৯২ সালের ২১শে মে সুন্দরবন রামসার স্থান (Ramsar) হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

সুন্দরবনে যাতায়াত

দেশের যেকোন স্থান থেকে খুলনার বাগেরহাট তারপর সেখান থেকে সুন্দরবন। অথবা বরিশালের কুয়াকাটা থেকেও জাহাজে বা ট্রলারে সুন্দরবন যাওয়া যায়। সাধারনত যেসব যায়গায় রিস্ক নেই সেইসব যায়গা সবার জন্য উন্মুক্ত করেছে প্রশাসন। বনে ঢোকার আগে স্থানীয় বন বিভাগ থেকে পার্মিশন নিতে হয়। আর বনের মধ্যে রাতে থাকার মতন যায়গা নেই। তবে কেও কেও ট্রলার বা নৌকায় নদীতে রাত কাটায়। সেক্ষেত্রে ডাকাতের ভয় থেকেই যায়। তবে শহরের দিকে অনেক হোটেল বা গেষ্ট হাউজ আছে, সেখানে থাকা যায়।

লেখক: Pritom Pallav



error: